Home মূল কাগজ দেশের স্থাপত্য-শিল্পের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে চাই

দেশের স্থাপত্য-শিল্পের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে চাই

0 189

রবিউল হুসাইন
কবি ও স্থপতি

আমাদের ছেলেবেলায় তো আর্কিটেকচার ব্যপারটা কী জানতামই না। সবাই তখন রাজমিস্ত্রি দিয়েই বাড়ি বানিয়ে ফেলত! যদিও আমাদের ঝিনাইদহ শহরে তখন হাবিবুর রহমান নামে একজন আর্কিটেক্ট ছিলেন।
১৯৫৯ সালে আমি মেট্রিক পাশ করি। ’৬১ সালে আইএসসি পাশ করে বেরুনোর কথা। কিন্তু ফেল করার কারণে ৬২ সালে বেরুলাম। ঠিক সেই সময় ইপুয়েট (ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি) হলো। আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইপুয়েট। স্বাধীনতার পর এটা হলো বুয়েট (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি)। ইপুয়েট তখন আর্কিটেক্ট ফ্যাকাল্টি খুলল। ড. রশীদ ইপুয়েটের ভিসি ছিলেন। আর্ট কলেজের (পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট এবং অনুষদ) কাজ শুরু হয়। ওইটার সঙ্গে স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচার হওয়ার কথা ছিল। (ইপুয়েট) ইউনিভার্সিটি করতে গেলে মিনিমাম দুইটা ফ্যাকাল্টি লাগে। তখন ড. রশীদ ওখান থেকে আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিটা ছিনিয়ে নিয়ে আসলেন! আমি ছবি-টবি ভালো আঁকতাম। বন্ধুদের একজন আমাকে বলল, ইপুয়েটে নতুন ফ্যাকাল্টি খোলা হচ্ছে। তুমি তো ছবি আঁকতে পারো, আর্কিটেকচার ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হয়ে যাও। এর আগে আমি মেডিকেলে ভর্তি হয়ে গেছিলাম প্রায়। অ্যালাউ হয়েছিলাম।
ইপুয়েটে ভর্তির আলাপের মধ্যেই আমার ওই বন্ধু বলল, এ বিষয়ে একটু পড়াশোনা করে এসো। আমি কুষ্টিয়ার ঝিনাইদহ থেকে আসা মানুষ। আর্কিটেকচারের বই কোথায় পাব? কুষ্টিয়ার পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলা যাওয়ার অভ্যাস ছিল। খবরের কাগজ আর বই পড়তাম। ওইখানে হঠাৎ একদিন দেখি ইউএস আর্কিটেকচারের (অ্যামেরিকান স্থাপত্য) ওপর একটা বই। সেদিন আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ চুরি চাদরের আড়ালে বই চুরি করে চলে এসেছি! ওই বই থেকে আমি ইউএস আর্কিটেকচার সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম। ভর্তির সময় আমার ইন্টারভিউ খুব ভালো হলো।
ইপুয়েটে সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে আব্বা মারা গেলেন। আমরা নয় ভাইবোন। আমার ছোটভাইও বুয়েটে ভর্তি হয়েছে। আমার চাচা ভর্তি করিয়ে দিয়ে বললেন, তোমাদের ভর্তি করিয়ে দিলাম, কিভাবে পড়বে আমরা জানি না। পড়ার খরচ চালাতে আমি এক জায়গায় ড্রাফ্ট করার চাকরি নিলাম। প্রতি ঘণ্টায় এক টাকা বেতন। তিন ঘণ্টা চাকরি করতাম, তিন টাকায়। ৩০ দিনে ৯০ টাকা। তখন হোস্টেলের খরচ ৩০ টাকা দিলেই হতো। মাকে ১০/২০ টাকা করে পাঠাতাম। আমার ছোটভাই একসময় কেমিকেল কর্পোরেশনে স্কলারশিপ পেল। মাসে ১০০ টাকা। এতে ওর হয়ে যেত।
আমি সারাজীবন চাকরি করেই পড়েছি। ইপুয়েটের জীবনের শুরুর ক’বছর পয়সার অভাবে কোনো কোনোদিন সকালের নাস্তা করতে পারতাম না। পানি খেয়ে ক্লাসে যেতাম। দুপুরে ভাত খেতাম। অফিস থেকে ফিরে এসে সবচেয়ে শেষের খাবার আমি খেতাম। আমি যখন পাশ করে বের হই, তখন ক্যান্টিনের বেয়ারারা অনেক কান্নাকাটি করেছে। ওরা তো দেখেছে কত কষ্ট করে পড়েছি আমি।
মাজহার স্যার (স্থপতি মাজহারুল ইসলাম) ছিলেন আমাদের পার্ট-টাইম শিক্ষক। থার্ড ইয়ারের সময় তিনি এলেন জুরি (প্রজেক্টের বিচারক প্যানেলের জুরি) হিসেবে। আমি আমার ডিজাইন দেখাচ্ছি, ওইটা ছিল ঢাকা নিউ মার্কেটকে ডেভেলপমেন্ট করার একটা ক্লাস- প্রজেক্ট। হঠাৎ আমাদের ক্লাসটিচার এসে বললেন, রবিউল, মাজহারুল ইসলাম তোমার কাজ দেখে পছন্দ করেছেন। তুমি কি ওনার অফিসে কাজ করতে চাও?
থার্ড ইয়ার থেকেই আমি স্যারের অফিসে পার্ট-টাইম কাজ শুরু করে দিলাম। ৫০/৬০ টাকা বেতন দিতেন। যুদ্ধের সময় উনি চলে গেলেন কলকাতা। ওই নয়মাস তার অফিস আমি চালিয়েছি। তখন আমরা তিনজন ছিলাম আর্কিটেক্ট আমি, শামসুল ওয়ারেস আর অপরেশ দাস। আমরা সবাই ক্লাসমেট। মাজহারুল ইসলাম আমাকে বললেন, তুমি অফিস চালাবে। সে অনুযায়ী একটা কাগজে ক্লায়েন্টদের উদ্দেশে ঘোষণা এবং আমার জন্য একটা চেকবইয়ের সবগুলো পাতা (ব্যাংক চেক) সই করে দিয়ে গেলেন।
আমি মনে করি আমার জীবনের অন্যতম একটা অর্জন মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে মেশা। উনি মূলত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু প্যাশনে ও পেশায় পুরোমাত্রায় আর্কিটেক্ট। লেখাপড়া করেছেন অ্যামেরিকায়। আর্কিটেকচার মানে হলো সবদিক থেকে আপনাকে জানতে হবে, বুঝতে হবে। আর্কিটেকচার সম্পর্কে গ্যাটের একটা সংজ্ঞা আছে ‘আর্কিটেকচার ইজ এ ফ্রোজেন মিউজিক’। আর মিউজিক হলো লিকুইড আর্কিটেকচার। এটা আমাদের মাজহারুল ইসলামের মধ্যে দেখেছি। ওনার সব দিকে লক্ষ্য ছিল সাহিত্য, সংগীত, রাজনীতি, নগর পরিকল্পনা কোনোটাতে কমতি নেই। কথা-বার্তা, চাল-চলন সব মিলিয়ে তাকে একজন ফিলোসফার-আর্কিটেক্ট বলা যেতে পারে।
মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ আর্কিটেক্ট। তিনি চট্টগ্রামের সন্তান। তার সবচেয়ে বড় অবদান আমাদের সংসদ ভবন। ফকা চৌধুরী তখন পাকিস্তানের স্পিকার এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৫৯ সালে ঠিক হয় যে, পাকিস্তানের দুটো রাজধানী হবে। মূল রাজধানী ইসলামাবাদে। দ্বিতীয় রাজধানী ঢাকায়। ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে সাজাতে আর্কিটেক্ট দরকার। ফকা চৌধুরী মাজহারুল ইসলামকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, তুমি কাজটা করো। মাজহারুল ইসলাম তার বিচক্ষণতা ও উদারতার পরিচয় দিয়ে বললেন, এত বড় কাজ আমি না করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনো বড় স্থপতি দিয়ে করলে এটা দেশের জন্য ভালো, আমাদের স্থপতিদের জন্যও ভালো। স্থাপত্যশিক্ষার জন্যও ভালো। মাজহারুল ইসলামের প্রস্তাব করা তিন স্থপতির মধ্যে পরে অ্যামেরিকার লুই আই কান কাজটা পান।
