Home মূল কাগজ আপন আবাস আমার বাসা প্রশান্তিময় এক জায়গা

আমার বাসা প্রশান্তিময় এক জায়গা

0 76

সুজেয় শ্যাম

ঢাকার ধানমন্ডির কলাবাগানে একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলায় বাস করছেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের কন্ঠযোদ্ধা ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত সঙ্গীত-পরিচালক সুজেয় শ্যাম। জৌলুসহীন কিন্তু সুন্দর, গোছানো বাসা। ড্রয়িংরুমে রাখা দুটি শোকেসে থরে থরে সাজানো অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননার ক্রেস্ট ও সনদ। এক কোনে ছোট বুকশেলফে শোভা পাচ্ছে কিছু মূল্যবান বই। প্রশান্তিদায়ক এই ড্রয়িংরুমে থাকা বেতের সোফায় বসে গুণী এই মানুষটি সোহরাব শান্তকে জানিয়েছেন তার আবাস ও নগর-ভাবনা সম্পর্কে।

আমার একটাই মেয়ে। একমাত্র সন্তান। আমার বাসা প্রশান্তিময় এক জায়গা। মেয়ের জামাই একজন শিক্ষক। আমার দেখাশোনা করার জন্য মেয়ে চাকরি-বাকরি করলো না। আমার স্ত্রী ছিলেন চিকিৎসক। মেয়ে হওয়ায় কিছুটা মন খারাপ করেছিল! কিন্তু আমরা ভাগ্যবান আমাদের মেয়ে অসাধারণ মানুষ।
মেয়ে আর ছেলেতে পার্থক্য করার সুযোগ কম। ১৯৯৯ সালে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে মেয়েই আমার দেখাশোনা করে।
ঢাকার মিরপুরে আমাদের নিজস্ব যে বাড়ি ছিল, আমার চিকিৎসার জন্য কয়েক বছর আগে সেটা বিক্রি করে দিতে হয়েছে। আমার সিলেটের যে জায়গা ছিল, বিক্রি করতে হয়েছে সেটাও।
আমার এই ভাড়া করা ফ্ল্যাট; এখানে বিরাট বড় দুটা ভবন। কিন্তু সামনের রাস্তা সরু। একটা অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারবে না। একটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারবে না। একটু বৃষ্টি হলে পানি জমে যায়। আশেপাশে কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে; রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে অবস্থাটা কী হবে? কোনো ভবনে আগুন লাগলে কী হবে? কেউ এসব বিষয়ে চিন্তা করে না যে, বাড়ির সামনে একটু চওড়া রাস্তা যদি রাখি সবার জন্যই সুবিধা।
আমরা আধুনিক হচ্ছি। ১০-১২তলা বাড়ি বানাচ্ছি। কিন্তু সচেতনভাবে বানাচ্ছি না। যদি কখনো বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, সরু রাস্তাগুলো দিয়ে ঢুকে লোকজনকে উদ্ধার করাই তো মুশকিল হবে। এই যে পুরান ঢাকা; কোনো কোনো গলিতে একটা রিকশা ঢুকলে আরেকটা রিকশা যাওয়া কষ্টকর। তো, আগুন লাগলে অবস্থাটা কী হবে? চকবাজার বা নিমতলীর ঘটনা তো ঘটেই গেল। তা ছাড়া আগুন নেভাতে পানি নিতে হচ্ছে বাইরে থেকে। পানিটা নেবে কোনদিক দিয়ে? এমনকি আমাদের দেশে যারা পরিকল্পনা এবং স্থাপনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত তারা কতটা দায়িত্বশীল? পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া ব্রিজ বা আমাদের সিলেটের কিন ব্রিজ, ভৈরব রেল ব্রিজ এসব শত বছর আগের, ব্রিটিশ আমলে করা। এখনো তো এসব ব্রিজ দিয়ে গড়ি চলে। আর এখন? আজ ব্রিজ বানায় তো কাল ভেঙে পড়ার অবস্থা!
ঢাকা শহরে আগে ময়লা নেওয়ার মানুষ ছিল না। এখন প্রত্যেক পাড়ায় পাড়ায় ময়লা নেওয়ার লোক আছে। আমার বাসা থেকেও নিয়ে যায়। কিন্তু অনেকেই যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে। গাড়িতে বসে খেয়ে মোড়ক বা প্যাকেটটা রাস্তায় ফেলে। এই স্বভাব দূর করতে হবে। যতদিন এই স্বাভাব পরিবর্তন না হচ্ছে, কোনো পরিকল্পনাতেই শহর পুরোপুরি সুন্দর হবে না। অযথা সরকারকে দোষারোপ করে লাভ নাই। শহর সুন্দর রাখতে নাগরিকদেরই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
যানজটমুক্ত শহরের কথা বলছি আমরা। গাড়িটা আমি চালাই বা আমার ড্রাইভার চালাক ড্রাইভার যদি শহরের ভেতরে ১০০ মাইল বেগে চালায়, তাকে বাঁধা দেব। এটাই উচিত। ১০ মাইল বেগেও যদি চালায় হর্নটা যেন কম বাজায়।
