Home চট্টগ্রাম এবার বর্ষায়ও ডুববে চট্টগ্রাম নগর!

এবার বর্ষায়ও ডুববে চট্টগ্রাম নগর!

মিলছে না পাঁচ হাজার কোটি টাকার চলমান প্রকল্পের সুফল

আবদুল্লাহ আল মামুন

১৫ জুন। দুপুর দেড়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে বৃষ্টি হয় ২২ মিলিমিটার। আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে ডুবে যায় নগরের একাংশ। কোথাও হাঁটু-পানি, কোথাও আবার কোমর-পানি। বর্ষার ভারি বর্ষণে কী হবে-তা নিয়ে শঙ্কায় নগরবাসী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও এবারও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে রেহাই মিলছে না নগরবাসীর। তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, খাল ও নালা-নর্দমা খনন করায় বৃষ্টি হলে পানি আগের মতো জমবে না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেডের সদর দপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, ‘নগরের খালগুলোর যে প্রশস্ততা থাকার কথা-তা নেই। বিভিন্ন জায়গায় খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। অবৈধ স্থাপনা থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফল পাওয়া যাবে না।’
শিগগিরই খালের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে বলেও জানানো হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প-পরিচালক ও সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু সাদাত মোহাম্মদ তানভীর বলেন, ‘নগরে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার কারণে ভারী বর্ষণের পরপরই সড়কে পানি জমে যায়। তবে প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে যেখানে এক-দুদিন পানি জমে থাকত, এখন দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাচ্ছে। আগামী দিনেও এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যাবে।’
জলাবদ্ধতা-সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্টে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। অনুমোদনের পৌনে দুই বছর পার হলেও এখনো পর্যন্ত নগরবাসীকে আশার আলো দেখাতে পারছে না সিডিএ।
প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় আট মাস পর গত বছরের এপ্রিলে খাল ও নালা-নর্দমার খননকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খননের কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩টি খাল খনন হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ আছে মাত্র এক বছর। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। এই সময়ে ব্যয় হয়েছে ৪১৮ কোটি টাকা। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে।
আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণে নগরের চকবাজার, প্রবর্তক মোড়, জিইসি মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেইট, মুরাদপুর মোড়, আগ্রাবাদ, হালিশহর, খুলশী, ওয়ারলেস মোড়, বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, শুলকবহর, কাতালগঞ্জ, বাকলিয়া, ষোলশহর আল ফালাহ গলিসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর-পানিতে তলিয়ে যায়।
গত ২৪ মে রাতে ১৫ মিলিমিটারের অল্প বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এর আগে, গত ২ এপ্রিল রাতে বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমের আগেই জলাবদ্ধতা হওয়ায় পরদিন ৩ এপ্রিল নগর ভবনে জরুরি বৈঠকে বসেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা। ওই বৈঠকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীর গতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
প্রকল্প-সূত্র জানায়, প্রকল্পের অধীনে ৩৬টি খাল খনন করা হবে। তিন পর্যায়ে নগরের খালগুলো খনন ও সংস্কার করা হচ্ছে। প্রথম দফায় গুরুত্ব অনুযায়ী ১৬টি আবর্জনা পরিষ্কার কাজ চলছে। এর মধ্যে রয়েছে মহেশখাল, বির্জা খাল, ডোমখালী খাল, চাক্তাই খাল, খন্দকিয়া খাল, রাজাখালী খাল, চাক্তাই সংযোগ খাল, মহেশখালী খাল, মির্জাখাল, নোয়াখাল, ফিরিঙ্গীবাজার খাল, কলাবাগিচা খাল, সদরঘাট খাল, নাছির খাল, বামনশাহী খাল ও হিজরা খাল। গত বছর খালগুলো থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ঘনফুট এবং চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ৪২ লাখ ঘনফুট মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি খালগুলো থেকে পরবর্তী পর্যায়ে মাটি উত্তোলন করা হবে।
তবে সরেজমিন চাক্তাইখাল ঘুরে দেখা গেছে, খালটি খনন করা হয়েছে দাবি করা হলেও খালটির অধিকাংশ এলাকাই আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। খালটির চকবাজার ধুনিরপুল এলাকায় আবর্জনার স্তরের ওপর হেঁটে পার হচ্ছে শিশুরা। একই অবস্থা খালটির মিয়াখান নগর ব্রিজ ও কোরবানিগঞ্জ এলাকায়ও।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর বর্ষায় জলাবদ্ধতার কারণে খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হাজার কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। এবারও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কারণ চাক্তাইখালের অনেক জায়গা আবর্জনায় ভরাট হয়ে আছে। বর্ষা চলে এসেছে অথচ এখনো এসব আবর্জনা অপসারণ করা হয়নি।’
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘সিডিএ অপরিকল্পিতভাবে প্রকল্প নেওয়ার কারণে দৃশ্যমান কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর প্রকল্পের কাজ শুরুর সময় সিডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেছিলেন, ‘‘আগামী (২০১৯ সাল) বর্ষাতেই নগরবাসী সুফল পাবেন।’’ কিন্তু এবার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। সামনের দিনগুলোতেও সুফল পাওয়ার দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজে সিডিএর পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।’

চট্টগ্রাম নগরে জলাবদ্ধতার ১২ কারণ
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাজ করতে গিয়ে জলাবদ্ধতার অন্তত ১২টি কারণ চিহ্নিত করেছে তারা। গত ৪ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কারণগুলো উপস্থাপন করা হয়। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-নগরের খালগুলো অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়া, পরিষ্কারের পরও নিয়মিতভাবে খালে ময়লা ফেলা, কর্ণফুলী নদী ও সাগরের সঙ্গে যুক্ত খালগুলোর মুখে জোয়ার প্রতিরোধক (টাইডাল রেগুলেটর) ফটকের স্বল্পতা, সেবা সংস্থাগুলোর পাইপের জন্য পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, খাল ও নালা-নর্দমার মধ্যে সংযোগে ক্রুটি থাকা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত ড্রেনেজ-ব্যবস্থা না থাকা, সঠিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা অনুসরণ না করা, ইমারত-বিধি না মেনে ভবন নির্মাণ ও জমির অপব্যবহার, অপরিকল্পিতভাবে বন উজাড় এবং পাহাড় কাটা, বালুর ফাঁদ (সিল্ট ট্র্যাপ) কার্যকর না থাকা ও শিল্পকারখানার বর্জ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্কাশন করা। এসব কারণে ভারী বর্ষণের পর নগরের পানি নালা-নর্দমা ও খালের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে দ্রæত নদীতে পৌঁছতে না পারার ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে বলে জানানো হয়।

NO COMMENTS

Leave a Reply