Home মূল কাগজ আমস্টারডাম : একটি স্মার্ট শহরের মাস্টারপ্ল্যান

আমস্টারডাম : একটি স্মার্ট শহরের মাস্টারপ্ল্যান

খালিদ জামিল


ইউরোপের জ্ঞান আর অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় আমস্টারডামের জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুতগতিতে। শহরের সিটি কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে আমস্টারডামে আরও দেড় লাখ মানুষ বাইরে থেকে এসে যুক্ত হবে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে। শহরের পরিকল্পনাকারীরা যদি এই অতিরিক্ত মানুষের কথা মাথায় রেখে মাস্টারপ্ল্যান নতুন করে সাজাতে না পারেন, তবে এই বিপুল জনসংখ্যার চাপ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
মাস্টারকার্ড পরিচালিত ২০১৫ গ্লোবাল ডেস্টিনেশন সিটি ইনডেক্সের তথ্য বলছে, আমস্টারডাম শিপহোল এয়ারপোর্টের মাধ্যমে এই শহর সে বছর যে পরিমাণ আন্তর্জাতিক যাত্রীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, সেটা ইউরোপের মধ্যে পঞ্চম।
এসব কারণেই আমস্টারডামের সিটি কাউন্সিল তাদের শহরের আয়তন বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সেগুলোকে একসঙ্গে বলা হচ্ছে ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০ সিটি মাস্টারপ্ল্যান’। শহরের নকশাকে নতুন করে সাজানো, বাইরের সঙ্গে আরও সহজ যোগাযোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে শহরকে নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের মধ্যে চলাচলের জন্য আরও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই পরিকল্পনার অন্যতম অংশ। শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন বাণিজ্যিক ও আবাসিক অংশ নির্মাণ করা হবে, যেগুলো সংযুক্ত হবে একটি রিংরোডের মাধ্যমে।

শহরের ঘনত্ব বাড়ানো, উন্নয়ন এবং জমি পুনরুদ্ধার
শহরকে নতুন করে সাজানোর মাধ্যমে বিভিন্ন অংশের ব্যবহার বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। জমি পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়া বিশ্বের অনেক শহরেই করা হয়। তবে আমস্টারডামের মতো এত বড় পরিসরে এমনটা হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। আমস্টারডামের এই ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ মেগা প্রজেক্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে আধুনিক নগরপরিকল্পনার দিক দিয়ে সেটা অন্যান্য শহরের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
এই মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় সাতটি বিশেষ কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, যেগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরের বাসিন্দাদের জীবনযাপন বর্তমানের তুলনায় আরও সহজ হয়ে উঠবে। সেই বিশেষ কর্মপরিকল্পনার মধ্যে একটি হলো আমস্টারডামের ঘনত্ব বাড়ানো। ২০৪০ সালের মধ্যে ৭০ হাজার নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভবনের পাশাপাশি থাকবে স্কুল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধা। তবে সব ক্ষেত্রেই ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার আর বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য ভবন নির্মাণের দিকে লক্ষ্য রাখা হবে।
ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার আরেকটা উপায় হলো বাণিজ্যিক অঞ্চল নতুনভাবে গড়ে তোলা। একই এলাকায় বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন গড়ে তোলারও পরিকল্পনা করা হচ্ছে, অনেকটা সাম্প্রতিক আমস্টারডামের পোর্ট সিটির মতো। ২০৩০ সালের মধ্যে শহরের ওয়াটার ফ্যাসিলিটিতে ১৯ হাজার মানুষের বাসস্থান গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেটা সংযুক্ত থাকবে সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে।
রিং রোডের মধ্যকার শহরের অংশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে গোটা শহর একটা মেট্রোপলিটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তার জন্য এই যোগাযোগ ব্যবস্থার মূল অংশগুলোতে বিশেষ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি কাউন্সিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী শহরের মূল অংশগুলোর সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন করা হবে দোকান এবং খাবার সরবরাহের ধরনের উন্নয়ন ও ভিন্নতা আনার মাধ্যমে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও আছে –
• শহরের এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের সংযোগের জায়গাগুলোতে সবুজ অঞ্চল বাড়ানো।
• শহরকে মোটা দাগে দ্বিখ-িত করা আইজে ওয়াটারওয়েকে নতুন করে সাজানো।
•  শিপহোল বিমানবন্দরের কাছে সেন্ট্রাল আমস্টারডামে জুইডাস বাণিজ্যিক অঞ্চলের উন্নয়ন।
• ২০২৮ সামার অলিম্পিককে সামনে রেখে দুটি ভিন্ন নগর-পরিকল্পনা।
জুইডাসে শীর্ষ স্থপতিরা ভবিষ্যতের নগর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছেন। যেমন- রেম কোলহ্যাস করছেন আমস্টারডাম আরএআই হোটেলের নকশা। আরএআই কনভেনশন সেন্টারের এক্সপেনশন হিসেবে নির্মিত হচ্ছে এই হোটেল, যার নকশা মূলত উলম্ব অংশের ওপর কিউব আকৃতির স্থাপনা। শহরের এই অংশে এমন দারুণ কিছু স্থাপনা গোটা এলাকার চেহারাই বদলে দিচ্ছে।
আমস্টারডামের নুর্ড ডিস্ট্রিক্টে মূল জলপথের উত্তরে নতুন ইওয়াইই ফিল্ম ইনস্টিটিউট এবং ক্রান্সপোর বিল্ডিং এই অঞ্চলকে সৃজনশীলতার হটস্পটে পরিণত করেছে। আমস্টারডাম যদি এভাবেই নিজেকে সাজিয়ে এবং বিভিন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি মেট্রোপলিটনে রূপান্তরিত হতে পারে, তাহলে স্মার্ট ও অভিনব নগর উন্নয়নের দিক দিয়ে সারা বিশ্বের জন্য রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হবে।