মাজহারুল ইসলাম লুই আই কানের সঙ্গে লনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। আমরা দেখেছি। মাজহারুল ইসলাম ব্রিক (লাল ইটের) বিল্ডিংয়ের জন্য কিন্তু পাইওনিয়ার আমাদের দেশে। সংসদ ভবন করার ক্ষেত্রে কিছু ব্যপারে লুই আই কানকে মাজহারুল ইসলাম পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা যেতাম, দেখতাম। মাজহারুল ইসলামের সঙ্গে থেকে শামসুল ওয়ারেস, আবদুর রশীদ, মাহবুব হোসেন খান, আমির হোসেন আমরা অনেক কাজ করেছি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাজহারুল ইসলাম ফিরলে আমরা ভাবছিলাম প্রতিষ্ঠানটা আরও প্রসারিত হবে। কিন্তু তিনি সেটা আর করেননি। তখন অ্যানিমি প্রোপার্টি দেখাশোনা করার জন্যে আমাদের একটা কমিটি করে দেওয়া হলো। এর মধ্যে আমি ছিলাম, আলমগীর কবীর আর শামসুল ওয়ারেস ছিলেন। আলমগীর কবিরকে আমরা এমডি বানালাম, সেইভাবে কাজ এগোত থাকল। এরপর শামসুল ওয়ারেস চলে গেল ইউনিভার্সিটিতে। আলমগীর মস্কোপন্থী বাম রাজনীতি করত। একপর্যায়ে (৭৫/৭৬ সালে) শহীদুল্লাহ সাহেব বললেন যে, আপনি আমার সঙ্গে আসেন। তারপর থেকে তার সঙ্গে কাজ করা। একসময় উনিও আলাদা হয়ে গেলেন। আমি আমার মতো আছি।
সারাদেশে আমার অনেক কাজ ছড়ানো-ছিটানো আছে। এর মধ্যে বার্ক বিল্ডিং আমার খুব প্রিয় কাজ। এটার বৈশিষ্ট্য হলো, সব কিছু ইটের তৈরি। ছাদে আড়াআড়ি ইট দিয়ে আর মাঝখানে রড দিয়ে ঢালাই করা। সিঁড়িও তাই। সেজন্য এটা আমার খুব পছন্দের কাজ। ভেবেছিলাম এটার জন্য আগা খান পুরস্কার পাব। পাইনি। দুর্ভাগা মানুষ তো আমি!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তি ও স্বাধীনতা তোরণ (নীলক্ষেত অংশে) ডিজাইন করেছি। আমি অনেক ব্রিকের (ইটের) কাজ করেছি। বিশ্বব্যাংকের একটা কৃষিভিত্তিক প্রজেক্ট করেছিলাম। ওটাকে বলে ‘ব্রিক ভল্ট’। সাত’শ নাকি কত জায়গাতে এটা রিপিট হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, কিছু বিল্ডিং, ভাসানি হল, বঙ্গবন্ধু হল, শেখ হাসিনা হল, খালেদা জিয়া হল, দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার, কিছু কিছু হাউজিং ও একাডেমিক বিল্ডিং ডিজাইন করেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া সায়েন্স কমপ্লেক্স করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম ও একাডেমিক ভবন কমপ্লেক্স করেছি। হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের একটা ভবনের কাজ চলছে। দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেইট, বিকেএসপি, দিনাজপুরের এইট লেন্থ সুইমিং পুলসহ কমপ্লেক্স করেছি। সাভার বিকেএসপির শুটিং রেঞ্জের ডিজাইন করেছি। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ইউনিভার্সিটির ডিজাইন করেছি। তিনটা মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ডিজাইন করেছি। সামনেও হয়তো সুযোগ পেলে আরও কিছু করব। দেশের জন্য। দেশের স্থাপত্য-শিল্পের সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যেতে চাই।
অনুলিখন : সোহরাব শান্ত

NO COMMENTS

Leave a Reply