Home মূল কাগজ আপন আবাস আমাদের এই নগরী বিল্ডিংয়ে অভ্যস্ত না

আমাদের এই নগরী বিল্ডিংয়ে অভ্যস্ত না

0 141

জাবেদ ওমর বেলিম
জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার

আমি খুব সৌভাগ্যবান এজন্য যে, আমি হোসনি দালানের ছেলে! এখানকার পরিবেশটাই ছিল অন্যরকম। ছোটবেলায় আমি বুয়েট মাঠ, ফজলে রাব্বি হল মাঠ, নবকুমার স্কুল মাঠ-এসব মাঠ পেয়েছি খেলার জন্য। আমার দাদার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ হলেও ওখানে আমার থাকা হয়নি। আমার জন্ম হয়েছে মাহুতটুলী। আমার বয়স যখন তিন বছর তখন আমরা হোসনি দালানে চলে আসি।
আমার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে ওই বাড়ির অনেক অবদান। বাড়ির আশপাশে খেলতাম, কতজনের বাড়ির জানালার কাচ ভেঙেছিলাম হিসাব নেই। কারও জানালার কাচ ভেঙে বল ঢুকে গেলে সবাই পালিয়ে যেত, পরে পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে আস্তে করে গিয়ে বলটা নিয়ে আসতাম। ওই বাড়িটা ছিল দোতলা। ওখানে আমরা প্রায় ৩৮ বছর ভাড়া ছিলাম। তারপর আমরা ভাইরা মিলে বাড়িটা কিনেছি ২০০৯ সালে।
আমাদের পুরনো বাড়িটার পাশে আমগাছ, ডাবগাছ ছিল। পুরান ঢাকায় এত বড় বাড়ি পেয়েছিলাম বলেই আমার ছেলেবেলাটা রঙিন ছিল। বাড়ির পেছনের খালি জায়গাটাতে আমি কুকুর পুষতাম, ছাগল পুষতাম; মুরগিও ছিল আমার। আমি কখনো চাইনি আমার সে বাড়িটা রি-কনস্ট্রাকশন হোক। আমি চেয়েছি বাড়িটা অমনই থাক, ওখানে আমি থেকে যাব। আমার ছেলেমেয়েরা পরে বহুতল ভবন করলে করবে। কিন্তু কী আর করা! পরিবারের সিদ্ধান্তে বাড়িটা ভেঙে এখন নতুন দুটো বাড়ি করা হচ্ছে-আমার ভাইদের একটা, আমার একটা। ওই বাড়িটা কেনার পর আমি বকশীবাজারে ফ্ল্যাট কিনেছি তিন বছর হলো। কিন্তু ওই বাড়িটার কথা ভুলতে পারি না। এই ফ্ল্যাট-বাসায় থেকে আসলে নিজের বাড়ির যে শান্তি, আনন্দ-সেটা পাওয়া যায় না।
আমি যে আমগাছ, জামগাছ, ডাবগাছ দেখে বড় হয়েছি, এখানে ফুলের টবে ছোট ছোট গাছ দেখে তো সেই আনন্দ, সেই বাতাস পাওয়া যায় না। এখানে এসি দিয়ে, ফ্যান দিয়ে বাতাস সৃষ্টি করতে হয়। সেই বাড়িতে গরম লাগলেই বাড়ির পেছনের খালি জায়গাটাতে চলে যেতাম। প্রাকৃতিক বাতাসে শরীর জুড়িয়ে যেত। সেখানে দক্ষিণ হাওয়া লাগত না, জানালা খুলে দিলে সব দিক থেকেই বাতাস আসত। আমার সবচেয়ে খারাপ লেগেছে যখন গাছগুলো কাটা হচ্ছিল। আমার বাড়ির গাছগুলোকে আমি বেশি মিস করি। কারণ আমি বেশি গাছে চড়তাম। ধরুন বল মেরে কারও বাসার কাচ ভেঙে দিতাম। বাড়ির মালিক তাড়া করলে আমি সোজা গাছে উঠে বসে থাকতাম। আসলে প্রকৃতি আমাকে টানত। প্রাকৃতিক সবুজের যে অনুভূতি সেটা আমি ভীষণ রকম উপভোগ করতাম। আমার খেলোয়াড়ি জীবনের কত কথা বলতাম সেই গাছকে, সেই পাতার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে একা থাকতাম। খারাপ লাগে যে, গাছগুলো আর হয়তো পাব না।
