Home ফিচার দুদকের নজরদারিতে আবাসন খাত

দুদকের নজরদারিতে আবাসন খাত

0 95

কারিকা প্রতিবেদক
নকশাবহিভূত ভবন নির্মাণ, ফ্ল্যাট বিক্রিতে অনিয়ম, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেওয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের মধ্যে বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশাবহিভূত ভবন নির্মাণের অনিয়মের বিষয়টি সামনে চলে আসে। তাই আবাসন খাতের অন্যান্য অভিযোগের পাশাপাশি রাজউকের নকশাবহিভূত ভবন নির্মাণের অনিয়মটি গুরুত্ব সহকারে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাই এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযানও শুরু করেছে তারা। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য। এ বিষয়ে দুদকের হটলাইন ১০৬ নম্বরে বেশি অভিযোগ আসছে বলেও জানান তিনি। তবে আবাসন খাতের সরকারস্বীকৃত একমাত্র সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বলছে, ফ্ল্যাট হস্তান্তরসহ নানা সমস্যা নিয়ে রিহ্যাবে ৫০০-এর মতো অভিযোগ জমা আছে। তবে এসব অভিযোগ বিপজ্জনক পর্যায়ে আছে বলে মনে করে না এই সংগঠনটি। প্রসঙ্গত, রিহ্যাবের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১০৫৪টি। এই সদস্যরা বছরে প্রায় ১১ হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি করে থাকে।
রাজধানীর বনশ্রীতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নকশা অমান্য করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে ‘শীতল প্রোপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। শীতল গ্র্যান্ড প্যালেস নামে ওই বহুতল ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুদফা নোটিশও পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারপরও ভবন নির্মাণ বন্ধ না করায় গত ১৮ জুলাই সেখানে অভিযান চালায় দুদক। দুদক প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আফরোজা হক খানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় এই অভিযান। পরে রাজউকের নকশা অমান্য করে ভবন নির্মাণের কারণে শেষবারের মতো চূড়ান্ত নোটিশ পাঠায় দুদক। একই সঙ্গে চূড়ান্ত নোটিশ অমান্য করলে রাজউকের জোন-৬-এর অথরাইজড অফিসারকে ভবনের নির্মিত অংশ উচ্ছেদের সুপারিশ করে দুদক টিম।
হটলাইনে অভিযোগ পেয়ে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম গত ১৫ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অভিযান চালায়। সেখানে ভবন নির্মাণের তদারকিতে থাকা রাজউকের অনিয়মের তথ্য মেলে। তাজমহল রোডে ‘ডি বিল্ডার্স অ্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড’ নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান রাজউকের বিধি লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছে বলে অভিযান চলাকালে প্রমাণ পায় দুদক। এ-সময় রাজউক জোন-৩-এর কর্মচারীরাও দুদক টিমের সঙ্গে ছিলেন।
অভিযানের সময় দুদক টিম ও রাজউক জোন-৩-এর সদস্যরা দেখতে পান, ভবনের চারপাশে যে পরিমাণ জায়গা রাখার কথা, তা রাখা হয়নি। ভবন নির্মাণে অনিয়মের বিষয়ে এলকাবাসীর আপত্তিও বেশ পুরনো। আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে ডি বিল্ডার্স অ্যান্ড প্রোপার্টিজকে গত বছর ভবন ভেঙে ফেলার জন্য রাজউক চূড়ান্ত নোটিশও দিয়েছিল। পরে ওই নোটিশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করে আবাসন প্রতিষ্ঠানটি। এ বছরের জানুয়ারিতে ওই রিট খারিজ হয়ে যায়। কিন্তু রিট খারিজ হওয়ার সাত মাস পরও রাজউক নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইন ১০৬-এ বিধি লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ করেন তিনজন ফ্ল্যাট মালিক। এরপর গত ২৬ মে নিউ বেইলি রোডে অভিযান চালায় দুদক। অভিযানের সময় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নোটিশ দেয় দুদক। এ-সময় দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের সঙ্গে রাজউক জোন-৬-এর প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
রাজউকের নকশাবহিভূত ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ ছাড়াও ফ্ল্যাট কেনা নিয়েও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে রিহ্যাব সচেতন আছে বলে জানিয়েছেন রিহ্যাবের ভাইস প্রেন্সিডেন্ট লিয়াকত আলী ভুঁইয়া। তিনি জানান, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তারা সেটা খতিয়ে দেখেন এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নেন।
