Home মূল কাগজ আমার প্রিয় স্থাপনা : সংসদ ভবন

আমার প্রিয় স্থাপনা : সংসদ ভবন

মুস্তাফা খালিদ পলাশ


স্থাপত্যের সঙ্গে কেটে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। ১৯৮১ সালে বুয়েটে ভর্তি হয়েছি। শুরুতে স্থাপত্যকে একভাবে দেখেছি, শিক্ষাজীবনে আরেকভাবে, পেশাগত জীবনে অন্যভাবে। এখন তিন দশকেরও বেশি সময় পর এসে যদি প্রিয় স্থাপনার কথা বলি, তাহলে এক কথায় বলব সংসদ ভবন।
আমার মনে হয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যেকেরই প্রিয় স্থাপনা সংসদ ভবন। এমনকি ১৯৬১-৮২ সালে লুই আই কানের ডিজাইনে তৈরি আমাদের এ সংসদ ভবনটি বিশ্ব দরবারেও প্রিয়। কারণ স্থাপত্য বলতে কেবল একটি ভবনকে বোঝায় না, শিল্পকেও বোঝায়। কিন্তু সব স্থাপত্য শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছতে পারে না। সব ভবন কবিতার মতো হয় না। মানে, গদ্য খুব সহজ একটি জিনিস। এটা ভেঙে বলা যায়। কিন্তু কবিতা তা নয়। একটা মোটা বইয়ের উপন্যসের মাধ্যমে যতটা-না বলা যায়, অনেক সময় একটা কবিতায় তার থেকে বেশি বলা সম্ভব। কবিতা আমার কাছে পেইন্টিংয়ের মতো। একটি পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে যেমন অনেক কিছু বোঝানো যায়, তেমনি স্থাপত্যেরও কিছু বিশেষ দিক রয়েছে। এটা হলো ব্যবহারিক শিল্প। স্থাপত্য হলো একটা স্থানু বা সেডেন্টারি শিল্প-মাধ্যম। স্থাপত্যে যখন ব্যবহারের বিষয় চলে আসে, তখন তা কতটা শিল্প আর কতটা ব্যবহারিক সে বিষয়ে তুল্য জলাংকে মাপার বিষয়ও চলে আসে।

সংসদ ভবন এসবের মাত্রা অতিক্রম করেছে। এটিকে আমরা স্কাল্পচার বলতে পারি, কবিতা বলতে পারি এমনকি অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংও বলতে পারি। অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং বলছি, কারণ আমরা যে রিয়েলিস্টিক পেইন্টিং করি, তা অনেকটা ভেঙে ভেঙে গদ্যের মতোই করি। সেখানে বলে দেয়া থাকে এটা গাছ, এটা নদী, এটা নালা ইত্যাদি। কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিংয়ে বিমূর্ততা আছে। বিমূর্ততা হলো এমন জিনিস, যেখানে একেকজন দর্শক ছবিটি দেখে নিজের মতোই অনুধাবন করে। সেই অর্থে সংসদ ভবন শিল্পমান অর্জন করেছে। বিশ্বব্যাপী তার সমাদরও অনেক বেশি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা বা ঐতিহ্য কিন্তু খুব প্রাচীন নয়। আমরা কিন্তু নগর-সভ্যতায় অভ্যস্ত জাতি নই। আমরা কৃষক জাতি। মাটির ঘর, বেড়ার ঘর এগুলোই আমাদের ছিল। আমাদের স্থাপত্যের আধুনিক ধারার মূল সূত্রপাত হয়েছে সংসদ ভবন থেকে। লুই আই কান একজন বিদেশি স্থপতি হয়েও আমাদের জলবায়ু, আমাদের ম্যাটেরিয়ালকে কনসিডার করেছেন। তিনি আমাদের এ আবহাওয়ার জন্য অত্যন্ত নতুন, রেজিলিয়ান, ডিউরেবল ও সাসটেইনেবল ম্যাটেরিয়াল উপহার দিয়ে গেছেন, যা আমরা এখন ব্যবহার করছি। সংসদ ভবনে খুব সহজ ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে। এটির অনেক অ্যান্সিলারি স্ট্রাকচার আছে। যদি বলি একটা মালার কথা, তাহলে লকেট অর্থাৎ মূল ভবন নিরেট কংক্রিটের তৈরি। সেই সময়ে ওই ধরনের একটা স্থাপনা চিন্তা করা, নির্মাণ করা বা সেটা ধারণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। ধরুন আমি অনেক কিছু করলাম কিন্তু যে গ্রাহক, গ্রাহক বলতে আমি এ জাতিকে বোঝাচ্ছি, আমাদের সেটাকে ধারণ করতে প্রথমদিকে কিছুটা কষ্ট হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল অ্যাবিলিটি বেড়েছে, আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছি, তখন আমরা মনে করেছি, এ কংক্রিটের সংসদ ভবন আমাদের নতুন স্থাপত্যের সূচনা। পুনঃসূচনাও বলা যেতে পারে। আমি আগেই বলেছি, আমাদের তো আসলে সেরকমভাবে নগর স্থাপত্য ছিল না। এখান থেকেই সূচনা বা পুনঃসূচনা হয়েছে।

