Home সর্বশেষ গাড়ির সঙ্গে চালকের মানসিক ফিটনেসও জরুরি

গাড়ির সঙ্গে চালকের মানসিক ফিটনেসও জরুরি

0 56

অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান


সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে সাম্প্রতিক ছাত্র-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা আইন পাসের উদ্যোগসহ নানা পর্যায় থেকে কার্যক্রম চলছে। তৎপর হয়ে উঠেছে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সড়ক নিরাপদ হবে কি? বন্ধ হবে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনা? প্রত্যাশিত নিরাপদ সড়ক কীভাবে নিশ্চিত হতে পারে এ নিয়ে কারিকা মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমানের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব শান্ত

ঢাকা শহরের গণপরিবহনের নৈরাজ্য নিয়ে ইদানীং বেশ আলোচনা হচ্ছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে একটা বড় আন্দোলনও হয়ে গেল। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. মো. মিজানুর রহমান : ঢাকা শহরের যে পরিমাণ জনসংখ্যা এবং সে অনুযায়ী প্রতিদিন যে ট্রিপের (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভাষায়) চাহিদা তা কয়েক মিলিয়ন। আমাদের বিদ্যমান যে গণপরিবহন-ব্যবস্থা; শুধু বেসরকারি এবং বিআরটিসির বাস আর কিছু হিউম্যান হলার দিয়ে সেই ট্রিপ-চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এক সঙ্গে অনেক যাত্রী পরিবহন করতে পারে)। এ ধরনের গণপরিবহন-ব্যবস্থার দিকে যেতে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। মেট্রোরেলের কাজ চলছে, বিআরটিএ’র বাসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ঢাকা শহরে বর্তমানে যে বাসগুলো চলছে, মালিকরা চালকদের কাছে চুক্তিভিত্তিক বাস দিচ্ছে। এর ফলে যেটা হয়, বাসের চালকের ওপর সাংঘাতিক রকমের চাপ তৈরি হয়। মালিককে যে টাকাটা দিতে হবে প্রথমে কিন্তু চালককে সেই টাকা আয় করতে হয়। তারপর অতিরিক্ত যে টাকাটা আয় করবে সেই টাকা থেকে সে নেবে এবং বাসের হেলপার ও সুপারভাইজারের আয় নির্ধারিত হয়। এ কারণে চালকের মধ্যে যাত্রী তুলতে প্রতিযোগিতার মনোভাব চলে আসে। কোথাও কয়েকজন যাত্রী দেখলে বেপরোয়াভাবে তাদের সংগ্রহের জন্য দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। এ কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছে। ঢাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহতসহ কয়েকজন আহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্র-আন্দোলন হয়ে গেল। এই যে প্রতিযোগিতার মনোভাব এটা যতদিন আমরা বন্ধ করতে না পারছি ততদিন পর্যন্ত ঢাকা শহরের গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধ হবে না।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে, সেগুলো কতটা কার্যকর বলে আপনি মনে করেন?
মিজানুর রহমান : সরকারের বর্তমান উদ্যোগগুলো সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কিছুটা ভূমিকা রাখবে। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নৈরাজ্য বন্ধে এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। ঢাকা শহরে বাসের প্রায় ২৭৯টি রুট রয়েছে। একটা ছোট শহরের জন্য এতগুলো রুট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা যদি ঢাকা শহরকে চারটি বা পাঁচটি রুটে ভাগ করে সেখানে অল্প কয়েকটি (চার-পাঁচটি হতে পারে) কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে দেই; এখন যেসব বাস রয়েছে, সেগুলোকে যদি এই চার-পাঁচটার অধীনে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা থাকবে না। প্রতিদিন যে মুনাফা অর্জিত হবে, তা যার যে ক’টি বাস রয়েছে সেই অনুযায়ী লভ্যাংশটা তাদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। মালিকদের ভয়, কোম্পানির সিস্টেমে চলে গেলে তাদের মুনাফা কমে যাবে। আসলে এখানে মুনাফা কমার কোনো আশঙ্কা নেই, বরং বাড়বে।
ভারতের মুম্বাই শহর আর বাংলাদেশের ঢাকা শহরের জনঘনত্ব অনেকটা একই রকম। মুম্বাই শহরে যে বাস ফ্রাঞ্চাইজ করা হয়েছে, সেখানে প্রতিটি বাস গড়ে প্রতিদিন ১,৩৩০ (এক হাজার তিনশ তিরিশ) জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। অথচ ঢাকা শহরে একটি বাস গড়ে ৫০০ (পাঁচশ) জন যাত্রী পরিবহন করে। তার মানে কোম্পানির অধীনে শৃঙ্খলার ভিত্তিতে চললে একই বাসে ৮০০/১,০০০ যাত্রী, এমনকি ১,২০০ (এক হাজার দুইশ) পর্যন্ত্র যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। তাহলে ৫০০ যাত্রী পরিবহন করে এখন তারা যে মুনাফা পাচ্ছে, সেই একই বাস যখন ১০০০ যাত্রী পরিবহন করবে, তখন অবশ্যই মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যাবে।
বাসচালক ও হেলপারদের যদি মাসিক বেতনের আওতায় আনা যায়, তাদের মধ্যে অতিরিক্ত যাত্রী তোলার বেপরোয়া মনোভাব থাকবে না। একই সঙ্গে আমাদের যে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের কার্যক্রমগুলো এগিয়ে যাচ্ছে; এমআরটি-বিআরটিএ এগুলো যখন দু-তিন বছর পর যাত্রীসেবা দেওয়া শুরু করবে, তখন ঢাকা শহরের গণপরিবহনের নৈরাজ্যের চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে।

সড়কে নৈরাজ্যের জন্য গণপরিবহন ছাড়াও তো অনেকের দায় আছে…
মিজানুর রহমান : ঠিক। ঢাকা শহরে গণপরিবহনের পাশাপাশি অন্যান্য পরিবহনও চলছে। নৈরাজ্য বন্ধে আমাদের সবারই দায়িত্ব নিতে হবে। পথচারী, যাত্রী, প্রাইভেটকার যেগুলো রয়েছে, সবার মধ্যেই নিয়ম না-মানার প্রবণতা রয়েছে। ফলে সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। প্রাইভেট গাড়িগুলো অনেক সময় লেন বা ডিসিপ্লিন ইত্যাদি মেনে চলে না। আবার অনেক পথচারীই ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রাক্রসিং ব্যবহার না করায় যানজট বৃদ্ধির পাশাপাশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।

শহরের রাস্তায় পথচারীদের হাঁটার পরিবেশ না থাকার অভিযোগ আছে…
মিজানুর রহমান : ঢাকা শহরে ৬০ ভাগের বেশি লোক পায়ে হেঁটে যাতায়াত করে। অনেক সময় দেখা যায় ফুটপাতের কিছু অংশ পথচারীরা ফাঁকা পাচ্ছে, আবার কিছু অংশে গিয়ে দেখা যাচ্ছে সেটা হকারদের দখলে। তখন কিন্তু তাকে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে। পথচারী যখন রাস্তায় নামে তখন কিন্তু আবার রাস্তার গাড়ি চলার অংশটুকু সংকুচিত হয়ে আসে। ঢাকা শহরের সব ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে যানবাহনের ওপর চাপ অনেকটা কমে যাবে। কারণ ঢাকা শহরের ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ট্রিপ খুব কম দূরত্বের। সেটা ৫০০ মিটার থেকে দেড় কিলোমিটারের মতো। এই দূরত্বগুলো মানুষ সহজেই পায়ে হেঁটে চলাচল করতে পারে। তার জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত করে হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় যে স্থাপনাগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোকে অপসারণ করতে হবে।

