Home অন্তর্জাতিক কুরআনের হারিয়ে যাওয়া শহর ‘ইরাম’

কুরআনের হারিয়ে যাওয়া শহর ‘ইরাম’

আবুল হোসেন আসাদ


গনগনে সূর্যটা ঠিক মাথার ওপরে। তপ্ত লাল বালিতে ঢাকা মরুভূমির বুক। থেমে থেমে যেন মরুভূমির লাল বালির বুক থেকে গরম ভাপ বেরোচ্ছে। তাই ধোঁয়াশার মতো আবরণে ঢাকা চারদিক। গরমে চোখের পাতা মেলা দায়। এরই মাঝে হঠাৎই বইছে লু হাওয়া। সূক্ষ্ ঝরঝরে লাল বালিতে ঢেকে যাচ্ছে চোখ-মুখ-শরীর। বাড়তি জ্বালা হয়ে তেড়ে আসে ভনভন করা মরুভূমির বড় বড় মাছি। এমনিতে বেজায় গরম, তার ওপর ভরদুপুর, এসেছি দেখতে ‘হারিয়ে যাওয়া শহর’ বা ‘আটলান্টিস অব দ্য স্যান্ডস’, যেটি রুবা আল খালি মরুভূমির বুকে। যেই শহরের নাম সেমেটিক ধর্ম বিশেষত ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মগ্রন্থগুলোতে ঘুরে-ফিরে এসেছে।
হারিয়ে যাওয়া শহরটি ‘উবার’ (UBAR), ওয়াবার (WUBAR) কিংবা ‘ইরাম’ (IRAM) নামে পরিচিত। মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে আরবের হারিয়ে যাওয়া শহরটি ‘ইরাম’ নামে পাই। ইরাম শহরটি ওমানের দোফার প্রদেশে পড়েছে। ওমানের শেসর এলাকায় এ পরিত্যক্ত শহরের অবস্থান। রাজধানী মাস্কাট থেকে ইরাম বা উবার শহরের দূরত্ব ৯০০ কিলোমিটার। আর বন্দরনগরী সালালাহ থেকে এর দূরত্ব ১৭০ কিমি, উত্তরদিকে। যাওয়ার পথে মাঝে পড়ে মরু শহর তামরিদ। ‘ইরাম অব দ্য পিলার’ শহরটি ছিল সহস্র পিলারের এক সুরক্ষিত নগরী। উঁচু উঁচু পিলার দিয়ে কোনো শহর হতে পারে এটা তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সেই শহরটি ছিল তখনকার সবচেয়ে চাকচিক্যময় ও আধুনিক শহর। ধর্মগ্রন্থগুলো বলছে, সেই শহরের মতো শক্তিশালী বাড়ি-ঘর এর আগে কেউ কখনো দেখেনি বা নির্মাণ করেনি। সুরা আল ফজরের ৬, ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে ‘ইরাম’ শহরের কথা বলা হয়েছে। এখানে স্বয়ং আল্লাহ তার শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ‘আদ’ বংশের শৌর্য-বীর্য সম্পর্কে বলেছেন। ইরাম শহরটি তৈরি হয়েছিল উঁচু উঁচু পিলার দিয়ে। এসব পিলারের এই সুরক্ষিত শহরটিতে বসবাস করত জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ‘আদ’ জাতি। আদ সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা জোরদার করেছিল সুউচ্চ এই পিলার। ইরাম নগরীর কল্পিত ছবিই যেন সে কথা বলে। ইরামের সুউচ্চ পিলার আদ’দের নিরাপত্তা দিত বলে সেই উঁচু পিলারের পূজা করত তাদের কেউ কেউ। আর বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা তো নিয়মিত ছিলই আদদের। আদ সম্প্রদায়কে সুপথে আনার জন্য নবী হুদ (আ.)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি আদ সম্প্রদায়কে দ্বীনের দাওয়াত দেন। কুরআন শরিফে সুরা হা-মীম সাজদাহ’র বিভিন্ন আয়াতের বরাতে এ কথা জানা যায়। কিন্তু আদ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোক যুগের থেকে কয়েক কদম এগিয়ে থাকার গর্বে নবী হুদ (আ.)-কে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বিদায় করে। তাদের কেউ কেউ আবার নবীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয় আমাদের চেয়ে বড় শক্তিধর এ পৃথিবীতে আর কে আছে?
ফলে প্রাথমিক ‘গজব’ হিসেবে উপর্যুপরি তিন বছর শহরে বৃষ্টি বন্ধ থাকে। তাদের শস্যক্ষেত শুকিয়ে বালিময় মরুভূমিতে পরিণত হয়। বাগবাগিচা জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যায় এবং সবশেষে নেমে আসে ভয়াবহ ‘আজাব’।
সূরা হা-ক্বক্বাহ ৭-৮ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের মানে আদ সম্প্রদায়ের ওপর প্রচন্ড ঝড়ের বাতাস বয়েছিল টানা সাত রাত ও আট দিন। হে মুহাম্মাদ! তুমি থাকলে দেখতে পেতে, তারা অসার খেজুরগাছের কান্ডের মতো মাটিতে পড়ে রয়েছে। তুমি এখন তাদের কোনো অস্তিত্ব দেখতে পাও কি?’
