Home সর্বশেষ অগ্নিনিরাপত্তায় ভবনে চারটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি

অগ্নিনিরাপত্তায় ভবনে চারটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি

মোহাম্মদ আবদুর রশিদ টিপু
রাজধানী ঢাকাসহ ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো রয়েছে আগুনের ঝুঁকিতে। চলতি বছর ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা ও বনানীর এফ আর টাওয়ারে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের প্রাণ গেছে শতাধিক মানুষের। ফলে আবাসিক, দাপ্তরিক ও বাণিজ্যিক ভবনসহ কল-কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি এখন খুবই গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে। কীভাবে আগুন থেকে নিরাপদ থাকা যাবে-এ সম্পর্কে কারিকা’র সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের একমাত্র সার্টিফায়েড অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আবদুর রশিদ টিপু। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা স্টেট ইউনিভার্সিটির কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং আর্কিটেকচার অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে প্রথম সার্টিফায়েড ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব শান্ত

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অগ্নিনিরাপত্তার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন?
আগুন লাগার ঘটনা যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো এসব ব্যাপারে সচেতন। তারা যেকোনো ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় জোর দেয়। ফলে যেকোনো অগ্নিকান্ডকে সহজে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে এবং ওইসব দেশে প্রাণহানিও অনেক কম।
অগ্নিনিরাপত্তার দিক দিয়ে গড়পড়তায় আমাদের দেশের অবস্থান খুব ভালো- তা বলা যাবে না। তবে গার্মেন্টস সেক্টর এর ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের প্রায় সব গার্মেন্টস কারখানা এখন অনেক সুরক্ষিত। সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর কারখানাগুলো অগ্নিনিরাপত্তায় ব্যাপক সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে ভারী শিল্প-কারখানাগুলো এদিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বাণিজ্যিক ভবনসহ অন্যান্য ভবনেও অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি আছে।

অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতির কারণ কী বলে মনে করেন? এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটা ব্যয়বহুল ব্যাপার। আমাদের দেশের ভবন মালিক বা কারখানার মালিকরা খরচের ভয়ে এ দিকটিতে ততটা গুরুত্ব দেন না। আবার অনেক কারখানা মালিক তা করতে গিয়ে খরচ মেটাতে হিমশিম খান। এর কারণ হলো দক্ষ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার এবং দক্ষ লোকবলের অভাব। যারা বাংলাদেশে ফায়ার সেফটি নিয়ে কাজ করেন, তাদের স্বল্প জ্ঞান ও অনেক ক্ষেত্রে ওভার ডিজাইনের কারণে খরচ বেড়ে যায়। আবার সঠিক ডিজাইনেরও ভুলভাবে স্থাপনের কারণে সিস্টেম কাজ করে না। তাই কারখানার মালিকদের উচিত একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা ডিজাইন করা। এতে খরচ কমবে এবং সিস্টেমও কাজ করবে। পাশাপাশি দেশে ফায়ার সেফটির ওপর প্রাতিষ্ঠানিক কোর্স চালু করতে হবে। এতে দেশে গড়ে উঠবে দক্ষ ফায়ার সেফটি ইঞ্জিনিয়ার।

অগ্নিকান্ডের কারণ কী কী?
বৈদ্যুতিক ত্রুটির পাশাপাশি সিগারেটের আগুন, গ্যাসের চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার, রাসায়নিক দ্রব্য, বিস্ফোরণ, আগুন নিয়ে খেলা ও অসতর্কতাসহ নানা কারণে ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও রান্নার সরঞ্জাম, ওয়াশিং মেশিন, হিটার, ড্রায়ার, এয়ার কন্ডিশনার, ফ্যান, রাসায়নিক গ্যাস, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপি গ্যাসের কারণে আগুন লাগতে পারে। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তারও অগ্নিকান্ডের কারণ হয়। বৈদ্যুতিক তারের লুজ কানেকশন, প্ল্যাগ ওভার লোডেড, পুরনো বৈদ্যুতিক ইকুইপমেন্ট ব্যবহার ইত্যাদি অগ্নিকান্ডের কারণ হতে পারে। এছাড়া যেকোনো দাহ্য বস্তুর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বড় অগ্নিকান্ডের কারণ হতে পারে। পাইপলাইনের মাধ্যমে বা সিলিন্ডার ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে অসতর্কতায় রান্নাঘরে গ্যাস জমে থাকলে দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালে এমনকি মশা মারার ব্যাট চালু করলেও আগুন লাগতে পারে। এছাড়া বজ্রপাত থেকেও আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

