Home মূল কাগজ ব্যক্তিত্ব দেয়াল একটি বড় মনোজাগতিক বাধা

দেয়াল একটি বড় মনোজাগতিক বাধা

রফিক আজম

চেন্নাই, ঢাকা, সিঙ্গাপুর বা অস্ট্রেলিয়ার কোনো শহরে রফিক আজমের কাজ সহজেই চেনা যায়। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের স্থপতিদের মধ্যে রফিক আজম তাঁর কাজের মাধ্যমে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ওয়ার্ল্ড আর্কিটেকচার কমিউনিটি পুরস্কার, কেনেথ এফ ব্রাউন এশিয়া প্যাসিফিক কালচার অ্যান্ড আর্কিটেকচার ডিজাইন পুরস্কার, এআর অ্যাওয়ার্ড ফর ইমার্জিং আর্কিটেক্টস পুরস্কার, সাউথ এশিয়া আর্কিটেকচার কমেন্ডেশন পুরস্কারসহ স্থাপত্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।
অথচ রফিক আজম কখনো স্থপতি হতে চাননি। হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী। এমনকি ১৯৭৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে ছবি আঁকায় তিনি ‘জওহরলাল নেহরু’ স্বর্ণপদক লাভ করেন। কিন্তু পরিবারের ইচ্ছায় বুয়েটে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। স্থাপত্যের জ্ঞান আর শিল্পী মনের যোগসাজশে রফিক আজম বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পে বিরাট পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের নানা দেশে রয়েছে তার দৃষ্টিনন্দন সব স্থাপনা। প্রকৃতির সঙ্গে বিরুদ্ধতা নয়, যেন প্রকৃতির ভেতর থেকেই গড়ে ওঠে এসব স্থাপনা।
রফিক আজমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়, লালবাগে। পরিবারেই ছিল সাংস্কৃতিক আবহ। ফলে পরিবার থেকেই তিনি শিল্পের শিক্ষাটা পেয়েছেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে রফিক আজম ষষ্ঠ। মায়ের বাগান করার শখ ছিল। ভাই-বোনেরা গান করতেন, ছবি আঁকতেন, রাতের বেলায় সবাই মিলে গল্পের আসর বসাতেন। যৌথ জীবনযাপনের শিক্ষাটা তাঁর ছোটবেলার। বিচ্ছিন্নতার এ যুগে সবাই যখন আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপনে ব্যস্ত, রফিক আজমের স্থাপত্যশৈলী, তাঁর নির্মাণ আমাদের যূথবদ্ধতার প্রেরণা জোগায়। প্রথাগত স্থাপত্যের সঙ্গে রফিক আজমের স্থাপত্যের বেশকিছু অমিল রয়েছে। যেমন, তিনি স্থাপনা থেকে দেয়ালের ধারণা তুলে দিতে চান। নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিকই থাকবে কিন্তু কোনো দেয়াল থাকবে না। মানুষে মানুষে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেয়াল একটি বড় মনোজাগতিক বাধা বলে মনে করেন তিনি। দেয়াল যেন দু’পাশের মানুষের মধ্যে এক বৈরিতা তৈরি করে এমনই ভাবনা তাঁর। এজন্য বসতবাড়ি থেকে দেয়াল উঠিয়ে দিয়েছেন তিনি। পথিকের জন্য বিশ্রামের জায়গা এবং খাবার পানির ব্যবস্থা রাখার চেষ্টা করেন। পথচলা মানুষ যেন দেয়াল দেখে বাড়ির মালিককে অন্য পক্ষ মনে না করে, বিরূপ না হয়, ওই বোধ যেন পথিকের মধ্যে তৈরি না হয়, সেটাই রফিক আজমের চাওয়া।
রফিক আজম জানলেন, গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যকে শহুরে বহুতল ভবনে তুলে আনতে চান তিনি। যেমন, আগেকার গ্রামীণ বাড়িগুলোতে এক চিলতে উঠোন ছিল, পুকুর ছিল, ছিল ফুল ও সবজির বাগান। জাতি হিসেবে আমরা খুব অতিথিপরায়ণ। মেহমানদের জন্য বৈঠকঘর, বসার জায়গা ইত্যাদি থাকত। তাছাড়া পথিক এলে বিশ্রাম ও জলপানের ব্যবস্থা থাকত আমাদের গ্রামবাংলার বাড়িগুলোতে। বাতাসের প্রবাহ যাতে ঠিকঠাক পাওয়া যায়, এজন্য বাড়িগুলোর ডিজাইন সেভাবে করা হতো। তাছাড়া আলোর বিষয়টাও প্রাধান্য পেত তখনকার বাড়িগুলোতে। শহরে এখন বাড়ির জন্য অত জায়গা পাওয়া সম্ভব না। কেননা আমাদের শহরগুলো গড়ে উঠেছে পরিকল্পনাহীনতার মধ্য দিয়ে। উঠোন-পুকুরওয়ালা বাড়ির জায়গায় তরতর করে উঠে যাচ্ছে বহুতল ভবন।
স্থপতি হিসেবে রফিক আজমের যাত্রা শুরু হয় বুয়েটে তিনি যখন তৃতীয় বর্ষে পড়েন, তখন। তাদের নিজেদের বাড়ির ডিজাইন করতে দেওয়া হয়েছিল অন্য একজন স্থপতিকে। কিন্তু সেই স্থপতির ডিজাইন পছন্দ হয়নি রফিক আজমের মায়ের। তখন দায়িত্ব নেন রফিক আজম। ১৯৮৭ সালে নির্মিত বাড়িটিই সম্ভবত প্রথম বাড়ি যার দোতলায় বাগান আছে। মায়ের শখ ছিল বাগানের। রফিক আজম সেদিকে খেয়াল রেখে বাড়িটি সেভাবে ডিজাইন করেন। বাড়ির উঠোনে যেমন বসার জায়গা থাকে, তেমনই খোলা জায়গা রেখেছেন দোতলায়। অর্থাৎ, মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রথম বাড়ির ডিজাইন করেন রফিক আজম।
সবুজ স্থাপত্যের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯৫ সালে রফিক আজম গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘সাতত্য’। সাতত্য অর্থ প্রবহমানতা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে আত্মিক সংযোগ স্থাপন করা।
