Home চট্টগ্রাম চট্টগ্রামের ব্যস্ততম শহরে অর্ধশতাধিক মোড় যেন মৃত্যুফাঁদ

চট্টগ্রামের ব্যস্ততম শহরে অর্ধশতাধিক মোড় যেন মৃত্যুফাঁদ

0 73

পথ নেই পথচারী পারাপারের

আবদুল্লাহ আল মামুন
দেশের অন্যতম ব্যস্ততম শহর চট্টগ্রাম। লাখ লাখ মানুষের বসতি। নানা কাজে নগরে আসা যাওয়া করেন আরো কয়েক লাখো মানুষ। চলাচলের সময় অনেক মানুষকে সড়কের এক পাশ থেকে আরেক পাশে যেতে হয়। হাঁটতে হয় ফুটপাত ধরে। কিন্তু সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, নির্বিঘ্নে নিরাপদে সড়ক পারাপারের কোন ব্যবস্থায় নেই মূল সড়কগুলোতে। চলন্ত গাড়ির সামনে প্রাণ হাতে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন পথচারীরা। রীতিমতো নগরের অর্ধশত মোড় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে দুর্ঘটনা, ঘটছে প্রাণহানিও। নগরের ১৪টি এমন বিপজ্জনক মোড় চিহ্নিত করেছে ট্রাফিক বিভাগ। এসব মোড়ে জরুরী ভিত্তিতে পদচারী সেতু (ফুটওভার ব্রিজ) নির্মাণে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দেওয়া হলেও কোন ব্যবস্থায় নেওয়া হচ্ছে না।
৬০ লাখ নগরবাসীর ১৬০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের নগরীতে সর্বসাকুল্যে পদচারী সেতু আছে মাত্র ৯টি। যানবাহনের চাপ সামাল দিতে নগরের বিভিন্ন সড়কে নির্মাণ করা হয়েছে ফ্লাইওভার। ফ্লাইওভারের নিচে সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার দেওয়া হলেও পথচারীদের সড়ক পারাপারের তেমন কোন ব্যবস্থা রাখা হয়নি। পদচারী সেতু না থাকায় সড়ক পারাপারে ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে পথচারীদের। তবে পথচারীদের রাস্তা পারাপারে পদচারী সেতু নির্মাণ কোনো সমাধান নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিরাপদ সড়ক পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং ও উন্নত ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থাই হচ্ছে সমস্যা সমাধানের মূল উপায়।
এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের উপ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) হারুন উর রশিদ হাযারী বলেন, ‘অনেক মোড়ে পথচারী পারাপারের কোনো ব্যবস্থা নেই, এটা সত্য। মানুষ ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন। যেখানে পদচারী সেতু ছাড়া কোনো উপায় নেই, সেখানে পদচারী সেতু নির্মাণ করতে হবে। নগরের ১৪টি মোড়ে পদচারী সেতু নির্মাণের জন্য সিটি করপোরেশনের কাছে বার বার অনুরোধ করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নগরের জাকির হোসেন রোডের ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের সামনে একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের জন্য ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি ফুটওভার ব্রিজগুলো পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করা হবে।’
তবে ভিন্ন মন্তব্য করেছেন পরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘মোড়গুলো পথচারী ও গাড়ি উভয়ের জন্য। দুই পক্ষকে সহাবস্থানে রাখার জন্য দরকার কার্যকর ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। গাড়ি যখন থামবে, পথচারী তখন পার হবেন। উন্নত দেশে পদচারী সেতু সব সময় নিরুৎসাহিত করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘পদচারী সেতু বানিয়ে পথচারীদের চলাচলের সমাধান করার উদ্যোগ পঞ্চাশ-ষাটের দশকে ছিল। এখন সভ্যতা এগিয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান এগিয়েছে। এখন সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার কথা চিন্তা করে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চিন্তা করছে আধুনিক বিশ্ব। যেখানে শিশু, অসুস্থ রোগী ও প্রতিবন্ধীরাও পারাপার হতে পারেন।’
সরেজমিন নগরের বিভিন্ন মোড় ঘুরে দেখা গেছে, পথচারীরা চলন্ত গাড়ির সামনে হাত উঁচিয়ে পার হচ্ছেন সড়ক। পথচারী পারাপারের জন্য আলাদা কোনো সিগন্যালও দেন না ট্রাফিক পুলিশ। প্রাণ হাতে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছেন পথচারীরা। নগরের ব্যস্ততম মোড় লালখান বাজার মোড়ে পথচারী পার হওয়ার কোনো উপায় নেই। পথচারীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ডিভাইডারের ফাঁকফোকর দিয়ে পার হচ্ছেন সড়ক। একই অবস্থা দেওয়ানহাট মোড় এলাকায়ও। এই দুই মোড়ে সড়কের মাঝখানে ডিভাইডার বসিয়ে নিরবচ্ছিন্ন গাড়ি চলাচল নিশ্চিত করা হয়েছে।
লালখানবাজার মোড় পার হওয়ার সময় চাকুরিজীবী ইসমত আরা বলেন, প্রতিদিন এ মোড় পার হয়ে চলাচল করতে হয়। আমার মতো হাজারো মানুষ প্রতিদিন পার হন। কিন্তু পথচারী পারাপারের কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি এখানে। মোড়ের আশপাশেও নেই কোনো জেব্রা ক্রসিং। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির ফাঁকফোকর গলে সড়ক পার হতে হয় পথচারীদের।
এ ছাড়া নগরের একেখান, কর্নেলহাট, অলংকার, বহদ্দারহাট, ষোলশহর, দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, টাইগারপাস, চৌমুহনী, বাদামতলী, গোসাইলডাঙ্গা, বারিক বিল্ডিং, কাস্টমস, সল্টগোলা, বন্দরটিলা, নিউমার্কেট, কোতোয়ালি, কর্ণফুলী সেতু চত্বর, অক্সিজেন মোড়েও মিলেছে একই চিত্র। দ্রুতগতির গাড়ির সামনে হাত উঁচিয়ে পার হচ্ছেন পথচারীরা। এদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর নগরের বিভিন্ন মোড়ে জেব্রাক্রসিং একেঁ দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল না থাকায় এসব জেব্রাক্রসিং পথচারীদের কোন কাজে আসেনি। জেব্রাক্রসিংগুলো এখন মুছে গেছে।
ব্যাংককর্মী শর্মিলা আহমেদ বলেন, ‘চতুর্মুখী দেওয়ানহাট মোড় এখন দ্বিমুখী করে দেওয়া হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন দেওয়ানহাট মোড় পার হতে হয়। সিগন্যাল নেই বলে অনেক সময় গাড়ি গায়ের ওপর উঠে যায়। অথচ বিষয়টি দেখার কেউ নেই।’

NO COMMENTS

Leave a Reply