s-01

সংসদ ভবন

স্থপতি মাজহারুল ইসলাম এবং স্থপতি লুই আই কানের মাধ্যমেই আমাদের আধুনিক স্থাপত্যের সূচনা বা সূত্রপাত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আমরা এখনো কাজ করে যাচ্ছি। তবে মাঝে কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। আগেই বলেছি, আমরা ছিলাম কৃষক জনগোষ্ঠী। আর ধনাঢ্য জনগোষ্ঠী ছিল হিন্দু। হিন্দুদের যে জমিদার বাড়ি ছিল সেগুলোর নকশা তারা বাইরে থেকে করে নিয়ে আসত। এরপর আমরা যখন বড়লোক হলাম তখন বিপদটা ঘটল। আশির দশকে এসে আমরা বিপদটা অনুভব করলাম। তখন নব্য বড়লোকেরা সংসদ ভবনকে পাশ কাটিয়ে নতুন ধারা তৈরি করার চেষ্টা করল। ভিক্টোরিয়ান স্টাইল। বড়লোকরা ভাবত আমিও জমিদারদের মতো একটা বাড়ি বানাব, যেখানে আমার গ্রামের লোকেরা এসে স্যান্ডেল খুলে ভেতরে প্রবেশ করবে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, নব্বইয়ের দিকে এসে এ ধারা উবে যেতে থাকল। আবার সেই পিওরিটিতে আমরা ফিরে আসতে থাকলাম। পিওরিটি বলতে বোঝাচ্ছি কসমেটিক ছাড়া। যেমন সংসদ ভবনে কোনো কসমেটিকের কাজ নেই। অর্থাৎ ওটা যে ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি, সেটারই প্রতিফলন দিচ্ছে।
আমরা অনেকেই মনে করি আমাদের স্থাপত্যের মূল উৎস কী হবে। এটা নিয়ে অনেক দ্বন্দ্ব আছে। আমার মতে, আমাদের স্থাপত্যের উৎস হচ্ছে স্বচ্ছতা। আমি মানবিক অর্থে স্বচ্ছতার কথা বলছি, কাচের স্বচ্ছতা না। অর্থাৎ আমি যা, তা-ই। আমরা নব্য বড়লোকের কথা বলতে পারি। যেমন সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরের নব্য বড়লোকেরা ছিল মূলত জেলে-গোষ্ঠী। চায়নার নিন্মবর্ণের চাইনিজরা একসময় সিঙ্গাপুরে থাকত। এরপর মালয়েশিয়া যখন সিঙ্গাপুর থেকে আলাদা হয়ে গেল, তখন সিঙ্গাপুরের ওই চাইনিজরা টাই পরে ফিটফাট বাবু হয়ে গেল। আবার মালয়েশিয়াতে গেলে আপনি অরিজিনাল কিছু চাইনিজের দেখা পাবেন। তারা কিন্তু টি-শার্ট পরেই দিব্যি অফিস করছে। যারা মাটির থেকে তৈরি হয়, তারা কিন্তু ওইসব বেশভূষা প্রাধান্য দেয় না। বেশভূষা তারাই প্রাধান্য দেয়, যারা মেকি।