কীভাবে আমস্টারডাম এর বিভিন্ন অংশকে সংযুক্ত করছে?
মেট্রোপলিটন শহরে রূপান্তরকরণের মাধ্যমে শহরের প্রত্যেক অংশের সঙ্গে সুষ্ঠু যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য হাঁটার পথ, সাইকেলের পথ আর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। সেই সঙ্গে এই নতুন স্মার্ট সিস্টেমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে আমস্টারডামের বাসিন্দা থেকে শুরু করে এই শহরে বেড়াতে আসা সবাইকে। ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ পরিকল্পনার একটি অন্যতম অংশ এই গণপরিবহনের রুট সংস্কার। পাশাপাশি আরও পার্ক এবং বাইসাইকেল লেন নির্মাণ করা হবে। যতটা সম্ভব কমিয়ে ফেলা হবে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা।
সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন বলছে, এখানকার আঞ্চলিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। তবে যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, তাতে ২০৪০ সালের মধ্যে একটি প্রশস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা অবশ্যই গড়ে তোলা সম্ভব। গোটা শহরের যেকোনো জায়গা থেকে বাস বা ট্রেন ব্যবহার আরও সুবিধাজনক করতে স্টেশনের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
জুইডাস এবং দক্ষিণ-পূর্ব আমস্টারডাম শহরের কেন্দ্র এবং বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় এই অংশের বাণিজ্যিক ও আবাসিক উন্নয়নকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দক্ষিণ অংশে এরই মধ্যে বড় আকারের প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ২০৪০ সালের মধ্যে পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সবকিছুই শিপহোল বিমানবন্দরের বর্ধিতকরণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে জুইডাসের কেন্দ্রেই নতুন একটি রেলস্টেশনের নির্মাণ কাজ চলমান, যেটা হবে গোটা শহরের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল যোগাযোগের কেন্দ্র। শহরের বাকি অংশগুলোর সঙ্গে তো বটেই, এই স্টেশন নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য অংশ এমনকি পশ্চিম ইউরোপের অনেক শহরের সঙ্গেও যোগাযোগ সহজতর করতে রাখবে অনন্য ভূমিকা।
অন্যদিকে বেসরকারি উদ্যোগে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সংখ্যায় সেগুলো ডজনখানেকের বেশি। যেমন ‘ইয়েলার’ মোবাইল অ্যাপ নিয়ে বর্তমানে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, যেটার মাধ্যমে একজন ভ্রমণকারী আরেকজন ভ্রমণকারীর সঙ্গে নিজের ক্যাব শেয়ার করতে পারেন। ‘উইগো’ নামের আরেকটি অ্যাপের মাধ্যমে যার গাড়ি নেই, তিনি একজন গাড়ির মালিক, যার গাড়িটি কিছু সময়ের জন্য দরকার হচ্ছে না, তার কাছ থেকে ভাড়া নিতে পারেন। এছাড়া ‘মোবিপার্ক’ পার্কিং প্ল্যাটফর্ম অ্যাপের মাধ্যমে ধারে-কাছে কোথাও পার্কিংয়ের সুবিধা থাকলে সেটার খোঁজ পাওয়া যায়। যে-কারণে গাড়ি পার্ক করার জন্য এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে চালকদের সময় নষ্ট করতে হয় না।
আশা করা হচ্ছে, আমস্টারডামে গাড়িতে যাতায়াতের জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহৃত হয়, ২০৪০ সালের মধ্যে সেটার ৬০-৯০ শতাংশ জোগান আসবে উইন্ডমিল, বায়োগ্যাস কিংবা সৌরবিদ্যুতের মতো প্রকৃতিবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে। ২০৪০ সালের পর শহরের খালগুলোতে কেবল বৈদ্যুতিক শব্দবিহীন নৌযান চলাচলের অনুমতি থাকবে। এর মাধ্যমে আমস্টারডামে পুরনো ইউরোপের মতো পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে এটাকে রূপান্তরিত করা হবে স্মার্ট শহরে।

