Home চট্টগ্রাম দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল

দৃশ্যমান হচ্ছে স্বপ্নের কর্ণফুলী টানেল

আবদুল্লাহ আল মামুন
লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কর্ণফুলী নদী বঙ্গোপসাগরের যেখানে মিশেছে, সেই মোহনায় নির্মাণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, যা চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের ‘কর্ণফুলী টানেল’ হিসেবে পরিচিত। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে কাজ। ২০২২ সালের পর উন্মুক্ত হবে টানেলের এই স্বর্ণালি দ্বার। ফলে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীর আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলা টানেলের মাধ্যমে মূল নগরের সঙ্গে যুক্ত হবে। চীনের সাংহাইয়ের আদলে গড়ে উঠবে দুই শহরের সমন্বয়ে একটি নগর। ভবিষ্যতে এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কেও যুক্ত হবে এই টানেল। ঢাকার সঙ্গে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সরাসরি সংযোগ স্থাপন হবে।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৩৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নদীর তলদেশে টানেল বোরিং মেশিনের মাধ্যমে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এই মেশিনের মাধ্যমে নদীর তলদেশে দুটি টিউব নির্মাণ করা হবে। প্রতিটি টিউবে দুই লেনের সড়ক নির্মাণ করা হবে। আশা করছি, ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।’
২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে কর্ণফুলী টানেলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও সেতু বিভাগ। প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি)। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। চীন সরকার সহায়তা করবে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা নেভাল একাডেমি থেকে শুরু হয়ে এই টানেল দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো) এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) মাঝামাঝি প্রান্তে যুক্ত হবে। নদীর তলদেশে টানেলের দৈর্ঘ্য হবে ৩ হাজার ৪০০ মিটার (প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার)। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে গাড়ি যাওয়ার জন্য একটি এবং আসার জন্য আরেকটি টিউব তৈরি হবে, যা ‘টানেল’ নামে পরিচিত। প্রতিটি টিউবের প্রস্থ হবে ১০ দশমিক ৮ মিটার। দুটি টিউবে গাড়ি চলাচলের জন্য থাকবে দুটি করে লেন। টিউব দুটির ন্যূনতম দূরত্ব থাকবে ১১ মিটার। আর টানেলটি নদীর তলদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩৬ মিটার এবং সর্বনিম্ন ১২ মিটার মাটির গভীরে নির্মিত হবে।
নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হবে টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) যন্ত্রের মাধ্যমে। মেশিনটি চীন থেকে আনা হয়েছে। এটি নদীর তলদেশে খননের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সড়কপথও নির্মাণ করবে। মেশিনটি বসানো হয়েছে পতেঙ্গা অংশে। গত ২৪ ফ্রেরুয়ারি টিবিএমের মাধ্যমে মূল টানেল খননের কাজ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে ১২০ মিটার খনন করা হয়েছে। এভাবে খনন ও সড়ক তৈরির মাধ্যমে নদীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যাবে মেশিনটি। দক্ষ প্রকৌশলীরা সার্বক্ষণিক কম্পিউটারাইজ পদ্ধতিতে মেশিনটি পরিচালনা করছেন। নির্মাণকাজে অংশ নিচ্ছে ১ হাজার থেকে ১২শ’ শ্রমিক।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টানেল নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিদ্যমান সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ডাউন টাউনকে যুক্ত করা এবং উন্নয়নকাজ ত্বরান্বিত করা, চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ ত্বরান্বিত করা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে নতুন একটি সড়ক-যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে বিনিয়োগ শুরু করেছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে সেখানে আংশিক চালু রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে উঠেছে কিছু শিল্প-কারখানা। টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার আনোয়ারায় একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ‘চায়না ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
২০০৮ সালে চট্টগ্রামে লালদীঘি মাঠের এক জনসভায় কর্ণফুলী টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য অসম্ভব মনে করেছিল অনেকেই। অবশেষে সেই অসম্ভবের টানেল ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

NO COMMENTS

Leave a Reply