Home মূল কাগজ আগা খান পুরস্কার ও বায়তুর রউফ মসজিদ নিয়ে কারিকার সঙ্গে কথা বলেছেন...

আগা খান পুরস্কার ও বায়তুর রউফ মসজিদ নিয়ে কারিকার সঙ্গে কথা বলেছেন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম

সাবরিনা মিলি


বায়তুর রউফ মসজিদটি ঢাকার দক্ষিণ খান থানার ফায়দাবাদে অবস্থিত। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ডিজাইন ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচলিত মসজিদগুলোর ধরণ থেকে আলাদা কিছু।

স্থাপত্য-বৈশিষ্ট্য
৭৫৪ বর্গমিটারের মসজিদটি দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হয় না যে এটি একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নির্মিত। এ অঞ্চলের মানুষ মসজিদের যে চিরাচরিত চিত্রের সঙ্গে পরিচিত তা বায়তুর রউফ মসজিদে অনুপস্থিত। অর্থাৎ গম্বুজ বা মিনার এ মসজিদে নেই। চতুর্দিকে ৮টি পিলারেরে ওপর এটি নির্মিত। কিবলার দিকে ১৩ ডিগ্রি কোনাকুনি করা একটি পিলার রয়েছে। মসজিদে প্রাকৃতিক আলোবাতাস প্রবেশের যথেষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদটি এমনভাবে ডিজাইন করা যেন শীত বা গরমে বাইরের আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব ভেতরে বোঝা না যায়। এটির স্থাপত্যের বিশেষ দিক হলো, এর বায়ু চলাচল-ব্যবস্থা ও আলোর চমৎকার বিচ্ছুরণ, যা মসজিদের পরিবেশে ভিন্ন একটি মাত্রা যোগ করেছে। ব্যবহৃত সব উপকরণই স্থানীয়। সুলতানি আমলের মসজিদের অনুপ্রেরণায়  তৈরি হয়েছে এই স্থাপত্য।

স্থপতির গল্প
মেরিনা তাবাসসুম এর আগেও, ২০০৪ সালে স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে যৌথভাবে আগা খান পুরস্কারের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়েছিলেন। যার অর্থমূল্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের তিনটি স্থাপত্য এ পুরস্কার জিতলেও সেগুলোর স্থপতি ছিলেন বিদেশি। অন্যদিকে বেশ কয়েকবার চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেও আগা খান পুরস্কার ঘরে তোলা হয়নি কোনো বাংলাদেশি স্থপতির। অবশেষে ২০১৬ সালে সে আকাক্সক্ষার অবসান ঘটে। ২০১৬ সালে আবু ধাবির ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট আল জাহিলি ফোর্টে মেরিনা তাবাসসুম ও বাকি পাঁচ বিজয়ীর হাতে পুরস্কার তুলে দেয়া হয়।

আগা খান পুরস্কার ও বায়তুর রউফ মসজিদ নিয়ে কারিকার সঙ্গে কথা বলেছেন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম

baitur_raufআগা খান পুরস্কার সম্পর্কে জানতে চাই?
স্থাপত্য-দুনিয়ায় অত্যন্ত সম্মানজনক একটি স্বীকৃতি আগা খান পুরস্কার। তরুণ স্থপতিদের উদ্ভাবনী ধারণাকে স্বীকৃতি দিতে আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক (একেডিএন) প্রতি তিন বছর পর পর এ পুরস্কার দিয়ে থাকে। এর জন্য স্থাপত্যক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা, ঐতিহাসিক বিষয়সমূহ ইত্যাদির ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। পাশাপাশি স্থাপত্যকলার মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখেন বিচারকরা। জুরি বোর্ডের পক্ষ থেকে একজন মূল্যায়নকারী প্রতিটি প্রকল্প-এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি কমিটির কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর তা যাচাই-বাছাই করে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।

দেশ-বিদেশের ৩৮৪টি স্থাপনাকে পেছনে ফেলে প্রথমে সেরা ১৯টি প্রকল্পের মধ্যে এবং সবশেষে আপনার ডিজাইনকৃত বায়তুর রউফ মসজিদ এ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। আপনার অনুভূতি কী?
আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। এর জন্য নির্বাচিত হতেও যেতে হয় ধাপে ধাপে ও অত্যন্ত কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমি অনেক আনন্দিত, কারণ স্থাপত্যশিল্প নিয়ে যে সাধনা করেছি তার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার শুধু ভালো কাজের স্বীকৃতি পাওয়া বা শুধু বিজয়ীদের জন্যই নয় বরং তরুণ স্থপতিদের জন্যও বেশ অনুপ্রেরণাদায়ক। এই পুরস্কার  বাংলাদেশের জন্যও অনেক বড় একটি অর্জন। আমি মনে করি, এ অর্জন আমাদের স্থাপত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করবে।

মসজিদের ডিজাইনের সময় আপনি কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়েছেন?
আমি আমার কাজের মাধ্যমে আমাদের স্থাপত্য-চর্চায় শিকড়ের ভাষাকে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। তাই মসজিদটি ডিজাইনের সময় স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, জলবায়ু ইত্যাদির কথা মাথায় রেখেছি। সুলতানি আমলের মসজিদের অনুপ্রেরণায় তৈরি হয়েছে এই স্থাপত্য। মসজিদটি ১৩ শতাব্দীর পূর্বের বাঙালি স্থাপত্যরীতিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এর বিশেষত্বগুলোর একটি হচ্ছে আধ্যাত্মিক মানের নামাজের স্থান। আমি আলো, বাতাস, শব্দ আর ফাঁকা জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেছি যাতে ভেতরে যারা নামাজ পড়বেন তাদের জন্য উপযুক্ত একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নামাজের স্থানটিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চিরাচরিত ডোম এবং মিনারের অনুপস্থিতি মসজিদটিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। তার উত্তরে আমি বলব, এটাই প্রথম মসজিদ যেটাতে কোনো চিরাচরিত প্রতীক তথা ডোম বা মিনার নেই। কিবলার দিকে ফিরে জামাতবদ্ধ নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে মসজিদটি বেশ বড়সংখ্যক মানুষকে জায়গা দিতে সক্ষম। একটি মসজিদের যে মৌলিক চাহিদা থাকে তা এই ডিজাইনে রাখার  চেষ্টা করা হয়েছে। এটি নির্মাণের ব্যয় এসেছে স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ তথা বিভিন্ন উৎস-মাধ্যমে আসা অনুদান থেকে, যা মসজিদটির অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। মসজিদটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এটি পরিবেশবান্ধব। নামাজের স্থানসহ অন্য সব স্থানে প্রাকৃতিক আলোবাতাস প্রবেশের যথেষ্ট ব্যবস্থাও রয়েছে।

মসজিদটি নির্মাণে কী ধরনের উপকরণ ও উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে?
সবই স্থানীয় উপকরণ। প্রধান উপকরণ হিসেবে ইট এবং কাঠামোগত ভিত নির্মাণে রেইনফোর্সড কংক্রিট ব্যবহৃত হয়েছে। দুই তলায় ওঠার সিঁড়িগুলো তৈরি হয়েছে ছিদ্রযুক্ত লোহার শিট দিয়ে।

তরুণ স্থপতিদের উদ্দেশে যদি কিছু বলেন…
স্থাপত্যবিদ্যাকে শুধু রুটি-রুজির যোগানদাতা হিসেবে নয়, এটাকে আমি নিয়েছি নেশা হিসেবে। আমি মনে করি তরুণ স্থাপত্যবিদদেরও বিষয়টিকে সেভাবেই নেয়া উচিত। সেই সঙ্গে শুধু চর্চার বিষয় হিসেবে না দেখে এর মধ্যকার গভীর অর্থগুলো উপলব্ধি করতে হবে। ভাবতে হবে দেশের জন্য। বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের স্থাপত্য উপযোগী সেটা নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন। এই বিষয়টি নিয়ে খুব পর্যাপ্ত কাজ হয়নি আমাদের। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরের বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে। সবাই যদি দেশের এক শতাংশ মানুষের জন্য কাজ করতে চান তবে সুযোগটা স্বাভাবিকভাবেই কম পাওয়া যাবে। অন্যদিকে বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ থাকবে অন্ধকারেই। কোনো  পেশার লক্ষ্যই দেশের এক শতাংশ মানুষের জন্য হওয়া উচিত নয়। স্থাপত্যবিদ্যার ক্ষেত্রটিকে বিস্তৃত করা দরকার। ঢাকার বাইরে ছোট শহরগুলোর দিকে নজর দিতে হবে। দেশ ও মানুষের কাছে থাকতে হবে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যেটার শুরু নিজের দেশকে চেনা ও গভীর শিকড়সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করার মধ্য দিয়ে।

NO COMMENTS

Leave a Reply