পর্যাপ্ত এবং প্রয়োজনীয় রাস্তা কি আছে আমাদের?
মিজানুর রহমান : একটা আদর্শ শহরের জন্য ২০ শতাংশের ওপরে রাস্তা থাকা জরুরি, সেখানে ঢাকার রয়েছে মাত্র ৬ থেকে ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ২ শতাংশ বিভিন্নভাবে দখল বা ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে আছে। যে ৮ শতাংশ আছে, সেটা যেন কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ফুটপাতে মোটরসাইকেল উঠে যাওয়া কঠোরভাবে দমন করতে হবে। রাস্তার উল্টোদিকে চলার যে প্রবণতা, সেটাও বন্ধ করতে হবে।

সড়ক-নিরাপত্তায় জনসচেতনতা বাড়ানোর ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?
মিজানুর রহমান : পথচারীদের সচেতন করার জন্য সরকার বর্তমানে যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, সেটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। পুলিশ কিছুদিন আগে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করেছে। এরপর মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতা কার্যক্রম শুরু করেছে। পাশাপাশি সরকারের সংশ্লিষ্ট যেসব মন্ত্রণালয় রয়েছে, তাদের ছোট ছোট কিছু বিজ্ঞাপন তৈরি করে সংবাদপত্র, টেলিভিশনে প্রচার করা উচিত। সাংবাদিকদেরও দায়িত্ব সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতন করতে লেখালেখি করা। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশনগুলো যদি প্রতিদিন সকাল-বিকাল এক মিনিট করেও লোকজনকে ট্রাফিক আইন-কানুন সম্পর্কে সচেতন করার জন্য প্রচার চালায়; সবার সম্মিলিত উদ্যোগে মানুষ সচেতন হয়ে উঠবে।

সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে আপনার পরামর্শ জানতে চাই।
মিজানুর রহমান : ঢাকা শহরে পথচারী হতাহতের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে যাবে পথচারীরা যদি সচেতন হয়ে চলাফেরা করে। একই সঙ্গে চালকদের বেপরোয়া মনোভাবও বন্ধ করা জরুরি। একটা বিষয় লক্ষ্য করতে হবে, আমাদের দেশে গাড়ির ড্রাইভারদের নিয়ম করে কোনো প্রশিক্ষণ বা মোটিভেশনাল কার্যক্রমের আওতায় রাখা হয় না। সড়কে যে গাড়িটা চলছে, সেই গাড়িটা যেমন ফিট থাকা জরুরি, তেমনি গাড়ির চালককেও মানসিকভাবে ফিট থাকা জরুরি।
আমাদের দেশে চালকদের অন্য চোখে দেখা হয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার। চালকদের সঙ্গে ভালো আচরণ করলে অনেক সময় তাদের মধ্যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। চালকদের মাঝে মাঝে মোটিভেট করতে হবে। এক্ষেত্রে দেশে যারা ‘পাবলিক ফিগার’ রয়েছেন; যেমন নামকরা সাংবাদিক, খেলোয়াড় তাদের দিয়ে চালকদের সামনে অনুপ্রেরণামূলক কথাবার্তা বলাতে পারলে কার্যকরী ফল পাওয়া যাবে। চালকদের এটা বোঝাতে হবে; তিনি খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন লোক, তার ওপর চল্লিশ বা পঞ্চাশজন যাত্রীর জীবনের নিরাপত্তা নির্ভর করে।

সড়ক নিরাপত্তা আইন কতটা কার্যকর হবে বলে মনে করেন?
মিজানুর রহমান : শুধু সড়ক নিরাপত্তা আইন দিয়েই যে আমরা সড়ককে নিরাপদ করতে পারব বা বিশৃঙ্খলা রোধ করতে পারব আমার কাছে সেটা মনে হয় না। যারা এই পরিবহন-ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত, যেমন- মালিক, চালক, শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং যারা ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট দেন সেই বিআরটিএ কর্মকর্তা-কর্মচারী, আমরা যারা সড়ক ডিজাইন করি বা সড়ক নির্মাণ ও নির্মাণ-কাজ তদারকি করি প্রত্যেকেরই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আইনের প্রয়োগ অবশ্যই কঠোরভাবে করতে হবে। চালকদের সামনে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে যে, দুর্ঘটনা ঘটালে বা অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবেই।

NO COMMENTS

Leave a Reply