Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার একটা বিল্ডিং এনার্জী এফিসিয়েন্ট করা খুব জরুরী

একটা বিল্ডিং এনার্জী এফিসিয়েন্ট করা খুব জরুরী

0 69

স্থপতি নবী নেওয়াজ খান
আর্কিটেক্ট পার্টনার, আর্কি গ্রাউন্ড
সহকারী সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট

সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ মির্জা মাহমুদ আহমেদ

আপনার বেড়ে ওঠার গল্প শুনতে চাই। স্থপতি হওয়ার ভাবনাটা কবে এলো?
আমার জন্ম ঢাকায়। বেড়ে ওঠা কলাবাগান এলাকায়। উদয়ন স্কুল থেকে এসএসসি, ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে ভর্তি হলাম বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। স্থপতি হব বা স্থাপত্য পেশায় আসবো কখনো ভাবিনি আগে। ছোটবেলায় ভালো ছবি আঁকতাম, অনেক পুরস্কারও পেয়েছি। স্কুলে পড়ার সময় মা একবার বলেছিলেন,তোর তো ছবি আঁকার শখ। তুই বড় হয়ে স্থপতি হতে পারিস। বুয়েটে স্থাপত্য বিভাগে চান্স পাওয়ার পর দেখলাম আমার চাওয়া- পাওয়া, এসপিরেশন এবং চিন্তা ভাবনার সঙ্গে এ পেশাটা অনেকখানি মিলে যাচ্ছে।
এখন যখন চিন্তা করি,মায়ের ওই কথাটা খুব মনে পড়ে, নাড়া দেয়।
বুয়েটের সময়টা আমার কেটেছে শেরেবাংলা হলে। ৩১১ নাম্বার রুমে আমরা চার-পাঁচজন বন্ধু মিলে থাকতাম। সেখানেই লেখাপড়া, সেখানেই কাজ।
রাত জেগে মডেল বানানো, ডিজাইন করা, ড্রইং বানানো। হলে অনেক মজার স্মৃতি আছে আমার। একসঙ্গে কাজ করতে করতে মধ্যরাতে বের হয়ে যাওয়া। পলাশীর মোড়ে আড্ডা, পুরনো ঢাকায় কাবাব-পরোটা খাওয়া। একসঙ্গে মুভি দেখা। গভীর রাতে হলের ছাদে গিয়ে গান-বাজনা করা। হলে থাকার সুবাদে সুন্দর একটা সময় কেটেছে। সিনিয়র-জুনিয়ররা একই মনমানসিকতার হওয়ার কারণে একাডেমিক কাজে যেমনি সহায়তা পাওয়া যেত, তেমনি সময়টাও ছিলো খুব উপভোগ্য। যেটা এই সময়ে খুব অভাববোধ করি। আর্কিটেকচারে নলেজ শেয়ারিং খুব গুরুত্বপূর্ণ। একটা ড্রইং সবাই দেখছে,মতামত দিচ্ছে, অনেকগুলো চোখ দিয়ে আমার মডেল বা ড্রইং জাস্টিফাই হচ্ছে-শেখাটা তখন আরও প্রগাঢ় হয়। একসঙ্গে কাজ করা স্থাপত্য পেশায় খুবই জরুরী। আমি এখন ব্র্যাকে শিক্ষকতা করছি। আমি আমার শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেই যাতে ওরা একসঙ্গে কাজ করে। তাতে অনেকগুলো চোখ দিয়ে একটা জিনিস দেখা হয়, ভাবনার সমন্ধয় হয়, নানা রকম মতামত পাওয়া যায়, দৃষ্টিভঙ্গীটাও সমৃদ্ধ হয়।
আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৯-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা আম্বার ডেনিম লুম শেড এবং আপনার সাম্প্রতিক কাজ সম্পর্কে জানতে চাই?
আম্বার ডেনিম লুম শেড আসলে আমাদের ফার্মের একটা প্রজেক্ট। ডেনিম লুম শেডের স্থাপত্য ভাবনাটা ছিলো আমার পার্টনার জুবায়ের হাসানের। সহযোগী হিসেবে ছিলাম আমি এবং লুৎফুল­াহিল মজিদ রিয়াজ। আমাদের তিনজনের প্রতিষ্ঠান-আর্কি গ্রাউন্ড। ডেনিম লুম শেড একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা। এতে আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পের ছোট একটা মিজেন টাইপ বলতে পারেন। তাঁতশিল্পের বির্বতন এই কারখানাটিতে তুলে আনা হয়েছে। তাঁত থেকে শুরু করে সেমি অটোমেটেড মেশিন, ফুল অটোমেটেড মেশিন বস্ত্রখাতের ট্রান্সফরমেশনের সুন্দর একটা গল্প পাওয়া যায়।
বর্তমানে আমরা কিছু আবাসন প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত। সেইসঙ্গে মসজিদ প্রজেক্ট, গ্রিণ ফ্যাক্টরী বিল্ডিং, কর্মাশিয়াল অফিস প্রজেক্টের কাজ করছি। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরী বিল্ডিংটা আমার ডিজাইন করা। ওদের পার্মানেন্ট ক্যাম্পাসটাও আমার ডিজাইনে তৈরি। লাইব্রেরি বিল্ডিংটার বিশেষত্ব হচ্ছে এর পুরো ম্যাটারিয়েলটা ছিলো হ্যান্ডমেইড। আমার উদ্দেশ্য ছিলো লো-কস্টের ম্যাটারিয়াল দিয়ে বিল্ডিংটা বানানো। একদিন সাইটে গিয়ে দেখলাম অযত্ন-অবহেলায় কিছু সুরকি পড়ে আছে। আমার ভাবনায় এলো এই সুরকিগুলোকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়। সুরকিগুলোকে মর্টার দিয়ে গুলিয়ে একটা আস্তর করলাম। আস্তরণটা প্লাস্টারের মতোই যাকে আমরা আর্কিটেকচারের ভাষায় ‌‌‌’পেবেল ওয়াস টেকনিক’ বলে থাকি। এই প্রক্রিয়াতে সুরকিগুলোকে মর্টারে গুলিয়ে প্লাস্টারের মতো আস্তরণ তৈরি করা হয়। তারপর লেপা হয়। আস্তরণটা জমাট বাঁধার পর পানি দিয়ে ধোঁয়া হয়। পানি দিয়ে ধোঁয়ার পর সুরকির দানাগুলো বের হয়ে আসে। পুরো বিল্ডিংটা লাল অবয়ব ধারণ করে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পুরো নকশাটা করা হয়েছে রিসাইকেল ম্যাটারিয়ালস ব্যবহার করে। ভবনের নকশা প্রক্রিয়াটিও পুরোটা ক্রাফটসম্যানশীপ নির্ভর। বিল্ডিংয়ের আউটার ইনার দুই জায়গাতেই একই ধরনের ম্যাটারিয়াল অর্থাৎ সুরকি দিয়ে ক্রাফটিং করা হয়েছে। পড়ে থাকা অব্যবহৃত সুরকি দিয়ে এত সুন্দর নকশা করা যায় এই বিল্ডিংটা না দেখলে কেউ বিশ্বাস-ই করবে না।
ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় ‘গ্রীণ আর্কিটেকচার’ কি ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন?
আমাদের ট্রাডিশনাল স্থাপনা যেগুলো আছে গ্রাম বাংলার বা আদিবাসীদের আদি যে কাঠামোগুলো-সবই কিন্তু গ্রিণ। এসব স্থাপনা ‘গ্রিণ’ করার জন্য কোন বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হয়েছে ব্যাপারটা এমন নয়। এখনকার সময়ে যে কর্মাশিয়াল বিল্ডিং বা ফ্যাক্টরী বিল্ডিংগুলো হচ্ছে, সেগুলো কিন্তু অনেকখানি এনার্জী কনজ্যুম করছে। বিল্ডিংগুলোর স্ট্রাকচার এমনভাবে করা হয়েছে যাতে করে সবসময় এসি ছেড়ে রাখতে হচ্ছে। পানির অপচয় বেশি হচ্ছে। ইলেকট্রিসিটি বেশি খরচ হচ্ছে। এগুলো কিন্তু ভালো লক্ষণ না।
একটা বিল্ডিং কীভাবে এনার্জী এফিসিয়েন্ট করা যায়,ইকোনমিক্যালি কীভাবে আরও সাশ্রয়ী করা যায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেটা খুব জরুরী বিষয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকারও কিন্তু এখন ‘গ্রিণ বিল্ডিং’ নির্মাণে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্মাণাধীন হাইরাইজ ভবনগুলোতে কীভাবে এসি, ইলেকট্রিসিটির ব্যবহার কমানো যায়, পানির অপচয় কিভাবে কমানো যায়, রেইন ওয়াটার কিভাবে হারভেস্ট করা যায়-এসব বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে সরকারের জোরালো নির্দেশনা আছে। ঢাকার প্রেক্ষাপট এবং গ্লোবাল প্রেক্ষাপটেও যদি বলি,বর্তমান সময়ে হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণে অবশ্যই গ্রিণ সাসটেইনেবল হওয়া উচিত। একটা বিল্ডিংকে গ্রিণ বিল্ডিং হিসেবে দাঁড় করাতে বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই। যদি স্বাভাবিকভাবে একটা বিল্ডিং এর পশ্চিম দিকের তাপটা আটকাতে পারি, দক্ষিণের বাতাসটা আনতে পারি, উত্তরের আলোটা কাজে লাগাতে পারি, ইলেকট্রিসিটি ও পানির খরচ কমাতে পারি, তাহলে একটা বিল্ডিং এমনিতেই গ্রিণ হয়ে যায়। আমাদের এমনিতেই ন্যাচারাল রির্সোস কম । যতটুকু আছে, তাও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় স্থপতি হিসেবে এসব ন্যাচারাল রির্সোস ও পরিবেশ রক্ষায় আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। আমাদের ভুলের কারণে বা অসচেতনতায় পৃথিবীর ক্ষতি হোক, মানুষের ক্ষতি হোক-সেটা চাই না। তাই সবারই উচিত যার যার জায়গা থেকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসা।

NO COMMENTS

Leave a Reply