Home ফিচার ওয়াহেদ ম্যানশনে ছিল না অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা

ওয়াহেদ ম্যানশনে ছিল না অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা

0 170

চকবাজার ট্র্যাজেডি

কারিকা প্রতিবেদক
পুরনো ঢাকার নিমতলী ট্র্যাজেডির ৯ বছর পর আবারো সেই পুরনো ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারালো ৭১ জন মানুষ। ২০ ফ্রেরুয়ারি রাতে আগুন লাগার পর সরকারের তরফ থেকে ৬৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়। আগুনের উৎপত্তি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও ফায়ার সাভিসের উদ্ধারকারীদল, সরকারের তদন্ত সংস্থা, প্রত্যক্ষদর্শী প্রত্যোকে এক বাক্যে স্বীকার করেছেন আগুনের ভয়াবহতা বাড়িয়েছে ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলায় থাকা গ্যাস লাইটের রিফিল ও পারফিউমের গোডাউন। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় লাগা সেই আগুনে ওয়াহেদ ম্যানশন ছাড়াও আরও ৪ টি ভবন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
ইতিমধ্যে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করেছে ওয়াহেদ ম্যানশনের দোতলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। ভবনে প্রচুর কেমিক্যাল থাকায় বৈদ্যুতিক সুইচ অন করার সময় স্ফুলিঙ্গ বা অসাবধানতাবশত জ্বালানো আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে বলে আইইবি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আগুনের সূত্রপাত যে ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে সেই ভবনের দোতলায় পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন, লাইটার রিফিল করার কাঁচামাল; তৃতীয় তলায় চার ইউনিটের মধ্যে একটিতে পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন; চতুর্থ তলায় কসমেটিক ও পারফিউম-বডি স্প্রের গোডাউন ছিল। আগুন নিভানোর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ওয়াহেদ ম্যানশনের বেজমেন্টে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিকের মজুদ দেখতে পেয়েছেন।
যদিও স্থানীয়রা প্রথমে দাবি করেছিলেন আগুনের সূত্রপাত হয়েছে চুড়িহাট্টার সামনের রাস্তায় থাকা পিকআপের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। পরে দেখা যায় পিকআপটি ডিজেল চালিত। সেখানে পোড়া যাওয়া সব কয়টি গাড়ি এবং পাশ্ববর্তী হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা করে দেখা গেছে ঘটনাস্থলের আশপাশে কোন গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটেনি। ডিপিডিসিও নিশ্চিত করেছে চকবাজারে চুড়িহাট্টায় যেখানে আগুন লেগেছে তাঁর আশেপাশে বিদ্যুতের কোন ট্রান্সফরমার নেই।
চকবাজারের চুড়িহাট্টায় লাগা সেই আগুনের সূত্রপাত নিয়ে যখন ধোঁয়াশা কাজ করছিল সবার মাঝে ঠিক তখনই রাজ মহল হোটেলের দুটি সিটি টিভি ফুটেজ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ ম্যাধমে প্রচারিত হয়।
রাজমহল হোটেলের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা একটি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১০টা ৩২ মিনিটে প্রথমে একটি ছোট বিস্ফোরণ ও তার এক সেকেন্ডেরও কম সময়ের ব্যবধানে আরও একটি বড় বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে জিনিসপত্র ভেঙে নিচে পড়তে থাকে। এই নিচে পড়া জিনিসপত্রের মধ্যে বডি স্প্রের ক্যান ও কার্টন নিচে পড়তে দেখা গেছে। একই সঙ্গে ভারি জিনিসপত্রও উপর থেকে নিচে পড়তে দেখা যায়। ঘটনাস্থলের পাশে থাকা মসজিদ সংলগ্ন একটি ভবনের সিসিটিভিতে ধারণ করা অপর একটি ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেই ফুটেজেও বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে বডি স্প্রের ক্যান উড়ে এসে মসজিদের গলিতে পড়তে দেখা যায়। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান ওয়াহেদ ম্যানশনে, পারফিউ ও বডি স্প্রের বিশাল মজুদ ছিল। অতিরিক্ত তাপমাত্রা বা কোনও একটি ক্যানে অতিরিক্ত গ্যাসের প্রেসারের কারণে বিস্ফোরিত হতে পারে পুরো গোডাউন।
ওয়াহেদ ম্যানশনে ছিল না অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা: আবাসিক ভবনে অবৈধভাবে রাসায়নিক মজুদ করার পরও ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নি নির্বাপনের কোন ব্যবস্থা ছিলো না। অতি মাত্রায় দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ যথাযথ নিয়মে মজুদ না করার পাশপাশি ভবনটিতে ছিলো না আগুনের নেভানোর নূন্যতম কোন সাজ সরঞ্জাম। আগুনে ওয়াহেদ ম্যানশনের ওপরের তলা ক্ষতিগ্রস্থ হলেও বেজমেন্ট ছিলো সম্পূর্ণ অক্ষত। কার পার্কিয়ের বদলে সেখানে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক মজুদ করে রাখা হয়েছিলো। রাসায়নিক মজুদের ক্ষেত্রে নিয়ম নীতির কোন তোয়াক্কা করা হয়নি। নেয়া হয়নি অগ্নি নির্বাপনের নূন্যতম প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাও। এছাড়া চুড়িহাট্টার সরু গলি ও ওয়াহেদ ম্যানশনের ছোট প্রবেশপথের কারণে ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভাতে অনেক বেগ পোহাতে হয়েছে। চকবাজারের চুড়িহাট্টার কাছাকাছি পানির কোন উৎস না থাকায় প্রায় আধা কিলোমিটার দুরে পুরনো জেলখানার পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নেভাতে হয়েছে। এর জন্য পানির গতিও ছিলো কম। উৎসুক জনতার পায়ের চাপে মাঝে মাঝে থেমে যাচ্ছিল পানি সঞ্চালনের পাইপ। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকতারা বলেছেন, আগুন বেজমেন্ট পর্যন্ত পৌঁছলে বিস্ফোরণের মাত্রা হতো অকল্পনীয়। এতে আগুন নেভাতে সময় লাগত অনেক বেশি। ফলে হতাহতের সংখ্যাও যেত বেড়ে।

NO COMMENTS

Leave a Reply