ছোট-বড় ভবনগুলোকে অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষায় কী করা উচিত?
চারটি বিষয় বিবেচনা করে ভবন নির্মাণ করলে আমরা সহজেই ভয়াবহ অগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা পেতে পারি-
১. অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশন
২. ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম
৩. আগুনকে আবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা ও
৪. নিরাপদ বহির্গমন পথ।
অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশনের মধ্যে ‘স্প্রিংকলার সিস্টেম’ অন্যতম। অগ্নিকান্ডে স্প্রিংকলার সিস্টেম একটি সক্রিয় অগ্নিসুরক্ষা পদ্ধতি। এই সিস্টেম পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ দ্বারা পরিচালিত। সিস্টেমটি বৃহৎ বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, হোটেল, শিল্প-কারখানা, ঘরবাড়ি এবং ছোট ভবনে স্থাপন করা যায়। যদিও পদ্ধতিটি ব্যয়বহুল, সারা বিশ্বে এই পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। অ্যামব্রোস গডফ্রে ১৭২৩ সালে প্রথম সফল স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার সিস্টেম তৈরি করেন। আমেরিকায় ১৮৭৪ সাল থেকে স্প্রিংকলার সিস্টেম ব্যবহার শুরু হয়। উন্নত বিশ্বে স্প্রিংকলার সিস্টেম স্থাপনে টোটাল কনস্ট্রাকশন খরচের মাত্র ১ শতাংশ খরচ হয়। আমাদের দেশে খরচ হয় প্রায় ২ থেকে আড়াই শতাংশ। কারণ আমাদের দেশে সব সরঞ্জাম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ফায়ার প্রটেকশনে আরেকটি বিষয় হলো-স্ট্যান্ডপাইপ সিস্টেম, যা ফায়ার পাম্পের সঙ্গে পাইপের মাধ্যমে সংযুক্ত করা থাকে।
ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম প্রাণহানি রোধে খুবই কার্যকর। কোনো ভবনে আগুন লাগলে, কেউ যদি দেখতে পায়, তাহলে সেই ব্যক্তি অ্যালার্ম সুইচে চাপ দিলে সেন্ট্রালি বেল বেজে উঠবে এবং লোকজন সহজে ভবনে আগুন ছড়ানোর আগেই বের হয়ে আসতে পারবে। ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম আগুন লাগার প্রাক্কালে ধোঁয়াকে শনাক্ত করে এবং ফায়ার অ্যালার্ম কন্ট্রোল প্যানেলে সংকেত পৌঁছায়। এতে করে সহজেই মানুষ অগ্নিকান্ডের উৎপত্তিস্থল এবং অগ্নিকান্ড সম্পর্কে অবগত হতে পারে।
আগুনকে আবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা (ফায়ার কনটেইনমেন্ট) হলো, যে কক্ষে বা ফ্লোরে আগুন লাগে সেখানেই আগুনকে আটকে রাখার ব্যবস্থা। অর্থাৎ আগুনকে ছড়াতে না দেওয়া। এর জন্য ফায়ার ডোর স্থাপন এবং ফ্লোর টু ফ্লোর পেনিটেশন বন্ধ করা উচিত। তাতে সহজেই এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরে আগুন যেতে পারবে না।
নিরাপদ বহির্গমন পথ বা বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক ভবনের ফ্লোর থেকে সিঁড়ি যদি আলাদা করা থাকে, তাহলে লোকজন নিরাপদে ও সহজে ভবন থেকে অক্ষত অবস্থায় বের হয়ে আসতে পারবে।
এই চারটি বিষয় মেনে বহুতল ভবন, কল-কারখানা, হোটেল, স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, আবাসিক ভবন ইত্যাদি নির্মাণ করা হলে আমাদের দেশে বড় ধরনের অগ্নিকান্ড ঘটার ঝুঁকি কমে যাবে। আগুন লাগলেও কোনো প্রাণহানি ঘটবে না। দেশের সরকারি ও বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফায়ার প্রটেকশন এবং ডিটেকশনের আওতায় আনা উচিত। বিভিন্ন ভবনে এই সুবিধা না থাকলে এসব ভবনের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী কেউ জানতে পারবে না আকস্মিক অগ্নিকান্ডের তথ্য।

অগ্নিকান্ড রোধে সচেতনতার বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
অগ্নিদুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। ফায়ার ব্রিগেডসহ জনগণকে অধিক সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। বর্তমানে এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অগ্নিকান্ডের খবর আসছে। তাই সিলিন্ডার ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পরিহার করতে হবে। গ্যাস সিলিন্ডারে সাংকেতিকভাবে মেয়াদ উল্লেখ থাকে। যেমন সিল্ডিারের গায়ে ই২২ লেখা থাকলে বুঝতে হবে ওই সিলিন্ডারটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ ২০২২ সালের জুন মাস। এলপিজি বছরকে মোট চারটি ভাগে ভাগ করে। সেগুলো হলো-A, B,C ও D
Aমানে জানুয়ারি থেকে মার্চ, B মানে এপ্রিল থেকে জুন,Cমানে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এবং D মানে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। মেয়াদের তারিখ এই কোড অনুযায়ীই নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

NO COMMENTS

Leave a Reply