Home ঠিকানা দ্রোহী ঐতিহ্যের মধুর ক্যান্টিন

দ্রোহী ঐতিহ্যের মধুর ক্যান্টিন

0 1421
কারিকা ডেস্ক
জরাজীর্ণ দেয়াল, ভাঙা চেয়ার, টেবিল সব কিছুতেই রয়েছে অনেক স্মৃতি, ইতিহাসের পরম স্পর্শ। হাজারো হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ এবং স্বাধিকার আন্দোলনের নীরব সাক্ষী হয়ে এখনো গৌরবের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্র আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিন। মধুর স্টল, মধুর টি-স্টল, মধুর রেস্তোরাঁ থেকে কালক্রমে প্রতিষ্ঠিত মধুর ক্যান্টিন’ নামটিই যেন একটি ইতিহাস।
৪৮-এর ভাষা আন্দোলন, ৪৯-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, ৫২-র আগুনঝরা দিন, ৫৪-র যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী যুদ্ধ, ১৯৫৮-৬০ সালের প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-র ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এ সবকিছুর সঙ্গে মধুর ক্যান্টিনের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
প্রবীণ রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে জানা যায়, ৬৯ থেকে ৭১ পর্যন্ত বহু বৈঠক মধুদার ক্যান্টিনে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এসব বৈঠক সম্পর্কে রাজনৈতিক নেতারা ছাড়া শুধু মধুদাই অবহিত থাকতেন। মধুদা সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। মধুর ক্যান্টিন ছিল প্রগতিবাদী গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের অলিখিত হেড কোয়ার্টার।
বাঙালির স্বাধিকার অর্জনের ইতিহাস থেকে মধুর ক্যান্টিনকে আলাদা করা কঠিন। নিজস্ব ভূখন্ডে সামাজিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী সবার প্রিয় মধুদা। আর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আন্দোলনের মুখ্য পীঠস্থান অথবা তার বীজরোপণের জমিন ছিল মধুর ক্যান্টিন।
উনিশ শতকের প্রথম দিকে বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সঙ্গে মধুদার পিতামহ নকরীচন্দ্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যবসা প্রসারের উদ্দেশে নকরীচন্দ্র তার দু’পুত্র আদিত্যচন্দ্র ও নিবারণ চন্দ্রসহ ঢাকায় আসেন। তারা জমিদার বাবুর জিন্দাবাজার লেনের বাসায় আশ্রয় নেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর নকরীচন্দ্র পুত্র আদিত্য চন্দ্রের ওপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা প্রসারের দায়িত্ব দেন। নকরীচন্দ্রের মৃত্যুর পর আদিত্যচন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেন। ব্রিটিশ পুলিশ এ সময় ক্যাম্পাসের আশপাশের ব্যারাক ও ক্যাম্প প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিলে আদিত্যচন্দ্র ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে ৩০ টাকার বিনিময়ে দুটি ছনের ঘর ক্রয় করে তার একটিতে বসবাস শুরু করেন। মধুদা তখন ১৫ বছরের তরুণ। তিনি ১৯৩৪-৩৫ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিতা আদিত্য চন্দ্রের সঙ্গে খাবারের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৩৯ সালে পক্ষাঘাতে পিতার মৃত্যুর পর মধুদা পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন। পাশাপাশি তার বড়ভাই নারায়ণ চন্দ্রের পড়াশোনার খরচ জোগাতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দাবির পেক্ষিতে ডাকসু কার্যক্রম শুরু হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের পাশে মধুদার দায়িত্বে ক্যান্টিন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগেই এর সূচনা। চারদিকে দেয়ালঘেরা এ ভবনটি নবাবদের একটি বিশ্রামাগার হিসাবে ব্যবহার করা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন ঢাকা মেডিকেল থেকে স্থানান্তর করে বর্তমান ভবনে আনা হলে মধুদাও এখানে চলে আসেন। মধুদার বন্ধুসুলভ আচরণ ও সততার জন্য তিনি ছাত্রদের কাছে বেশ বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে ক্যান্টিনটি ক্রমেই ছাত্ররাজনীতির মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়।
মধুর ক্যান্টিনে উঠতি লেখক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, সেরা ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের ভিড় ছিল সবসময়। অনেকেই দাম মেটাতেন, কেউ কেউ লিখে রাখতে বলতেন। মধুদার হিসেবের খাতাটি নিয়েও রঙ্গ-রসিকতার কম ছিল না। খাতাটির শিরোনাম ছিল ‘না দিয়া উধাও’।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মধুর ক্যান্টিন পাক-বাহিনীর রোষানলে পড়ে। এর জের ধরে ‘৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন সবার প্রিয় মধুদা, তার স্ত্রী, বড় ছেলে ও তার নববিবাহিত স্ত্রী। এরপর ক্যান্টিনের হাল ধরেন মধুদার বড় মেয়ে। এক সময় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলে এটি চলে আসে তার বড় ছেলে অরুণ কুমার দে’র কাছে। অরুণদাই মধুর ক্যান্টিন এখনো পর্যন্ত করে রেখেছেন গতিময়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ অযত্ন আর অবহেলায় ধীরে ধীরে জৌলুস হারাচ্ছে মধুর ক্যান্টিন। চেয়ার-টেবিল সঙ্কট, অপরিচ্ছন্নতা এবং অস্বাস্থ্যকর ও নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করে গলাকাটা মূল্য আদায়ের কারণে এমনটি ঘটছে বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। এখানকার চায়ের যে আলাদা একটা স্বাদ ছিল, সেটিও নেই। মিষ্টিগুলো ছোট হতে হতে মাছের চোখের মতো আকার নিয়েছে। নেই পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল। ক্যান্টিন দেখতে আসা দর্শনার্থীরা ফিরে যাচ্ছেন নিরুৎসাহিত হয়ে। একসময় ছাত্রনেতারা ক্যান্টিনের মধ্যে নেতাকর্মীদের নিয়ে গোলটেবিল আলোচনা ও আড্ডা দিলেও এখন আর সেই সুযোগ নেই তাদের। বাধ্য হয়েই তাদের এখন বসতে হচ্ছে ক্যান্টিনের সামনের আমতলা আর বেলতলায়।
এ বিষয়ে ক্যান্টিনের স্বত্বাধিকারী অরুণ কুমার দে বলেন, অনেক আগে আমি ক্যান্টিনের সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাচ্ছি না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মধুর ক্যান্টিনের ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা সর্বদা সচেষ্ট। কিছু পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অতি দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply