Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ গ্র্যান্ড সুলতান – চেয়েছি যাতে মানুষের ভালো লাগে

গ্র্যান্ড সুলতান – চেয়েছি যাতে মানুষের ভালো লাগে

আর্কিটেক্ট বি কে এস ইনান এখন গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর। তিনি স্থপতি হিসেবে এই অনন্য রিসোর্টকে গড়ে তুলেছেন। কিভাবে গ্র্যান্ড সুলতানের জন্ম হলো? কোথায় এটি আলাদা সে গল্প শোনাচ্ছেন তিনি। লিখেছেন ওমর শাহেদ

1

এতো জায়গা থাকতে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ কেন শ্রীমঙ্গলে তৈরি করা হলো? এই প্রশ্নটির জবাব খুঁজতে আজ থেকে পাঁচ-সাত বছর আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে। শ্রীমঙ্গলে ঘুরতে গিয়েছিলাম। এক ভোরে বেড়িয়ে পড়লাম ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে। শখের বশে আমি ছবি তুলি। একটি দৃশ্য খুব ভালো লেগে গেল। ছবিটি তুলে ফেললাম। পরে একদিন ছবিটি দেখালাম গ্র্যান্ড সুলতানের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ কামরুজ্জামানকে। অনেকক্ষণ ধরে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। বললেন, ‘এটা কোন জায়গা?’ উত্তরে জানালাম, শ্রীমঙ্গল। সকালের সূর্য কেবল উঠছে। পাতার ফাঁক দিয়ে আলো পড়ছে মাটির পথে। সে আলোয় উজ্জ্বল হয়েছে পাতার মধ্যে মাকড়শার জালটি। আলো দেখলেন বেশ খানিকক্ষণ। তারপর বললেন ‘এ তো স্বর্গীয় আলো।’
আর এ নিয়ে কথাবার্তা হয়নি। আমি জানিও না, খাজা টিপু সুলতান এবং তিনি মিলে শ্রীমঙ্গলে ১৫ একর জায়গা চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। নিজের কাজ নিয়ে ততদিনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। অনেক দিন পরে ডাক পড়লো। তারা দুজনে মিলে গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছেন। আমাকে বললেন, ‘আর্কিটেক্ট হিসেবে আপনি আমাদের এই স্বপ্নের প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করবেন। কোনোভাবেই শ্রীমঙ্গলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নষ্ট করবো না আমরা। বরং একে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলব।’

2

শুরু হলো কাজ। একদল নবীন সহকর্মীকে নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। রাত-দিন কাজ করেছি। প্রতিটি ইট কোথায় কোনটি বসবে সেটি আমি জানি। সেগুলোকে জায়গা মতো বসানোর ক্ষেত্রে সামান্য শ্রমিক ভাইয়ের অবদান আছে, তেমনি আমাদেরও রক্ত-ঘাম মিশে আছে। রাতের পর রাত দিনের পর দিন তাদের সঙ্গে কাজ করেছি।
সেখানে যে পরিমাণ গাছ ছিল, এখন তার ১০ গুণ গাছ আছে। লেকটি যেখানে আছে, সেটি আসলে গর্ত ছিল। আমরা তাকে সুন্দর করে লেকের আকার দিয়েছি। টিলার কোনো চেহারাই ছিল না। এই টিলাটিকে আজকের চেহারা দেবার পেছনে যে কত মানুষের পরিশ্রম লেগে আছে! যেখানে ভবনটি আছে, সেখানে কোনো গাছই ছিল না। আমরা কোনোভাবেই প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করিনি। বরং তাকে শতগুণে বিকশিত করার জন্য যাবতীয় মেধা, শ্রম ঢেলে দিয়েছি। আমাদের এই বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ যখন চলছে তখন একদিন ইস্পাহানী গ্রুপের কর্ণধার সালমান ইস্পাহানী এসেছিলেন। তিনি শুনেছেন, এখানে ঢাকা থেকে এসে একদল মানুষ গ্র্যান্ড সুলতান নামের একটি রাজকীয় রিসোর্ট তৈরি করছেন। অনেকক্ষণ মনোযোগ দিয়ে আমাদের কাজ দেখলেন। ঘুরে বেড়ালেন। তারপর বিষ্ময় আর চাপতে না পেরে খাজা টিপু সুলতানকে বলেই ফেললেন, ‘হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান?’