নাগরিক অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন ভাবনা : আমস্টারডাম স্মার্ট শহর প্রকল্প
টেকসই উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনার সময়ে আমস্টারডামের এই প্রকল্প বিশ্বের সেরা প্রকল্পগুলোর একটি বলেই উল্লেখ করা যেতে পারে। যেকোনো স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার জন্য সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের ক্ষেত্রে সমন্বয় প্রশ্নে এই শহর হতে পারে আদর্শ। তাই ‘স্ট্রাকচারাল ভিশন আমস্টারডাম-২০৪০’ প্রকল্পকে যদি হার্ডওয়্যার বলা হয়, ‘আমস্টারডাম স্মার্ট শহর প্রকল্প’কে বলতে হবে সফটওয়্যার।
এই পরিকল্পনা মূলত আমস্টারডাম সিটি কাউন্সিলের। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে প্রায় ১০০ স্থানীয় মিউনিসিপ্যালিটিস, বাণিজ্যিক, আবাসিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শুধু আমস্টারডাম নয়, এরা একই সঙ্গে ৭৫টি শহরকে স্মার্ট শহর হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে।
‘সিটি-জেন’ নামের একটি পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যেটার মাধ্যমে একই অঞ্চলের বাসিন্দারা নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী সবুজ জ্বালানি একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন।
২০১৬ সালে আমস্টারডামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যেটার নাম ‘আইবেকন অ্যান্ড আইওটি (Internet of things) লিভিং ল্যাব’। এর মাধ্যমে শহরে প্রায় দেড় মাইল পায়ে চলার পথ একটি নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয় যাতে পথচারী সহজে গন্তব্য খুঁজে পায়। ‘স্মার্ট সিটিজেন’ প্রকল্পের আওতায় শহরের নাগরিকরা সাশ্রয়ী দামের কিছু সেন্সরের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ দূষণ এবং শব্দের মাত্রা সংগ্রহ করে শহরে ওপেন ডাটা প্রোগ্রামের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। তাতে মানুষ পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন হচ্ছে। গাড়ি কিংবা গণপরিবহনের বদলে চলাচলের জন্য সাইকেল ব্যবহারের প্রতি হয়ে উঠছে আগ্রহী।
স্মার্ট শহর পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এর সঙ্গে স্মার্ট নাগরিকদের সম্পৃক্ত করা। তারাই মূলত সৃষ্টিশীল এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply