Home ফিচার টং দোকান বা পাবলিক পার্লামেন্ট

টং দোকান বা পাবলিক পার্লামেন্ট

0 329

মির্জা মাহমুদ আহমেদ

রাস্তার পাশের চা-দোকানকে বলা হয় পাবলিক পার্লামেন্ট! শতপথ শত মতের সম্মিলন ঘটে চা-দোকানকে ঘিরে। কখনও কখনও মতের অমিল হলে চায়ের কাপেই ওঠে ঝড়! শহুরে জীবনছকে বাঁধা, ব্যস্ত। ফলে এখন আর সেভাবে চায়ের দোকানে আড্ডা জমে না। এছাড়া রাজপথ থেকে পাড়া-মহল্লার অলিগলি-সবখানেই গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কফিশপ ও ক্যাফে। সব মিলিয়ে চা-দোকানের আড্ডাটা অনেকটাই যেন মান্না দে’র কফি হাউজের ভাগ্য বরণ করেছে এই সময়ে এসে। মান্না দে যেমনটা গেয়েছিলেন ‘কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই…।’
ঘড়িতে তখন দুপুর সাড়ে ১২টার কিছু বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরের চা-দোকানগুলো ঘিরে শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট জটলা। একটি জটলার কাছে গিয়ে জানা গেল, তারা সবাই আসন্ন সেমিস্টার ফাইনাল নিয়ে কথা বলছেন। কারও হয়তো নোট জোগাড় হয়নি। কারো পুরো বই-ই বাকি। কেউ হয়তো শেষ সময়ে প্রয়োজনীয় চ্যাপ্টারগুলো দাগিয়ে নিচ্ছেন। জটলার মধ্যেই কথা হয় অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিয়া আফরিন মৌমিতার সঙ্গে। মৌমিতা বললেন, ‘সামনেই আমাদের পরীক্ষা, তাই চায়ের আড্ডায় এখন পড়াশোনা নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে। এমনিতে চায়ের আড্ডায় কথার কোনো লাগাম থাকে না। সিনেমা, ফেসবুক, গসিপ, ট্যুর-প্ল্যান-এসব বিষয় নিয়েই কথা হয় বেশি। এছাড়া আড্ডায় যখন ছেলেরা থাকে তখন ক্রিকেট, পলিটিক্স, হল পলিটিক্স, গেম, মুভি, গার্লফ্রেন্ড, ফেসবুক-এসব বিষয় নিয়েই কথা হয়। আর মেয়েদের আড্ডায় অবশ্যই বড় অংশজুড়ে থাকে ড্রেস আর সাজগোজ।
তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো বিস্কিট কারখানা পার হয়ে খানিকটা এগিয়ে ডানে ঘুরলে ছোট একটা টং দোকান। কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে টং দোকানের সামনে রাখা কাঠের বেঞ্চিতে বসলাম। দোকানি তখন এক মনে টুংটাং শব্দ তুলে চা বানিয়ে যাচ্ছেন। কান পাততেই শোনা গেল নতুন বছরে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, বাসা বদলানোর ঝক্কি, ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি, শীতের সবজির দাম কিংবা বেড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ। সেই সঙ্গে আলাপে উঠে এলো অন্যান্য বছরের তুলনায় ঢাকায় এবার শীতের তীব্রতার কথাও। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই কেউ সেরে নিলেন ব্যবসায়িক, পারিবারিক কিংবা অফিশিয়াল আলাপ।
৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তেজগাঁওয়ের এ জায়গাটিতে চা বিক্রি করছেন মজিদ মিয়া। বললেন,‘এখানে যারা চা খেতে আসেন, অধিকাংশই আশপাশের ফ্যাক্টরি অথবা অফিসে কাজ করেন। পাশেই মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল হওয়ায় অনেক যাত্রী, পথচারীও চায়ে চুমুক দিয়ে ক্লান্তিদূর করতে আসেন।’
শীতের মৌসুমে চায়ের বিকিকিনি রমরমা হলেও চায়ের দোকানে আগের মতো আড্ডা জমে না বলে জানালেন মজিদ মিয়া। কিন্তু কেন জমে না? উত্তরটা দিলেন কেটলি থেকে কাপে চা ঢালতে ঢালতেই, ‘এখন সবাই ব্যস্ত। দুই দন্ড বসার ফুরসত নেই। যদিওবা বসে, মোবাইল হাতে নিয়ে টিপতে থাকে। চোখ দুইটা থাকে মোবাইলের দিকে।’
বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে দুটি চা-দোকানের নাম। প্রথমটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুদা’র ক্যান্টিন, অন্যটি পাবনার রূপপুরের বিবিসি বাজার।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদেশের মানুষের অধিকার আদায়ে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে তার সঙ্গে ‘মধুর ক্যান্টিন’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্যাম্পাসে একটি কথা প্রচলিত রয়েছে, মধুর ক্যান্টিনে না এলে ভালো রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। এ কথার প্রমাণ মেলে বর্তমান ছাত্র সংগঠনগুলোর ‘মধু’কেন্দ্রিক কার্যক্রমে। ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা প্রতিদিনই সকাল-বিকাল জমায়েত হন মধুর ক্যান্টিনে। আজও দেশের যেকোনো সংকটকালে ও গণমানুষের অধিকার আদায়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ডাক দেওয়া হয় এখান থেকে। ’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ’৪৯-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ও সর্বশেষ মুক্তিযুদ্ধের সময় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আসে এ ক্যান্টিন থেকেই।
’৬৯ থেকে ’৭১ পর্যন্ত বহু বৈঠক মধুর ক্যান্টিনে হয়েছে। যার কারণে মধুদার ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্র রাজনীতির মূল ঘাঁটিতে রূপান্তরিত হয়। মধুদার আন্তরিক ব্যবহার ও সততার জন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। সেই বিশ্বস্ততার দামও দিতে হয় তাকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রবেশ করে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় মধুদাকে। মধুদার ছেলে অরুণ কুমার দে’র ভাষ্যমতে, সেই রাতে তার বাবা অর্থাৎ মধুদার হাতে প্রথম গুলি লাগার পর ওই দৃশ্য দেখে তার মা’ও মারা যান। একই রাতে আরও মারা যান মধুদার সদ্যবিবাহিত পুত্র রণজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী রিনা রানী।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ক্র্যাকডাউনের পর কাশেম মোল্লা পাকশীর রূপপুরে নিজ গ্রামে চলে যান। সেখানে নিজ হাতে লাগান একটি কড়ই গাছ। গাছের পাশেই দেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। তখন স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ইচ্ছায় কাশেম মোল্লা ‘থ্রি ব্র্যান্ডের একটি রেডিও কেনেন। তখন ‘থ্রি ব্র্যান্ড’ রেডিওর মালিক হওয়া ছিল রীতিমতো গর্বের। চায়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় জমানোর জন্য রেডিওটি তিনি প্রতিদিন দোকানে নিয়ে যেতেন। পুরোদমে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হতো। খবর শোনার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে আসতেন। রাতে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতা বেতারের খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ নিয়মিত ভিড় জমাত তার চায়ের দোকানে। খবরে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা শুনে একদিকে যেমন অবরুদ্ধ দেশবাসী উদ্দীপ্ত হতেন, তেমনি দেশজুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো বর্বরতা সম্পর্কেও জানা যেত।
পাকহানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন। চা খেতে আসা লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া নানারকম তথ্য থাকত কাশেম মোল্লার কাছে। গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সম্পর্কে তথ্য দিতেন তিনি।
ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকে তার দোকানে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তার গড়ে ওঠে সখ্য। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েকদিন আগে রাজাকারদের খবরের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সেনারা হানা দেয় কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে। রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার পায়ে আঘাত করে। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত খুঁড়িয়ে হাঁটতেন কাশেম মোল্লা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সন্ধ্যা হলেই রূপপুর গ্রামে হাঁকডাক শুরু হয়ে যেত। গ্রামের লোকেরা একে অন্যকে বলত, ‘চলো বিবিসি শুনতে যাই। এভাবে কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে বিবিসি’র খবর শোনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরও কয়েকশ’ দোকান, বিস্তার লাভ করতে থাকে বাজার, যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘বিবিসি শোনার বাজার’ থেকে মানুষের মুখে মুখে ‘বিবিসি বাজার’ নামে পরিচিত হয়।

NO COMMENTS

Leave a Reply