6

গ্র্যান্ড সুলতানের প্রতিটি গাছের চারা নিজের হাতে লাগিয়েছেন গ্র্যান্ড সুলতানের চেয়ারম্যান খাজা টিপু সুলতান। মালিদের নিজে বাগান পরিচর্যা করা শিখিয়েছেন। একটি পাঁচ তারকা হোটেলে যা যা আছে তার চেয়ে কোনোভাবেই কোনো কিছু কম নেই আমাদের। বিশাল লেক আছে, ঘোরার ব্যবস্থা আছে। আছে আরাম-আয়েশের সব ব্যবস্থা। বললে তো আর কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেন না এখন, প্রতিটি বিছানার বালিশ নিজের হাতে খাজা টিপু সুলতান পরীক্ষা করে দেখেছেন। সেভাবে এমনকি বিছানার চাদরটিতেও তার হাতের পরশ লেগে আছে। ফ্লোরের পাথরের টুকরো থেকে শুরু করে ওয়াল পেপারটিও সবার পরামর্শে তিনি নিজের হাতে কিনেছেন। তিনি নিশ্চিত হতে চেয়েছেন, গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুই উৎকৃষ্ট মানের হোক। আমরা সে পরীক্ষায় পাশ করেছি কি না সেটি বিচারের ভার ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের।
গ্র্যান্ড সুলতানকে নিয়ে অনেক অনেক স্মৃতি আছে। এটি অন্য যে কোনো হোটেল, রিসোর্টের চেয়ে একেবারে আলাদা। বিশাল এক লাইব্রেরি আছে। তাতে গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড থেকে শুরু করে ইয়োগা, গলফের বই, শিশুদের কার্টুনের বই পর্যন্ত আছে। যখন বই-ব্যবসায়ীরা শুনলেন, রিসোর্টে লাইব্রেরি করা হবে, তারা এত বেশি অবাক এবং খুশি হয়ে গেলেন যে, অবিশ্বাস্য অংকের ছাড় দিয়ে বই বিক্রি করলেন। মাত্র দুদিনে এই বিশাল লাইব্রেরির সব বই কেনা হয়েছে।
এখানে আছে হেলিপ্যাড। গ্র্যান্ড সুলতানের সবকিছুর মতো টোটাল গ্লাস ফিটিংসও কেবল বাংলাদেশেরই নয়, এশিয়ার সেরা। আমরা এখানে সর্বোচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে সবচেয়ে ভালো উপকরণই ব্যবহার করেছি। আমরা বিভিন্ন দেশের নান্দনিকতা, নানা সংস্কৃতির রূপ-রস এখানে রাখার চেষ্টা করেছি। লিফটে যে কাঠের ডিজাইনটি আছে সেটি পারশিয়ান কালচার থেকে নেওয়া। এই পরিশ্রম আর চেষ্টার একটিই উদ্দেশ্য, গ্র্যান্ড সুলতানকে আমরা যে কোনো সমাজের, বয়সের মানুষের উপযোগী করে তৈরি করতে চেয়েছি। একে আর এখন কেউ রিসোর্ট বলেন না। ভেতরে ঢুকে তার মনে হয়, কোনো বড় হোটেলে ঢুকেছেন। সমাজের যে কোনো অংশের মানুষ তার ছুটিছাটা, বিনোদনের সময়টুকু কাটাতে গ্র্যান্ড সুলতানে আসছেন-এই আমাদের অর্জন। এ অর্জন সেই মানুষটিরও যিনি গ্র্যান্ড সুলতানের আঙ্গিনার, আশেপাশের গাছের পাতা কুড়িয়ে জমা করেন প্রতিদিন।
গ্র্যান্ড সুলতানের মাধ্যমে কেবল পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটেনি, সে এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নও হয়েছে। এখানে প্রচুর স্থানীয় কর্মী কাজ করেন। তাদের সবার মিলিত চেষ্টাতেই ২০১৪ সালে ‘মোষ্ট লাক্সারিয়াস গলফ রিসোট’ হিসেবে ওয়ার্ল্ড লাক্সারি হোটেল পুরষ্কার পেয়েছে ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। আর আমাদের সাফল্য যদি বলতেই হয় তাহলে বলবো, এক কাপ কফি বা চা হাতে যখন কেউ চারপাশটি একা একা ঘুরে দেখেন, তার ভালো লাগে, চেহারায় সেটির ছাপ দেখে, তার কথা শুনে আমরাও ভাবি, এত কষ্ট-পরিশ্রম হয়তো বৃথা যায়নি। যখন কেউ বলেন ফোনের অপর প্রান্তের বন্ধুকে, ‘আমি এসেছি। ভালো লাগছে। তুমিও শ্রীমঙ্গল এসে গ্র্যান্ড সুলতানে ঘুরে যাও’, খুব ভালো লাগে।

ছবি – বি কে এস ইনানের সৌজন্যে

খাজা টিপু সুলতান
চেয়ারম্যান

NO COMMENTS

Leave a Reply