Home সর্বশেষ খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর অবস্থানে সরকার

খাদ্যে ভেজাল রোধে কঠোর অবস্থানে সরকার

0 32

কারিকা প্রতিবেদক
চলছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। সারাদিন রোজা রাখার পর বাঙালি মুসলমানদের রোজা ভাঙ্গার প্রধানতম উপকরণ হলো খেজুর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে খেজুর নিয়ে পত্রিকার পাতায় উঠে এসেছে ভয়াবহ সব তথ্য। র‌্যাবের অভিযানে বাদামতলী ফলের আড়ত, নারাগঞ্জের ফতুল­ায় দুটি হিমাগারসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জব্দ করা হয়েছে বিপুল পরিমান মেয়াদোওীর্ণ পঁচা খেজুর। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে পৃথকভাবে ভেজাল বিরোধী ভ্রামমাণ আদালত পরিচালনা করছে র‌্যাব এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ। পুরো রমজান মাস জুড়ে ভেজাল বিরোধী এই অভিযান চলবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি র‌্যাবের ভ্রামমান আদালত নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডে (পুষ্টি সয়াবিন তেল প্রস্তুতকারক) প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করে। র‌্যাব ও বিএসটিআই’র সহযোগিতায় এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন র‌্যাব সদর দফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেন্ট মো. সারওয়ার আলম।
মেয়াদোত্তীর্ণ সয়াবিন তেল পাইপলাইনে ঢুকিয়ে নতুন করে বোতলজাত এবং মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মান নিয়ন্ত্রণ করার দায়ে সুপার অয়েল রিফাইনারি লিমিটেডকে (পুষ্টি সয়াবিন তেল প্রস্তুতকারক) ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেন্ট সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের জানান বাজারের অবিক্রীত মেয়াদোত্তীর্ণ তেল ফেরত এনে পাইপলাইনে ঢুকিয়ে নতুন করে বোতলজাত করছিল প্রতিষ্ঠানটি, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য এবং কষ্টকর। এছাড়াও তাদের কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবের (কিউসি ল্যাব) ৮০ ভাগ রাসায়নিক পদার্থের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে আরও কয়েক বছর আগে। এই অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
লাল চালে কিভাবে ধবধবে সাদা মুড়ি তৈরি হচ্ছে সেই রহস্য উম্মেচন করতে পশ্চিম ভাটারার প্রভাতী ফুডের কারখানায় অভিযান চালায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। সেখানে অভিযান চালিয়ে বিস্মিত হন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। লাল চালের মুড়ি ধবধবে সাদা বানাতে সেখানে লবনের সাথে বিশেষ কায়দায় মেশানো হচ্ছিল সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড। টেক্সাইল খাতে ব্যবহৃত ব্লিচিং জাতীয় পদার্থ সোডিয়াম হাইড্রো সালফাইড ব্যবহার করে ধবধবে সাদা বানানো হচ্ছিল মুড়ি। মুড়ি তৈরিতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করায় প্রভাতী ফুডকে পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা ও জব্দকৃত মুড়ি ধংস্ব করা হয়।
এই যখন বাস্তবতা তখন খাদ্যে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার আহবান জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। খাদ্যে ভেজালকারীদের ফাঁসি দিতে এই অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ সংশোধন করারও দাবি জানান তিনি।
সম্প্রতি দোকান মালিক সমিতির একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যারা ভেজাল করে তারা খুনি। খুন করলে যদি ফাঁসি হয়, যে খাদ্যে ভেজাল মেশায় তারও ফাঁসি হতে হবে। ভেজালকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে যাতে এ দেশের মাটিতে কেউ খাদ্যে ভেজালের মতো দুঃসাহস দেখাতে না পারে।’
এদিকে ব্যবসায়ীদের হুশিয়ারী করে দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন আপনারা এই পবিত্র মাসে কাউকে পচা-বাসি খাবার খাওয়াবেন না। যদি এমন করেন তাহলে ঈদের মতো আনন্দের দিনটি আপনাদের কারাগারে কাটাতে হতে পারে।
রমজান মাসে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সচেষ্ট সরকার। এর জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি সরকারের এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এসব উদ্যোগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকার জিরো টলারেন্সে অবস্থান করবে। এটিই আমাদের প্রথম ও শেষ কথা।’
নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শকদের রমজান উপলক্ষে খাদ্য স্থাপনা ও বাজার পরিদর্শন জোরদার করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, রমজানে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দেশের কাঁচাবাজার, ইফতার বাজার, খাদ্য স্থাপনা, হোটেল রেস্তোরাঁয় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্যের নিরাপত্তা রক্ষায় পরিদর্শক টিম গঠন করার মাধ্যমে নিয়মিত তদারকি করার নির্দেশ রয়েছে সরকারের। এর জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, বিএসটিআই, পানিসম্পদ অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর, স্বাস্থ্য অধিদফতর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সূত্র আরও জানায়, রমজানে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বস্তিবাসী, পোশাক শ্রমিক, হোটেল রেস্তোরাঁ, ও পথ খাবারের দোকান এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সুপেয় নিরাপদ পানি সরবরাহ করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ও ঢাকা ওয়াসাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও সুস্থ প্রাণি ও হাঁস-মুরগি স্বাস্থ্যসম্মতভাবে জবাই, প্রক্রিয়াকরণ এবং নিরাপদ মাংস সরবরাহ, পোল্ট্রি ডিম ও দুধের নিরাপত্তা রক্ষায় পরিদর্শন ও তদারকি কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। এর জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর, প্রাণিসম্পদ অধিদফতর, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাব সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
এছাড়াও রমজানে আমদানি করা খেজুর, ফল, বিভিন্ন প্রকার পানীয়, মাছ, মাংস, ও মাংসজাত খাদ্য দ্রব্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানি তদারকি জোরদার করারও নির্দেশ রয়েছে সরকারের। এর জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের সঙ্গে কাজ করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, র‌্যাব, পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।প্রয়োজনে যেন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় সে ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে সংস্থাগুলোকে।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রমজানে কৃষিজাত খাদ্যপণ্য বিশেষ করে শাকসবজি, ফলমূল অন্যান্য কৃষিজাত খাদ্যদ্রব্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। এর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সংশ্লিষ্ট থেকে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ও সিটি করপোরেশনগুলোকে সহায়তা করবে। রমজানে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা একযোগে কাজ করবে। সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমেও প্রচারণা বাড়ানোর উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

NO COMMENTS

Leave a Reply