সাতত্যের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে রফিক আজম বলেন, ‘বাংলাদেশের স্থাপত্যের এক সমৃদ্ধ অতীত রয়েছে। একদম শুরু থেকে আমাদের হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রচুর দৃষ্টিনন্দন মন্দির ছিল। স্থাপত্য হিসেবে এগুলো খুব উঁচু মানের। এরপর প্রাক মুঘল আমল থেকে ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত আমাদের স্থাপত্যশিল্প দারুণ উন্নত। এসব স্থাপত্যে প্রতিটি সময়কে সফলভাবে ধরা রয়েছে। ১৯৫০ দশকের মাঝামাঝি থেকে ৬০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত আধুনিক স্থাপত্য বিকশিত হয়েছে আমাদের এখানে। তখন আমাদের এখানে মাজহারুল ইসলাম, লুই আই কান, পল রুডলফ, কনস্টানটিনো ডজিডাসের মতো স্থপতিরা কাজ করেছেন। এরপর দুঃখজনকভাবে এ অগ্রযাত্রাটি থেমে যায়। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিশ্বের অন্যান্য দরিদ্র দেশের মতো জলবায়ু, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিষয় আমলে না নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক অপরিকল্পিত স্থাপনা। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপত্যশিল্পে আমাদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ও এটিকে কিছুটা সুশৃঙ্খল রূপ দিতেই সাতত্য যাত্রা শুরু করে।’
রফিক আজম যে সবুজের চর্চা করতে চান, তার জন্য সৌখিন নার্সারিতে যেতে হয় না। বাড়ির উঠোন, বাগানে যেসব উদ্ভিদ জন্মে, সেগুলোকেই তিনি নিয়ে আসেন বহুতল ভবনে। দেশে-বিদেশে নানা মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন রফিক আজম। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে খÐকালীন শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস নেন।
ঠাস বুনোটের এ শহরে রফিক আজম তাঁর কাজের ভেতরে মানুষের জন্য ফাঁকা জায়গা নির্মাণ করতে চান। তাঁর মতে, ওই শূন্যতার অনুভব আনতেই আশপাশে কিছু পূর্ণ স্থান দরকার পড়ে। কেননা, শূন্যতাকে বোঝার জন্য অন্যান্য অনুষঙ্গ লাগে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য স্থাপত্যের ভ‚মিকাকে প্রাধান্য দেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রকৃতির মধ্যে যে বৈচিত্র্য, রফিক আজম তার স্থাপত্যে সেসবই তুলে আনতে চান। ফলে, তাঁর স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় বাংলার প্রকৃতির আদল। বহুতল ভবনের ওপরে পুকুর! সেখানে আবার ছোট্ট নৌকা রাখা! কে ভাবতে পেরেছিল এসব? রফিক আজম ভিন্নভাবে ভাবতে পেরেছেন বলেই বিশ্বের অনেক জায়গায় তাঁর দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় এখন। বাংলাদেশের স্থাপত্যও অনেকটা তাঁর কারণে বহির্বিশ্বে আলোচিত। নিসর্গের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনে হঠাৎ দেখা যাবে ছাদের ফাঁকা জায়গা থেকে আলো আসছে, সূর্যের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখেন তাঁর ভাবনায়। আলো ও বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন রফিক আজম। তার স্থাপনাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই সম্ভবত প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের একাত্মতা। স্থাপনাগুলো ভেতরমুখী নয় যেন বহির্মুখী। রফিক আজম মনে করেন, ‘মানুষ কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রকৃতির অংশ। সুতরাং সবুজ প্রকৃতি এবং সতেজ বাতাস ছাড়া মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব। সবুজ প্রকৃতি হলো অক্সিজেনের প্রধান উৎস।’
ব্যক্তিগত অনেক স্থাপনা নির্মাণ করেছেন তিনি, এখন পুরো শহরের মানুষের জন্য কিছু করতে চান। মানুষের সঙ্গে থেকে কাজ করে হতে চান মানুষের স্থপতি।
পুরনো ঢাকার বেশকিছু পার্ক নতুনভাবে তৈরি করছেন তিনি। পুরান ঢাকা বা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ওই প্রকল্পের নাম ‘জল সবুজে ঢাকা’। এ প্রকল্পে সর্বমোট ৩১টি পার্কের কাজ চলছে এর প্রধান স্থপতি রফিক আজম। এগুলোর মধ্যে তিনি সরাসরি যুক্ত আছেন ১৭টি পার্কের সঙ্গে।
রফিক আজম মনে করেন সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনে রাজনৈতিক নেতারা সবচেয়ে বড় ভ‚মিকা রাখতে পারেন। স্থাপত্য সমাজ পরিবর্তনে কাজ করতে পারলেও এ শিল্পটিকে কাজ করতে হবে রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই। ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে তিনি সব সাধারণ মানুষের বসবাসের উপযোগী একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চান।

অনুলিখনঃ মেহেদী রাসেল

NO COMMENTS

Leave a Reply