Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ফ্ল্যাটভিত্তিক জীবনযাপনে বাড়ছে সহিংসতা-নিষ্ঠুরতা

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ফ্ল্যাটভিত্তিক জীবনযাপনে বাড়ছে সহিংসতা-নিষ্ঠুরতা

0 158

সোহরাব আলম
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে নানা বয়সী মানুষের মধ্যে সহিংস ও নিষ্ঠুর আচরণ বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে অস্থিরতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতা। এমনকি কিশোরদের মধ্যেও সহিংস আচরণের বিস্তার ঘটছে। কিছু ‘কিশোর গ্যাং’ মানুষ খুনেও জড়িত। শহরের মানুষের এমন সহিংস ও আত্মবিধ্বংসী হয়ে ওঠার পেছনে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ফ্ল্যাটভিত্তিক জীবনযাপনে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগরায়ণ বর্তমান শতাব্দীর অন্যতম প্রধান কারণ, যা স্বাস্থ্য খাতের ওপর প্রভাব ফেলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের ৬৮ ভাগের বেশি মানুষ নগরে বসবাস করবে। আর বাংলাদেশে যে আনুপাতিক হারে নগরায়ণ হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগরে বসবাসকারী জনসংখ্যা গ্রামীণ জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এমনকি ভবন নকশার দুর্বলতার কারণেও নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। সাধারণত স্থপতিরা অনেক দিক বিবেচনায় রেখেই ভবনগুলোর নকশা (ডিজাইন) করেন। প্রাকৃতিক পরিবেশ খেয়াল করে বিশুদ্ধ বাতাস চলাচলের সুবিধার্থে সঠিক ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট ভবনসহ নগর এলাকার মানুষকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মানসিকভাবে ভালো রাখে। সুস্থ রাখে। কিন্তু উল্টোটা হলে বিপদ।
দেশে দ্রুত বর্ধমান শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান শীর্ষে। এখানকার বেশিরভাগ নগরায়ণ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। প্রতিনিয়ত উঠছে আকাশচুম্বী ভবন। হারিয়ে যাচ্ছে খোলা জায়গা। এমনকি প্রায় দুই কোটি বাসিন্দার এই নগরে খেলাধুলার মাঠগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে বহুতল ভবনের আড়ালে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঘিঞ্জি হয়ে উঠেছে অনেক এলাকা। পরস্পরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ তথা সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। নগরে স্বাভাবিক বিনোদনের জন্যও নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরিবেশ নেই বললেই চলে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যহীনতা ক্রমেই বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সামাজিক অবক্ষয় এবং ব্যক্তিগত অস্থিরতা ও সহিংস আচরণ। নাগরিক জীবনের প্রভাবে মানসিক স্বাস্থ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত, তার গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান না থাকলেও এই হার যে বাড়ছে-তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে শুধু কিশোরদের অপরাধী হয়ে ওঠার ঘটনাই বড় উদাহরণ হতে পারে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত, মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত এবং শিশু আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে ঢাকায় ৯৯ খুনের মামলায় তিনশ’র বেশি কিশোর জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে গত দেড় বছরে ঘটেছে ১৩টি খুন। এতে জড়িত অন্তত ১২০ কিশোর। এদের নাম উল্লেখ করে খুনের মামলাও হয়েছে।
প্রতিবেদনে রাজধানীর উত্তরা, হাজারীবাগ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের খবরও উঠে এসেছে। বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্য কিশোরদের মধ্যে নামী স্কুলের শিক্ষার্থীও রয়েছে, যারা খুন-ধর্ষণ-মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধের পেছনে প্রেমসংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও তথাকথিত ‘হিরোইজম’ অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। কিশোরদের এসব ভুল পথে পা বাড়ানোর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার, অভিভাবকদের অবহেলা, সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের খরবদারি কমে যাওয়া কিংবা রাজনৈতিক ছত্রছায়া- গড়পড়তায় এই কারণগুলো তাদেরকে ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নগরের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণের কারণে মানসিক বিকাশের যথাযথ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এমনকি মানসিক সমস্যার কারণেই বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও পুলিশ সদর দপ্তরের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করেন। সে হিসাবে প্রতি বছর দেশে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। বিশ্বজুড়ে নগরায়ণের পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে তৈরি হতাশা এবং মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব মানুষকে আরও বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, এটা এখন এক নীরব মহামারী (সাইলেন্ট এপিডেমিক) হয়ে উঠেছে। এখন ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সের মানুষদের মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ আত্মহত্যা। সিডিসির গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রতি ১২ জন তরুণের মধ্যে অন্তত একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ নানা সরকারি-বেসরকারি গবেষকদের ধারণা, আত্মহত্যার মূল কারণ হতে পারে-১. ভেঙে পড়া সামাজিক বন্ধন, ২. পরিবারের সাবেক কাঠামোর অবলুপ্তি, ৩. অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ৪. বেকারত্ব, ৫. মানসিক অবসাদ প্রভৃতি। আর এসব কারণ শহরাঞ্চলেই বেশি বিদ্যমান, অপরিকল্পিত নগরায়ণ যা ত্বরান্বিত করছে।
নগরজীবনে মানসিক চাপ কমানোর জন্য প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি। ঢাকার সম্প্রসারণকে সব ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগের জন্য সুপরিকল্পিত করা যায়নি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
স্থপতি রবিউল হুসাইন বলেন, ‘আইনের বিধান অনুসারে স্থাপনা এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যেন আলো-বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকে। জায়গা ছাড়ার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ভবনগুলো নির্মাণের সময় এগুলো মানা হয় না। ফলে কংক্রিটের জঙ্গল তৈরি হচ্ছে। এসব ‘জঙ্গলে’ নানা ধরনের দূষণ কেবল শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে নাগরিকদের। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, পানিদূষণের প্রভাব শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের ওপরও পড়ছে।’
সুপরিকল্পিত নগরায়ণের অভাবে এর বাসিন্দাদের অবচেতন মনে চাপ তৈরি হচ্ছে, পরে যা ক্ষত হয়ে দেখা দিচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যসহ সব স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই নগরের বিকেন্দ্র্রীকরণ প্রয়োজন বলেও মত দেন রবিউল হুসাইন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব কারিকাকে বলেন, ‘এই নগরে আমরা যেভাবে বসবাস করছি, তাতে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ-দক্ষতা কমে যাচ্ছে। শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই। যন্ত্রনির্ভর শৈশব নিয়ে বেড়ে উঠছে তারা। ফলে মানবিক হয়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মনের জন্য অবসর প্রয়োজন, স্পেস প্রয়োজন। পরিকল্পনাহীন ইট-পাথরের শহরে মনের স্পেস তৈরির সুযোগ কম। অথচ পরিকল্পিত নগর গড়ে উঠলে চমৎকার পরিবেশে পর্যাপ্ত অবসর ও মনের স্পেস তৈরির সুযোগ হতো। বর্তমানে যেভাবে আমরা এগিয়ে চলেছি, তাতে মানুষ অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।’
অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং দুর্বল নকশার ভবনে বসবাসের ক্ষতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে সালাহ্উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, ‘কোনো নাগরিক যদি সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই জ্যামে আটকা পড়েন, ময়লা-নোংরার মধ্যে পড়েন তাহলে তার মেজাজ ধীরে ধীরে খারাপ হবে-এটাই স্বাভাবিক। ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে ঠিকমতো আলো-বাতাস না ঢুকলেও মেজাজ খারাপ থাকবে। যার প্রভাব পড়বে মানসিক স্বাস্থ্যে। সব মিলিয়ে অফিস বা কাজে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে বাসায় ফেরা পর্যন্ত মেজাজ খারাপ থাকবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে পরিকল্পিত নগরায়ণের বিকল্প নেই।’ হতাশা, অস্থিরতা ও সহিংস আচরণের প্রভাব থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এই মনোবিদ।

NO COMMENTS

Leave a Reply