Home অন্তর্জাতিক নগরের কথা,লন্ডন

নগরের কথা,লন্ডন

এম এ মোমেন


হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা গানটি একসময় শহরবাসীদের নাড়া দিত
শোনো বন্ধু শোনো
প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা
ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুণ মর্মব্যথা
এখানে আকাশ নেই এখানে বাতাস নেই
এখানে অন্ধগলির নরকে মুক্তির আকুলতা…

এই গানের বাণীতে মিথ্যে কিছু নেই, কিন্তু এটাও তো সত্য সব আকুলতাকে ছাপিয়ে যায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার আকুলতা। এই আকুলতা কেবল বাংলাদেশে নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বে সর্বত্রই। এর কারণ জীবিকার অন্বেষণ।
নগরের জীবন নৈব্যক্তিক, সম্পর্ক চুক্তিভিত্তিক, গতিশীল ও পরিবর্তনশীল এবং যৌক্তিকতাভিত্তিক। আজ বিশ্বায়নের উত্তরোত্তর তাড়না নগর থেকে উদ্ভূত।
নগর পত্তনের ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিক হিসেবে প্রায় দশ হাজার বছরের। আজ থাকল লন্ডন শহরের গড়ে ওঠার কাহিনি।

রমেশচন্দ্র দত্ত ১৮৬৮’র এপ্রিল থেকে ১৮৬৯’র জুলাই পর্যন্ত লন্ডনে অবস্থান করেছেন। একই বছরের জুনে তিনি সিডেনহেম কাচের প্রাসাদ দেখতে গিয়েছিলেন। তারই বর্ণনা ‘উহা অতি বৃহৎ প্রকাণ্ড অট্টালিকা, পাতলা লৌহখণ্ডের গরাদিয়া দ্বারা সংযুক্ত চিকন কাঁচখণ্ডে নির্মিত। মধ্যদেশে একটা প্রকাণ্ড খিলান ও তাহার উভয় পার্শ্বে দুইটা দালান আছে। সূর্যকিরণে যখন ঝকমক করিতে থাকে তখন উহার দর্শন অতি চমৎকার। উক্ত প্রাসাদের বাহিরে দুর্ব্বাদন আচ্ছাদিত ক্ষেত্র প্রস্তও খণ্ড বিনির্মিত পদবী ও জ্যামিতিক আকারের ন্যায় অতি সুন্দর রূপে নির্মিত ফুলের চৌকা আছে।’
ভবনের স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণ-কুশলতা নিয়ে তিনি অনেক কথা লিখেছেন ‘এটা মনুষ্য-নির্মিত। সাথে আছে প্রকৃতির বৈচিত্র্য। ৮ নভেম্বর প্রাতে (লন্ডনে) শয্যা হইতে গাত্রোত্থান করিয়া দেখি, কি পথ, কি অট্টালিকা, কি উপবন, কি পাদপশ্রেণি সকলই তুষারে আবৃত। বোধ হইল যেন সকল পদার্থ রৌপ্যমণ্ডিত হইয়া রহিয়াছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এক লন্ডন নগরের মধ্যে দরিদ্র্যশালায় প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার লোক প্রতিপালিত হইতেছে। তদতিরিক্ত অগণ্য অনাথ-নিবাস ও চিকিৎসালয় আছে। …এখানে জারজ ও অনাথ সন্তানগণের পালনার্থে একটি গৃহ আছে। আমি তথায় সর্বদায় গিয়া থাকি। এই দুঃখী সন্তানগণ মাতাকর্তৃক পরিত্যক্ত হওয়াতে তাহারা এখানে ভরণপোষণ ও শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়।’
বিলেতে তাকে আকৃষ্ট করেছে মানুষের স্বাধীনতা। লন্ডনের মানুষের স্বাধীন জীবন দেখে তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘বঙ্গদেশে মানুষের স্বাধীনতা নাই’।
এই হচ্ছে দেড়শ বছর আগে বাঙালির চোখে লন্ডন।
অপর একজন বাঙালি পরিব্রাজক লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থাৎ মাটির তলায় সুড়ঙ্গপথে ভ্রমণে যেমন মুগ্ধ, তেমনি বিষ্মিত উপরের দৃশ্য দেখে। তার বয়ান, ‘ভূতল ছাড়িয়া নভোমণ্ডলের দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করি। দেখিতে পাই আকাশপথ তারজালে আচ্ছন্ন; টেলিগ্রাফ তারের ঠাসবুনানি মাকড়সার জালকে হার মানাইয়াছে।’
বলা আবশ্যক, উপরের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞাপনের বোর্ড দেখা যায়, কিন্তু তার দেখা যায় না, তারও বেছে নিয়েছে ভূগর্ভস্থ পথ। টেলিগ্রাফের যুগ শেষ হয়ে গেছে। তার-নির্ভর প্রযুক্তিও বাতিল হতে চলেছে।’

NO COMMENTS

Leave a Reply