Home মূল কাগজ ব্যক্তিত্ব আধুনিক স্থাপত্যকলার কবি: ফিলিপ জনসন

আধুনিক স্থাপত্যকলার কবি: ফিলিপ জনসন

0 1538

‘নিউইয়র্ক শহর; আসলে এর কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। একটা সময় ছিল যখন লোকে বলাবলি করত, ওয়ালস্ট্রিটের এসব ইমারত নিউইয়র্কের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে; আর এর ঠিক এক প্রজন্ম আগে ওই লোকেদেরই বলতে শুনতাম, রকফেলার সেন্টার নিউইয়র্কের বারোটা বাজাবে। বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। ওই বহুতল ইমারতগুলো যে একে-অন্যের গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে, আকাশ ফুঁড়ে, সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে, তারও কারণ আছে। মানুষ নিজেও তো একে অপরের কাছাকাছিই থাকতে চায়!’ কথাগুলো যিনি বলেছেন তিনি আর কেউ ননÑ স্বয়ং ফিলিপ জনসন।

চেনা বামনের যেমন পৈতে লাগে না, তেমনি আধুনিক স্থাপত্যকলার এই দিকপালকেও নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। শুধু এটুকু বলে রাখা যায়, ফিলিপ জনসন ২০ শতকের আমেরিকান স্থাপত্যকলার সেরা এক সৃজনী প্রতিভা। একেবারেই ব্যতিক্রমী এক আরবান স্কাইলাইন গড়ে তোলা আর তা মর্ম দিয়ে অনুধাবন করার ক্ষেত্রে জনসনের কোনো জুড়ি মেলা ভার। এদিকটায় তার অবদান তার গড়া ইমারতের মতোই আকাশছোঁয়া। এখানেই শেষ নয়, বহুমুখী সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটেছিল তার মধ্যে। যাকে বলে বহুমুখী প্রতিভা। ইতিহাসবিদ, কিউরেটর, স্থপতিÑ নানামুখী পরিচয় তার। এসবের মধ্যে জীবনভর স্থাপত্যকলাই তাকে মাতিয়ে রেখেছে বেশি। আর তার পরবর্তী প্রজন্মের পর প্রজন্মে রয়ে গেছে তার স্থাপত্যরীতির প্রভাব। ফিলিপ জনসনের জন্ম ১৯০৬ সালে। বেড়ে ওঠেন ওহাইওর ক্লিভল্যান্ডে। হাইস্কুলের পাঠ চুকিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন হার্ভার্ড কলেজে। সেখানে পড়েছিলেন ধ্র“পদী সাহিত্য নিয়ে। ১৯২০-এর দশকের শেষার্ধে এসে নতুন এক ভালোবাসায় ডুব দেন তিনি। তার সব প্রেম আর মনোযোগ কেড়ে নেয় স্থাপত্যকলা আর আধুনিক নন্দনকলা। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই Museum of Modern Art’s new architecture department-এর পরিচালকের পদ অলঙ্কৃত করেন। স্থাপত্যকলায় নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য আনার মানসে আলফ্রেড এইচ বার জুনিয়র ও হেনরি রাসেল হিচকককে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন ইউরোপে, বিশেষত জার্মানিতে। সেখান থেকে ফিরে ১৯৩২ সালে Museum of Modern Art-এ ‘The International Style : Architecture Since 1922’ নামে করলেন এক যুগান্তকারী যৌথ প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনীকে আমেরিকায় আধুনিক স্থাপত্যকলার গোড়াপত্তন হিসেবে গণ্য করা হয়।

বয়স যখন মধ্য তিরিশ, তখন জনসন হার্ভার্ডে ফিরে গিয়ে স্থাপত্যনকশার ওপর পড়াশোনা শুরু করেন স্থপতি মার্সেল ব্র“য়ারের অধীনে। ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে ডিগ্রি নিয়েই নেমে পড়েন বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের ইমারত আর লোকজনের বাড়িঘরের নকশা তৈরির কাজে। তার প্রথম এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে কানেকটিকাটে তার নিজের শহর নিউ ক্যানানের জগদ্বিখ্যাত গ্লাস হাউস বা গ্লাস টাওয়ার। এক আধা গ্রামীণ নিসর্গের পটভূমিতে এ-হচ্ছে এক মর্মর প্রাসাদ, যার বাইরের দিকের কাঠামো ইস্পাতের। এটির আদলে আরও কিছু ভবন তৈরি করে তিনি লোকের নজর কাড়েন। ১৯৫০-এর দশকটি জনসনের জন্য ছিল যাকে বলে পয়মন্ত এক দশক। এসবের মধ্যে বিশেষভাবে বলতে হয় নিউইয়র্কের সিগ্রাম ভবনের কথা। বলাবাহুল্য, এটি তিনি নির্মাণ করেন তারই ভাবগুরু মাইজ ফন ডার রোহের সঙ্গে যৌথভাবে। একের পর এক নিসর্গ ও প্রকৃতিবান্ধব নয়নশোভন ভবন-স্থাপত্যে তাক লাগাতে থাকেন জনসন। লোহা, কাচ, ইট-কাঠ তার হাতে পেতে যায় ভাষা, গরিমা আর লালিত্য; সেই সঙ্গে পায় টেকসই কাঠামোÑ যেখানে বাস্তব কল্পনাকেও হার মানায়। অবশ্য ১৯৬০-এর দশকে এসে ভাবগুরু মাইজ ফন ডার রোহের প্রভাব ছেড়ে সৃষ্টির নতুন পথে হাঁটা শুরু হলো। অনেক ব্যক্তিগত ঢংয়ের নকশার ভেতর ইতিহাসের নানা উপাদান জুড়ে দিয়ে খিলান, গম্বুজ আর আলিশান সব ইমারত গড়ে তুলতে থাকেন। ওই সময়টায় নেব্রাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেলডন আর্ট গ্যালারি, নিউইয়র্কের স্টেট থিয়েটার, মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টসহ নানা জায়গায় তার কাজের প্রদর্শনী চলতে থাকে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৯১ সময়টা জনসনের জন্য ছিল সবচেয়ে সুফলা সময়। এই সময়ে তিনি যেসব স্থাপত্য নকশা ও ইমারত গড়েন সেগুলোর মধ্যেÑ মিনিয়াপোলিসের আইডিএস টাওয়ার, ক্রিস্টাল ক্যাথিড্রাল বা স্ফটিকের ক্যাথিড্রাল, টেক্সাসের সেন্ট বাসিল চ্যাপেল, স্পেনের মাদ্রিদে ‘গেট অব ইউরোপ’ বা ‘পোয়ের্তা দে ইউরোপা’, পিটার্সবার্গে পিপিজি প্যালেস, পেট্রয়েট সেন্টার, আটলান্টার পিচ ট্রি টাওয়ার, ওয়ান ডেট্রয়েট সেন্টার, নিউইয়র্কের সিগ্রাম ভবন, পালাসের থ্যাংকস-গিভিং স্কয়ার। এ রকম আরও কত কত নাম! ২০০৫ সালে ৯৮ বছর বয়সে মারা যান আধুনিক স্থাপত্যকলার এই কবি। আর দুটি বছর বেশি বাঁচলে জীবনের সেঞ্চুরিটা হয়ে যেত তার। তাতে কী! নগরে নিসর্গে কাচে-কংক্রিটের উত্তুঙ্গ খিলানে-গম্বুজে-ইমারতের চূড়ায় পতপত করে উড়ছে তার প্রতিভার ধ্বজা।

জুয়েল মাজহার

NO COMMENTS

Leave a Reply