রিহ্যাব বলছে, ফ্ল্যাট কেনার পর সময়মতো বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি জমা পড়ে। এ তথ্যের সত্যতাও মেলে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এমন অনেক কোম্পানি আছে, যারা ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিকভাবে ফ্লোর বিক্রির নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহের পর উধাও হয়ে গেছে। কোম্পানি ও ব্যক্তির বিরুদ্ধেও এ-ধরনের হয়রানির তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, কিছু ডেভেলপার ভবনের শুধু কাঠামো তৈরি করে ভেতরের সব কাজ ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেয়। মেয়াদ শেষে চুক্তি অনুযায়ী অন্যান্য সিভিল ওয়ার্ক, স্থাপনা যেমন- ট্রান্সফরমার, জেনারেটর, সোলার প্যানেল, লিফট, ইন্টারকম স্থাপন না করে সটকে পড়ে। আর এক্ষেত্রে রিহ্যাব, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা অন্যান্য সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের তেমন কোনো সহযোগিতা পান না প্রতারিত গ্রাহকরা। অথচ এ খাতে সরকারের যে রাজস্ব আয়, তার জোগানদাতা ক্রেতারা, ডেভেলপাররা নয়।
প্রায় আড়াই বছর আগে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার ৭ নম্বর রোডের ৪২৩ নম্বর ভবনের ৩/এ নম্বর ফ্ল্যাটটি কেনেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা প্রকৌশলী দেওয়ান শামসুল হুদা। ফ্ল্যাটের মালিক মুশরাত জাহানকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। এরপর হুদা-দম্পতি তাদের ফ্ল্যাটে ওঠেন। কিন্তু তখনও ফ্ল্যাটটি তাকে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়নি। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর হুদা-দম্পতিকে ওই ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় গত বছরের ২ অক্টোবর আদালত মুশরাতকে এক বছরের কারাদন্ড ও ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা অর্থদন্ডের রায় দেন। তবে কারাদন্ডের রায় হলেও গ্রেফতার হননি মুশরাত। শামসুল হুদা বলেন, ‘ফ্ল্যাট অথবা টাকা ফেরত চাই আমি।’
ট্রাস্ট অ্যালায়েন্স টেকনোলজি লিমিটেড, রিহ্যাবের সদস্য এই কোম্পানিটি আবাসন ব্যবসা শুরু করে ২০০৯ সালে। বারিধারা, গুলশান, উত্তরাসহ রাজধানীর অভিজাত এলাকায় জমি কিনে ফ্ল্যাট নির্মাণের ঘোষণা দেয় এই প্রতিষ্ঠান। এরপর ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে গ্রাহকদের কাছ থেকে সর্বনিম্ন ৫০ লাখ টাকা থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নেয় তারা। এভাবেই প্রতিষ্ঠানটি হাতিয়ে নিয়েছে ৫০ কোটিরও বেশি টাকা। এরপর থেকে কোথাও এই প্রতিষ্ঠানের হদিস মিলছে না।
ট্রাস্ট অ্যালায়েন্সের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা শিকার করেন রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিয়াকত আলী ভুঁইয়া। রিহ্যাব জানায়, প্রতারণায় অভিযুক্ত আবাসন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রিহ্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রিহ্যাব প্লট ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা এবং ভূমির মালিকদের বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে পাঁচটি ডেভেলপার কোম্পানির সদস্যপদ বাতিল করে। ২০১৫ সালে ৮টি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে বহিষ্কার করে। ২০১৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার ডেভেলপার কোম্পানির সদস্যপদ বাতিল করে। আর ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইডিয়াল রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের সদস্যপদ বাতিলের তথ্য জানায় রিহ্যাব।

মিথ্যা তথ্যে হোম লোন নিলে জেল-জরিমানা
মিথ্যা তথ্য দিয়ে হোম লোন (বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণ) নিলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদন্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন আইন, ২০১৯’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। গত ২৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটি অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠক শেষে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘দি বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন অর্ডার ১৯৭৩’-এর অধীনে বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন গঠন করা হয়েছিল। ওই অর্ডারটি পরিমার্জন করে নতুন আইনটি নিয়ে আসা হয়েছে। নতুন আইনে খুব কম পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আগের শাস্তি বাড়ানো হয়েছে।

NO COMMENTS

Leave a Reply