স্থাপত্যে মেকি বিষয়ে আমরা বিশ্বাস করি না। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, মাজহারুল ইসলামবা সংসদ ভবন থেকে উৎসরিত বিষয়গুলোর ভালো জিনিসগুলো নিয়েই আজ আমরা স্থাপত্যচর্চা করছি। প্রত্যেক স্থপতি এখন কয়েকটি বিষয় নিয়ে খুব সচেতন। কারণ স্থাপত্যের তো অনেক ভাষা থাকে, যেমন ইন্টারন্যাশনাল স্টাইল, রিজিওনাল, ডি-কনস্ট্রাকডিভ ইজম ইত্যাদি থেকে বেছে আমরা কিন্তু আমাদের একটা নিরেট স্থাপত্যধারা বের করতে পেরেছি। যেখানে পাশ্চাত্যের সঙ্গে আমাদের ভাবধারা, আমাদেরর ভ্যালুজ, মূল্যবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণ হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছে, যেমন আমরা যারা শহরে কাজ করছি তারা এক ধরনের কাজ করছি, কেউ কেউ রি-সাইকেল ম্যাটেরিয়াল নিয়ে কাজ করছে। কেউ গ্রামীণভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে। গ্রামীণ স্টাইল নিয়ে কাজ করা যেতেই পারে। তবে ভবন যদি ২০তলা হয়, সেখানে এ স্টাইল সম্ভব না। কারণ এত বড় ভবন বাঁশ, বেত কিংবা মাটি দিয়ে নির্মাণ করা সম্ভব না। মাটি দিয়ে রিসোর্ট করা যেতে পারে।

আমাদের স্থপতিরা এখন খুব ভালো ভালো কাজ করছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশ থেকেও পুরস্কার পাচ্ছে। আমি মনে করি, একটি দেশের আর্কিটেকচার-চর্চার যদি এক শতাংশকেও আপনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন, তাহলেই সেটাকে সার্থক বলা যায়। বর্তমানে আমরা সেই অবস্থাতেই আছি।
লুই আই কানকে মাস্টারপ্ল্যানের জন্য দেয়া হয়েছিল ২০০ একর জমি। কিন্তু তিনি কাজ করেছিলেন ৬০০ একর জমির ওপর। সত্যি বলতে কি, যেকোনো ভালো কাজ ধরে রাখাই কঠিন, যদি সামগ্রিক চাপ থাকে। আমাদের সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে, আমদের জনসংখ্যার চাপ। এ চাপেই ঢাকা শহরের যেখানে একতলা, দুইতলা ভবন ছিল সেখানে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। প্রয়োজন থেকেই এটা উৎসরিত হচ্ছে। এত চাপের মধ্যেও আমরা আর্কিটেকচারকে জলাঞ্জলি দিচ্ছি না। যেমন সংসদ ভবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আসলে নিরাপত্তার পরিপ্রেক্ষিত পরিবর্তন হয়েছে। সংসদ ভবনে যেন দেয়াল তুলে দেয়া না হয়, এজন্য আমরা স্থপতিরা নিষেধ করেছি। কিন্তু নিরাপত্তার কিছু অঙ্ক আছে। সে অঙ্কও আপনাকে বুঝতে হবে। কারণ একজন মানুষ যতটাই আবেগ দিয়ে তাড়িত হোক না কেন, মনে রাখতে হবে নিরাপত্তার অঙ্ক, সেটা কেবলই অঙ্ক। সেটা কবিতা নয়, একটা নিরেট বিজ্ঞান। সেই বিজ্ঞানে তাদের মনে হয়েছে তাদের সেটা ঢাকতে হবে। দেয়াল সবসময় দূরত্ব তৈরি করে। তাই আমরা আন্দোলন করে যতটা পারা যায় নিরেট না করে পারফোরেটেড করাতে পেরেছি। ভেতরেও অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে আমাদের জন্য আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান সরকার সংসদ ভবনকে আগের চেহারায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই অনুসারে কাজও শুরু হয়েছে। যেমন সংসদ ভবনের নির্মাণের অনেক বছর কেটে গেলেও তার ফার্মেও কিছু ফি বাকি ছিল, এ সরকার তার এক্সপার্ট টিম পাঠিয়ে ফি পরিশোধ করে সব ড্রইং নিয়ে এসেছে। সেই ড্রইং অনুসারেই কাজ হবে। সংসদ ভবনকে ফিরিয়ে নেয়া হবে তার অরিজিনাল চেহারায়। আর এ কাজ বাস্তবায়নের জন্য অনেক ভবন ভেঙে ফেলা হবে। জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে ফেলা হবে। মনে রাখতে হবে, এটা একটা বিশ্ব ঐতিহ্য। ইউনেস্কোর মতো একটা প্রতিষ্ঠান যখন বুঝতে পেরেছে, এটা কেবল ঐতিহ্যই নয় বরং এটি থেকে অনেক কিছুই আহরণ করা সম্ভব, তখনই তারা এটাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