তবে ঢাকা বদলেছে অনেক ইতিবাচক আবার নেতিবাচকভাবে। আগে বকশীবাজারে রাতের বেলা দূরে থাক, দিনের বেলাও হেঁটে যেতে পারতাম না ভয়ে। এত সুনসান, নীরব ছিল। এখন এখানে হাঁটাই যায় না ভিড়-যানজটের কারণে। একসময় ঢাকার নাম ছিল মসজিদের শহর, টাকার শহর। এখন হলো জ্যামের শহর। জ্যামের হাজারটা কারণ আছে। তার মধ্যে আমার মনে হয় ১০টা সমস্যাও যদি আমরা সমাধান করতে পারতাম, তাহলে যানজট ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে আসত। যেমন ফুটপাতে এবং রাস্তায় বসে থাকা স্থায়ী হকারদের কারণে রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। তারা রাস্তা, ফুটপাত দখল করে থাকে আর মানুষজন ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটে। ফলে বাড়ে যানজট। ঘটে দুর্ঘটনা। তাই প্রত্যেক এলাকায় যদি একটি নির্দিষ্ট জায়গায় হকার্স মার্কেট করে দেয়া হয়, সব হকার সেখানে বসে, আমার মনে হয় রাস্তার জ্যামটা কমত।
এখন আমি খেলোয়াড় হিসেবে আরেকটা বিপর্যয় দেখি। সেটা হলো রাজধানীতে আমাদের মাঠ কমে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এটি পরিবেশের জন্য তো হুমকি বটেই, আমাদের ক্রিকেটের জন্যও হুমকির। কারণ মাঠ না থাকলে, অনুশীলন করতে না পারলে, এদেশে ক্রিকেটার তৈরি হবে না। এখন তো ক্রিকেটে একটা বিশ্বমানে পৌঁছে গেছি আমরা, যার মাধ্যমে দেশকে উপস্থাপন করছি বিশ্ব-মানচিত্রে। সে জায়গাটি থেকে এখন মাঠ খুব দরকার। কিন্তু এই শহরে সেটি আর হচ্ছে কই? খালি জায়গা পেলেই বহুতল ভবন হচ্ছে। আমাদের নগরী কিন্তু এই বিল্ডিংয়ে অভ্যস্ত না, যে কারণেই হয়তো ঘনঘন ভূমিকম্প হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই যে অনেক বাড়িঘর হচ্ছে, ভবন হচ্ছে, যার কারণে আমরা আত্মীয়-স্বজনদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। পারিবারিক বন্ধন কমে যাচ্ছে। সৌহার্দ্য কমে যাচ্ছে। আগে যেমন আমাদের পুরান ঢাকার দোতলা বাড়িতে আমরা পরিবারের সবাই মিলে থাকতাম, এখন বিভিন্ন জায়গায় ফ্ল্যাট কিনে যে যার মতো থাকছে। কিন্তু আমি শেকড়কে ভুলতে পারিনি। আমি আবার ফিরে যাচ্ছি হোসনি দালানে, আমার পুরান এলাকায়। যদিও নতুন বাড়ি, তবুও একটু সান্তনা যে-ওই এলাকাটা আমার, এখানে একটা তৃপ্তি পাওয়া যায়। আর আমার জীবনে প্রাপ্তির জায়গা তো এগুলোই।

অনুলিখন : সুফিয়ান রায়হান

NO COMMENTS

Leave a Reply