কুরআন শরিফ অনুসারে এভাবেই আদ সম্প্রদায় ও তাদের শহর ইরাম বা উবার বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং চিরতরে বালিতে চাপা পড়ে যায়। হারিয়ে যায় কালের গর্ভে। আর নবী হুদ (আ.)-এর কবর অটুট থাকে সালালাহর একটি পাহাড়ে। যেটি এখনো রয়ে গেছে যুগের পর যুগ, কালের করাল গ্রাস উপেক্ষা করে।
হাজার বছরের পুরনো শহর ইরাম, যা দীর্ঘকাল লুকিয়ে ছিল বিস্মৃতির অতলে, মরুভূমির বালির নিচে। তা অবশেষে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খুঁজে পাওয়া যায় ওমানের শিসর (SHISR) এলাকায়। ‘দ্য লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এটি আবিষ্কারের কথা। প্রত্নতত্ত্ববিদ নিকোলাস ক্লাপের উদ্যোগে প্রাচীন মানচিত্র ঘেঁটে এবং মার্কিন গবেষণাকেন্দ্র ‘নাসা’র স্যাটেলাইটের সাহায্যে খুঁজে পাওয়া যায় ‘রুবা-আল খালি’ মরুভূমির ১২ মিটার বালির নিচে লুকিয়ে থাকা ‘ইরাম’ বা ‘উবার’ শহরকে। কুরআনের হারিয়ে যাওয়া শহর ইরামের আবিষ্কার বিশ্ববাসীকে অবাক করে দেয়। ওমান সরকার খনন করে এই আবিষ্কারকে মানুষের সামনে হাজির করেছে। বর্তমানে ইরাম বা ওয়াবার আর্কিওলজিক্যাল সাইট ইউনেস্কো ঘোষিত একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। তবে কিংবদন্তি হয়ে দাঁড়ায় ‘দ্য ইনসেন্স রোড’। প্রাচীন ধ্বংসাবশেষগুলো থেকে এ রাস্তাটির অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে এখানে।
কেউ কেউ বলেন, বাদশাহ শাদ্দাদ পৃথিবীর বুকে জান্নাত তৈরি করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘ইরাম’ বা ‘আরাম’। সেই জান্নাত স্রষ্টার অভিশাপে বালির নিচে চিরতরে হারিয়ে গেছে। এটিই ছিল সেই জান্নাত। কারো কারো ধারণা, জান্নাতের এই প্রবেশদ্বারটি বিশাল এক পাথরচাপা পড়ে আছে। তবে অনেকেই মনে করেন বিশাল পাথরচাপা পড়া অংশটি হলো পানির কূপ। কারণ সহস্র পিলারের শহরটির গোড়াপত্তন করেছিল নূহ (আ.)-এর বংশধররা। মরুভূমির কাফেলাগুলোকে পানি সরবরাহ করে তারা ধনী হয়ে উঠেছিল। পানির সেই কূপটি এখন বিশাল এক পাথরচাপা পড়ে আছে। পাথরের একদিকে বর্তমানে সিঁড়ি তৈরি করা হয়েছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আমার, ভরদুপুরে। নিচের দিকে নামছি আর বাতাসও কেমন যেন ধীরে ধীরে ভারী হচ্ছে। তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। তার ওপর অজানা-অচেনা অন্য ধরনের এক বিশ্রী গন্ধ নাকে এসে লাগল। যতই পাথর কেটে বানানো সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামছি, ততই গন্ধের তীব্রতা বাড়ছে। ভেতরের দিকে ভীষণ ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পোকামাকড়ের শব্দ। অক্সিজেনের ঘাটতিও প্রচুর। উৎকট গন্ধে মাথার মগজ যেন গুলিয়ে আসতে চাইল, বমি এসে গেল প্রায়। কোনোরকমে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এলাম।
দোফার পাহাড়ে এখনো কিছু আরব বেদুঈনের গোত্র আছে, যারা নিজেদের উবারের রাজার বংশধর হিসেবে দাবি করে এবং তারা আরবের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চারণে কথা বলে থাকে। তাছাড়া নবী হুদ (আ.)-এর কবর, পারিপার্শ্বিক প্রমাণাদি, প্রাপ্ত নিদর্শনাদি নিশ্চিত করে ‘রুবা আল খালি’ মরুভূমিতে খুঁজে পাওয়া এই প্রত্নতাত্ত্বিক শহরই উবার বা ইরাম।
একসময় জীবনের কোলাহলে মুখর ছিল যে শহরটি, জ্ঞান-বিজ্ঞানে ছিল উন্নত সেই শহর আজ মৃত। হারিয়ে গেছে চিরতরে। সেখানে পোকামাকড় ছাড়া জীবনের কোনো স্পন্দন নেই। ১২ মিটার বালির নিচে চাপা পড়ে আছে আরবের সেই সময়ের সবচেয়ে চাকচিক্যময় ও আধুনিক শহর। সহস্র পিলারের শহর আজ হাজার বছরের সুদূর অতীত। সেই অতীতের কথাগুলো যেন আজো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইরামের ধ্বংসস্তূপের পাথর ও বালির পরতে পরতে।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply