Home মূল কাগজ ঢাকার শতবর্ষী বৃক্ষ

ঢাকার শতবর্ষী বৃক্ষ

মোকারম হোসেন

ঢাকার শতবর্ষী বা শতাধিকবর্ষী বৃক্ষ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়। কোথাও কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এমনকী ঢাকার বৃক্ষ নিয়ে এযাবৎ কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য-শুমারিও হয়নি। ফলে ঢাকায় এখন থেকে ৪০০ বছর আগে কোথায় কোন ধরনের বৃক্ষ ছিল, বা পরবর্তী সময়ে কি কি ছিল সে সম্পর্কেও কিছু জানা যায় না। তবে এক্ষেত্রে মাত্র ১০০ বছর আগেকার বিক্ষিপ্ত কিছু সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। যা বলধা গার্ডেন বা লন্ডনের কিউ উদ্যানের কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলকের রমনা নিসর্গের পত্তনের সমসাময়িক। কারণ ‘রমনাগ্রিন’ ও বলধা গার্ডেন নির্মাণের কাজ শুরু হয় একবছর আগে পরে; মানে ১৯০৮ ও ১৯০৯ সালের দিকে। এখানে প্রাউডলকের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি আবশ্যক। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময়ে রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে উদ্যাননগরীর আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কর্মকাণ্ডে রবার্ট লুইস প্রাউডলক ছিলেন বৃক্ষশোভিত সরণী ও উদ্যান নির্মাণের দায়িত্বে। তিনি ছিলেন লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের অন্যতম কর্মী। অখিল বাবু তাঁর সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন। পঞ্চাশের দশকের আগেকার রমনা ও এ সংলগ্ন এলাকার বৃক্ষসজ্জার সবটুকুই তখনকার সৃষ্টি। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ায় ঢাকায় রাজধানী নির্মাণের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয় এবং সম্ভবত প্রাউডলক পূর্ণাঙ্গ উদ্যান নির্মাণের অবকাশ পাননি। প্রাউডলকই মূলত এই জঞ্জালের নগরীতে আমাদের ফুসফুস সচল রাখার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিকল্পনার হাত ধরেই আমাদের বৃক্ষশোভা বর্ণিল হয়ে ওঠে। একারণেই রমনার অধিকাংশ সুউচ্চ শতবর্ষী বৃক্ষগুলো প্রাউডলকের পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করা হয়।
সম্প্রতি চারশ বছর পেরুলো ঢাকা। মানব বসতি এবং ইতিহাস-সংস্কৃতির দিক থেকে চারশ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। কিন্তু এই শহরে চারশ বছর তো দূরের কথা, দুশো বছরের পুরনো বৃক্ষও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। দীর্ঘ পরাধিনতা, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, অসচেতনতা এবং মাত্রাতিরিক্ত লালসা, অপতৎপরতায় এখানকার অনেক ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রাচীন বৃক্ষসম্পদও হারিয়ে গেছে। একারণে আমরা সন্ধান করেছি মাত্র শতবর্ষী বৃক্ষগুলোর। এমন বৃক্ষের সংখ্যা মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি। যদিও এসব বৃক্ষ রোপণের সঠিক কোনো সন-তারিখ খুঁজে পাওয়া যায় না, তবুও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র, জনশ্রুতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকেই এই বৃক্ষগুলোকে শতবর্ষী হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। নির্বাচিত বৃক্ষগুলো হচ্ছে রমনার মহুয়া, রমনার কুসুম, রমনার দেশি গাব, হেয়ার রোডের পাদাউক, বেইলি রোডের ব্ল্যাকবিন, ফুলার রোডের তেঁতুল, বাংলা একাডেমি ও মিরপুর বোটানিক গার্ডেনসহ আরো কয়েকটি স্থানের বট, চামেরি হাউজের ছাতিম, বাংলা একাডেমির বহেড়া, তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজের জংলীবাদাম ইত্যাদি।

এবার ঢাকার এমন কিছু উলে­খযোগ্য শতবর্ষী বৃক্ষ সম্পর্কে জানা যাক।

হেয়ার রোডের পাদাউক
প্রধান বিচারপতির বাসভবন থেকে রমনা পার্কের সীমানা পর্যন্ত ছায়ামাখা পথটির দুপাশে বেশ বড়সড় কাণ্ডের গাছগুলোই পাদাউক। পাদাউক আমাদের দেশি গাছ নয়। ধারণা করা হয়, রমনা নিসর্গের গোড়াপত্তনের সময় উষ্ণমণ্ডলীয় অনেক বৃক্ষের পাশাপাশি প্রাউডলক মায়ানমার থেকে এই গাছগুলোও নিয়ে আসেন। গ্রিষ্মে পুষ্পপ্রেমিকদের অনেকেরই সতর্ক দৃষ্টি থাকে পাদাউকের ওপর। অসর্তকতায় একটি উপভোগ্য দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারে এই ভাবনায় প্রতিদিনই নির্দিষ্ট গাছগুলোতে চোখ রাখে সবাই। গোটা বছর ধরে মাত্র একদিনের জন্য ফোটে ফুল। যাঁরা প্রতিদিন হেয়ার রোডে যাতায়াত করেন তাঁদের অনেকেই হয়তো বিষয়টি জানেন না। আপনি কোনো একটি গাছে নিয়মিত চোখ রাখলে হয়তো দেখা পেতে পারেন দুর্লভ এ ফুলটির। দেখবেন অতি প্রত্যুষে সোনালি-হলুদ ফুলে ভরে আছে। সারাদিন পুষ্প-উৎসব শেষে সন্ধ্যায় কোমল পাপড়িগুলো তাদের শেষ পরিণতির জন্য অপেক্ষা করে। পরেরদিন আর কোনো চিহ্নই থাকে না গাছে। প্রস্ফুনের স্বল্পস্থায়িত্বের এমন বৈশিষ্ট্য বিরল। ঢাকায় বিক্ষিপ্তভাবেও চোখে পড়ে। পাদাউক পত্রমেচি উঁচু বৃক্ষ, কাণ্ড অনুচ্চ, শীর্ষ বিশাল, ছত্রাকৃতি, পত্রঘন শাখান্ত দীর্ঘ ও আনত।

রমনার আদি মহুয়া গাছ
রমনা পার্কের অনেকটা পশ্চিম-উত্তর প্রান্তে পার্কের প্রায় সবগুলো পায়েহাটা পথ যে বৃক্ষের পাশে এসে মিশেছে, সেই বৃক্ষটির নামই মহুয়া। গাছটির চারপাশ বেশ বড় আকারে বাঁধানো। গোড়ায় কতগুলো পাথর ছড়ানো। প্রতিদিন পার্কে বেড়াতে এসে অনেকেই এখানে দু’দণ্ড বিশ্রাম নেন। অনতিদূরেই রমনা লেকের ওপর ছোট্ট একটি কালভার্ট। পার্কে নিয়মিত শরীরচর্চাকারীরা এই স্থানটিকে মহুয়াতলা নামেই চেনেন। জানামতে এটি ঢাকার সবচেয়ে বড় ও পুরনো মহুয়া গাছ। প্রস্ফুটন মৌসুমে অসংখ্য বাদুড় এসে জড়ো হয় এখানে। কারণ মহুয়াফুল বাদুড়ের খুব পছন্দ। বয়সের ভারে গাছটির ডালপালা ও পাতার সংখ্যা কমে এসেছে।

ফুলার রোডের পুরনো তেঁতুল গাছ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে জগন্নাথ হল লাগোয়া পথ ধরে একটু এগোলেই উদয়ন স্কুল। স্কুলের মূল ফটকের সামনে দাঁড়ালে বাঁপাশে বিশালাকৃতির একটি তেঁতুল গাছ চোখে পড়বে। অন্য পথে ভিসির বাসভবন থেকে ব্রিটিশ কাউন্সিল হয়ে আরেকটু সামনে এগোলেও পাওয়া যাবে গাছটি। গাছের কালো রঙের কাণ্ড অসংখ্য গুটি ভরতি। সারা গা বিভিন্ন দাগে ক্ষত বিক্ষত। কাটা পড়েছে অনেক ডালপালা। বেশ উপরের দিকে কয়েকটি ডালপালা এখনো সজীব। কালের স্বাক্ষী এই তেঁতুল গাছটি একজীবনে অনেক কিছু দেখেছে। মোকাবেলা করেছে অনেক বৈরি পরিস্থিতির। তুলনামূলকভাবে আরো কম বয়সী কয়েকটি তেঁতুল গাছ দেখা যায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমী এবং রমনা পার্কে।
ফুলার রোডের এই তেঁতুল গাছ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কোনও তথ্য খুঁজে পাওয়া না গেলেও ফুলার রোড সম্পর্কে ইতিহাসবেত্তা মুনতাসীর মামুন ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী গ্রন্থে লিখেছেন- ‘…. ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে এর প্রথম লে. গভর্ণর ছিলেন স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার। মুসলমান সম্প্রদায়ের তিনি ছিলেন প্রিয়ভাজন।’ তেঁতুলের বৃদ্ধি মন্থর। সেই অর্থে পুরু কাণ্ডের গাছ হতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। একারণে এগাছের মূল কাণ্ডের আকৃতি দেখেই ধারণা করা হয় যে গাছটি অতি প্রাচীন। একসময় ঢাকায় রমনা গ্রীনের দক্ষিণ ফটক থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউট পর্যন্ত তেঁতুলের একটি দীর্ঘ বীথি ছিল।

তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজের জংলিবাদাম
তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের গেইট লাগোয়া বিশালাকৃতির গাছটিই জংলিবাদাম। গাছটির উচ্চতা ও ডালপালার বিস্তৃতি দেখেই বয়সটা অনুমান করা যায়। জংলিবাদাম বেশ আকর্ষণীয় গড়নের একটি গাছ। এই গাছের কাণ্ড, ডালপালা, পাতা এবং ফুল ও ফল ভারি সুন্দর। ঢাকায় এই গাছ খুব একটা দেখা যায় না। তবে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোতে মোটামুটি সহজলভ্য।

বেইলি রোডের ব্ল্যাকবিন
প্রায় ৮ বছর আগে গাছটি প্রথম দেখি রমনা পার্কের অদূরে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার উত্তর পাশের সীমানায়। তখন গাছের কাণ্ড ও ডালপালায় ফুলের উৎসব দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ফ্লোরা অ্যান্ড ফউনা অষ্টম খণ্ডের তথ্যমতে ড. সালার খান ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত একটি জার্নালে এই গাছটির কথা উল্লেখ করেছেন। অস্ট্রেলিয়ার উপ-উষ্ণমণ্ডলের এই গাছ আমাদের দেশে কখন ও কিভাবে এসেছে তা এখন আর জানা যায় না। ব্ল্যাকবিন চিরসবুজ গাছ, সাধারণত ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড সরল, কালো ও ডালপালাগুলো ঝুলন্ত। বিজোড়পত্রী, পত্রিকা সংখ্যা প্রায় ১৬টি, ৫ইঞ্চি লম্বা। শীর্ষ পত্রিকা ছোট। পাতা লম্বায় ৫ সেমি.। ফুলের বৈশিষ্ট্য অশোকের কাছাকাছি। কমলা-লাল রঙের নজরকাড়া ফুলগুলো ডালপালা ও পাতার কক্ষে গুচ্ছবদ্ধভাবে থাকে। প্রস্ফুটনকাল এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত।

রমনার কুসুম
রমনাপার্কের অরুণোদয় গেইট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই বীথিবদ্ধ সুউচ্চ কুসুম গাছগুলো চোখে পড়বে। বসন্তে রক্তিম কচিপাতার উচ্ছাসে ভরে ওঠে এই গাছ। তখন সারিবদ্ধ গাছে যে মনোরম শোভা ফুটে ওঠে তার কোনো তুলনা হয় না। বর্ণিল পাতার এসব গাছ দূর থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন পাতা নয় ফুলে ফুলে ভরা কোনো এক পুষ্পবীথি। আসলে রক্তিম কচি পাতাগুলোই এগাছের প্রাণ। কারণ পাতার এমন আলো ঝলমল রূপ থাকতে থাকতে ফুল ফুটলেও ফুলের সৌন্দর্য আমাদের ততটা আকৃষ্ট করে না। এই গাছ কোথাও কোথাও লটকন নামেও পরিচিত। তবে রঞ্জক উদ্ভিদ লটকন বা দইগোটার সঙ্গে এগাছের কোনো সম্পর্ক নেই। কুসুম বিশাল আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ। এই গাছ সাধারণত ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। গাছের মাথার দিকটা বেশ বড়সড় এবং অসংখ্য ডালপালায় ছায়ানিবিড়।

রমনার দেশি গাব
রূপসী বৃক্ষ হওয়া সত্ত্বেও গাব গাছের সৌন্দর্যের প্রতি আমরা অনেকটাই উদাসীন। ভালো কাঠ হয় না বলে মানুষের কাছে এই গাছের তেমন গুরুত্ব নেই। কিন্তু ঝড়-ঝঞ্ঝা ও ভূমির ক্ষয়রোধে এই গাছ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। আমাদের ছায়াসুনিবিড় গ্রামগুলোতে এখনো দু’চারটি করে গাব গাছ চোখে পড়ে।
ঢাকায় রমনা পার্কে একটি শতবর্ষী দেশি গাবগাছ দেখা যায়।

NO COMMENTS

Leave a Reply