s-02

সংসদ ভবন

সংসদ ভবন কোনো মসজিদ বা মন্দির নয়। এটা এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে বাঙালি জাতি পরিচালিত হয়। সেই হিসেবে এটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং সৌভাগ্যবশত পৃথিবীর অন্যতম ভালো স্থাপত্য। কারণ স্থাপত্য হলো এমন যেন একে ব্যবহার করা যায়। পিরামিড বা তাজমহলকে স্থাপত্য বলা যাবে না, সেগুলো স্কাল্পচার। পিরামিডও একটা স্কাল্পচার কারণ সেখানে একজন মানুষকে কবর দেয়া হয়েছে। সেখানে ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। বাইরে থেকে কেবল দেখতে হয়। আমার কাছে তাজমহলও তাই। তাজমহলের শৈল্পিক-মূল্য থাকতে পারে কিন্তু কোনো স্থাপত্য-মূল্য নেই।
যদি মাজহারুল ইসলাম প্রসঙ্গে বলি, তাহলে বলব তিনি মনে হয় স্থপতি হওয়ার জন্যই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়েছেন, ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়েছেন। এরপর ইয়েলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। আসলে তিনি না থাকলে হয়তো আমরা লুই আই কানকেও পেতাম না। কারণ প্রথমে তাকেই সংসদ ভবনের কাজ করার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তখন আলবার আল্টো এবং লিকরবুশিওর এই দুজনের নাম প্রপোজ করেন। দেশভাগের পর যখন পাঞ্জাবকে দুই ভাগ করা হলো, পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোর পড়ে গেল পাকিস্তানের দিকে। এরপর চন্দ্রীগড়কে যখন নতুন করে রাজধানী করা হলো, তখন চন্দ্রীগড়ের রাজধানীর মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে লিকরবুশিওর ব্যস্ত ছিলেন। অন্যদিকে আলবার আল্টো ছিলেন অসুস্থ। তখন লুই আই কানের বয়স ছিল পঞ্চান্নর মতো। মাজহারুল ইসলামের স্থাপত্যও আমাদের জন্য অনুকরণীয়। কারণ তারা একই গোষ্ঠীর। মাজহারুল ইসলামের কাজের সঙ্গে লিকরবুশিওরের কাজগুলো মেলে। কিন্তু সেদিক থেকে অনেকটাই আলাদা লুই আই কানের এ কাজ অর্থাৎ আমাদের গর্বের সংসদ ভবন।

NO COMMENTS

Leave a Reply