আমার বাড়ি সিলেট। গ্রামের বাড়ি ছিল সিলেটের ইন্দ্রেশ্বর। সিলেট শহরের কাষ্টগড়েও বাড়ি ছিল। ১৯৬৪ সালে গিটারবাদক হিসেবে চট্টগ্রাম বেতারে আমার চাকরি হয়। তখন চট্টগ্রাম খুবই সুন্দর একটা জায়গা ছিল। এত মানুষজন ছিল না। এত অট্টালিকাও ছিল না। খুব ভালো লাগত। স্বপ্নপুরীর মতো মনে হতো। সিলেটও খুব সুন্দর ছিল।
এক পর্যায়ে আমি চট্টগ্রাম বেতারের স্টাফ হই। তখন রেডিওতে স্টাফ হওয়া খুব ঝামেলার ব্যাপার ছিল। যা-ই হোক, ১৯৬৮ সালে আমি চট্টগ্রাম বেতারের চাকরি ছেড়ে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকা রেডিওতে চাকরি নিই। বাচ্চাদের অনুষ্ঠান করতাম। বড়দের অনুষ্ঠানও করতাম। আর গিটার-পিয়ানো এগুলো বাজাতাম। এর সঙ্গে আমি চলচ্চিত্রেও যুক্ত হলাম। ঢাকা তখন ছিল একটা পরিপূর্ণ সুন্দর চাদরে মোড়ানো শহর। তখন আমি ফার্মগেটে আনন্দ সিনেমা হলের পেছনে থাকতাম। অবশ্য প্রথমে এসে উঠেছিলাম ধানমন্ডিতে, দুই নম্বর রোডে। তখন এত যানজট ছিল না। মানুষের মনও ভালো ছিল। এতো সড়ক দুর্ঘটনাও ছিল না। এখন মানুষ অনেক বেড়েছে। ঢাকা শহরের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
ঢাকা শহরের পরিচ্ছন্নতা ও বিশুদ্ধতার জন্য শুধু সরকারের দিকে চেয়ে থাকলে হবে না। আমার-আপনারও কর্তব্য আছে। আমি যেমন আমার এই ভাড়া বাসাটার দেয়াল থেকে শুরু করে সবকিছু পরিচ্ছন্ন রাখি। এখন আমি যদি অকারণে দেয়াল নোংরা করি, এটা তো আমার দোষ। এই যে ঢাকা শহরে এতো ফুটওভার ব্রিজ, এগুলোতে মানুষ উঠতে চায় না।
নগরীর কোনো দোষ নাই। এই মাটিতে এখনো আমগাছে আম ধরে। জামগাছে জাম ধরে। গন্ডগোলটা হলো আমাদের মধ্যে। ঢাকা শহর কোনো মেয়র এসেই ঠিক করতে পারবে না, যতক্ষণ-না সমস্যাগুলোকে আমরা নিজের করে নিচ্ছি। আমার মেয়ে এবং মেয়ের জামাই প্রতিদিন ঘরটা ঝাড়ু দেয়। মোছে। রান্নাঘর পরিষ্কার করতে সমস্যা হলে অনেক সময় আমার গাড়ির চালক সহায়তা করে। ও ১৮ বছর ধরে আমার সঙ্গে আছে। নিজের ছেলের মতোই দেখি ওকে। আমরা যা খাই, সেও তাই খায়। আসলে যতক্ষণ-না একান্নবর্তী মনোভাব এসেছে, ততক্ষণ কোনো ঘর পরিপূর্ণ সুন্দর হতে পারে না। আমাদের দেশে আগে তো একান্নবর্তী পরিবারই ছিল। এখন প্রায় সবই একক পরিবার।
একটা সময় আমাদের দেশের মায়েদের অধিকাংশেরই অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। তাদের আট-দশজন করে সন্তান হয়েছে। সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ জজ-ব্যারিস্টার হয়েছে। তারা কিভাবে সন্তান মানুষ করেছেন? বাবারা তো কাজের ব্যস্ততায় সন্তান মানুষ করার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। মায়েরা পেরেছেন। কারণ তাদের ভালোবাসা ও মমতা ছিল তুলনাহীন। ভালোবাসা একটা বিরাট ব্যাপার।
শহরে আজকাল গাছ নেই বললেই চলে। অথচ চাইলেই সবুজের সঙ্গে থাকা যায়। চাইলে শহরেও টুকটাক কৃষিকাজ করা যায়। বিশেষত ছাদবাগান এবং বারান্দায় সবজি চাষ। সবাই যদি এমন করতো, তাইলে আজ দূষিত খাবার খাওয়ার দরকার ছিল না। এখন কেউ যদি মনে করে, ধুর, পয়সা আছে আমি বাজার থেকে কিনে শাক-সবজি-ফল খাব। তাহলে আর কী করার? বিদেশে বাড়ি বা ফ্ল্যাটের সামনে ফুলের বাগান আছে। আমি লন্ডনে দেখেছি এটা, কারও বাগানের দিকে কেউ হাত বাড়ায় না। এখানে একটা ফুলের বাগান করলে বেড়া দিয়েও নিরাপদ রাখা সম্ভব না।
এ জন্য সচেতনতা দরকার। আমি যদি আমার বাসার সামনে ময়লা ফেলে রাখি, মেয়র কী করতে পারবেন? পাশের বাসায় একজন অসুস্থ মানুষ আছেন। আমি-আপনি উচ্চৈস্বরে গান বাজালাম। এতে রোগির অসুবিধা হয়। রাস্তায় অকারণে হর্ন বাজাতে থাকলাম। এমনও হর্ন আছে শুনলে গাড়িতেই ফিট হয়ে পড়ে যাওয়ার যোগাড় হয়। এটা তো শুধু আইন করে বন্ধ করার ব্যাপার না। এটা বিবেকেরও ব্যাপার।
তাই সুন্দর শহর চাইলে মনটাকে আগে সুন্দর করতে হবে। সচেতন হতে হবে নিজেদেরই।

NO COMMENTS

Leave a Reply