Home মূল কাগজ ইন্টেরিয়ার নগরে ভার্টিক্যাল গার্ডেন

নগরে ভার্টিক্যাল গার্ডেন

আহসান রনি
চোখের সামনে ঘন গাঢ় সবুজ দেখতে কার-না ভালো লাগে। বিশেষ করে কম্পিউটারের সামনে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ বারান্দা বা জানালার গ্রিল জড়িয়ে কাঁপতে থাকা কচি সবুজ পাতার দিকে তাকালেই যেন দু’চোখ জুড়িয়ে যায়। কিংবা পড়তে পড়তে, লিখতে লিখতে বা একাধারে কাজ করতে করতে যে একঘেয়েমি ও বিষণœতার ছাপ পড়ে চোখে-মুখে, তা দূর করতেও চাই চোখের সামনে শুধুই সবুজ আর সবুজ। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলেই ঘরের দেয়ালজুড়ে সবুজ দেখতে পারাটা চোখ ও মনের শান্তি ভরপুর মিটিয়ে দেয়। আর সবুজের এসব অসম্ভব আবদার কেবল সম্ভব করতে পারে ভার্টিক্যাল গার্ডেন।
বাগান সৃজনের একটি বিশেষ পদ্ধতি ‘ভার্টিক্যাল গার্ডেন’, যেখানে অল্প জায়গায় অধিক গাছ রোপণ করে স্থানটি সবুজে সাজিয়ে তোলা যায়। যাদের ছাদে বা আঙিনায় বাগান করার সুযোগ নেই, তাদের জন্য ভার্টিক্যাল গার্ডেন বা উলম্ব^ বাগান ইদানীং খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। যদিও ভার্টিক্যাল গার্ডেন বাড়ির ছাদে কিংবা যেকোনো পরিসরেই করা সম্ভব, তবুও শহরের সবুজপ্রিয় মানুষ বিকল্প জায়গা না পেয়ে বারান্দা ও ঘরের দেয়ালকেই বেছে নিচ্ছে।
যেহেতু ভার্টিক্যাল গার্ডেনে স্তরে স্তরে বা ধাপে ধাপে তুলনামূলক কম দূরত্বে একটার পর একটা গাছ রোপণ করা হয়, তাই অগভীরমূলীয় প্রায় সব বীরুৎজাতির উদ্ভিদ ভার্টিক্যাল গার্ডেনের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। তবে রোদ বা আলো-বাতাসের প্রাপ্যতাভেদে অগভীরমূলীয় ফুল, সবজি, ফল কিংবা পাতাবাহারি গাছের চারা রোপণ করেও ভার্টিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা যায়।
ছাদে বা বারান্দায়, যেখানে দিনে অন্তত ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সরাসরি আলো পৌঁছে, সেসব জায়গায় চাইলেই ফুল বা শাক-সবজি লাগিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন গড়ে তোলা যায়। বিশেষত শীতের ফুল, যেমন- পিটুনিয়া, ভার্বেনা, ডায়ানথাস, এসটার, ফ্লক্স, সিলভিয়া, জিনিয়া ইত্যাদি ফুল দিয়ে সহজেই ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। পাশাপাশি প্রায় সারা বছর ফোটে এমন ফুল যেমন মর্নিং ডোয়ার্ফ গøরি, পানিকা, চাইনিজ টগর ও পুর্তলিকা দিয়েও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। একইভাবে বারান্দা ও ছাদে ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে তাতে শাক-সবজি লাগিয়েও ভালো ফলন পাওয়া যায়। টমেটো, চেরি টমেটো, লেটুস, ব্রোকলি, মরিচ, ক্যাপসিকাম, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক ইত্যাদি শাক-সবজি সহজেই ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে চাষাবাদ করা যায়।
ঘরের ভেতরে, লিভিং রুম বা অফিসেও চাইলে ছায়াবান্ধব পাতাবাহারি গাছ দিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা যায়। মানিপ্ল্যান্ট, এলোকেশিয়া, ফার্ন, স্পাইডার, লিলি, এনথোরিয়াম, বোট লিলি, ড্রাসেনা, মেরেন্টা, মনস্টেরা ইত্যাদি গাছ দিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন করে অফিস বা বাসাবাড়ির ভেতরের দেয়ালগুলো নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলা যায়। ইদানীং বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্লাস্টিক, লোহা, স্টিল বা কাঠের ফ্রেম বানিয়ে দেয়ালে সেট করে তাতে পোর্টেবল টব ঝুলিয়ে ভার্টিক্যাল গার্ডেন তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেয়ালের ধাপে ধাপে সিমেন্টের স্থায়ী বেড বানিয়েও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়। তবে আধুনিক পদ্ধতির ভার্টিক্যাল গার্ডেনের অনেক উপকরণ আমাদের দেশে উৎপাদন না হওয়ায় দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে বেশ খানিকটা খরচ পড়ে যায় উন্নত প্রযুক্তির ভার্টিক্যাল গার্ডেন সৃজনে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রচলিত পদ্ধতিতে বাঁশ, কাঠ ও রডের মতো সহজলভ্য উপকরণ দিয়ে তুলনামূলক কম খরচেও ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা সম্ভব। ভার্টিক্যাল গার্ডেনে যেহেতু পরিচিত ও দেশীয় সহজলভ্য গাছগুলোই রোপণ করা হয়, তাই এর যতœ ও পরিচর্যা-পদ্ধতি খুব একটা জটিল নয়। পরিমিত পানি ও প্রতি এক-দুই মাস অন্তর পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, সার, ভিটামিন সরবরাহ করলেই গার্ডেন সবুজ ও সতেজ থাকে। এ ছাড়াও অটোমেটিক ড্রিপ ইরিগেশন সিস্টেম চালু করে তার সঙ্গে টাইমার কিংবা সেন্সর সেট করে সঠিক পানি-ব্যবস্থাপনা করা যায় ভার্টিক্যাল গার্ডেনে। আর একসঙ্গে যেহেতু পাশাপাশি অনেকগুলো গাছ থাকে, তাই রোগবালাই যেমন ছত্রাক বা ভাইরাসের আক্রমণ হলে তা দ্রæত ছড়ায়। ফলে আক্রান্ত গাছকে দ্রæত প্রতিস্থাপন করে সহজেই প্রতিকার পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি কিছু জৈব বালাইনাশক ও প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি বায়ো পেস্টিসাইড স্প্রে করেও প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
ভার্টিক্যাল গার্ডেন আয়তনে বড় হলে মাটির পরিবর্তে কোকোডাস্ট, পার্লাইট, পিটমস, কম্পোস্ট কিংবা অর্ধেক মাটি অর্ধেক কোকোডাস্ট বা কম্পোস্ট মিশিয়েও গ্রোইং মিডিয়া তৈরি করা যায়। মাটিবিহীন ভার্টিক্যাল গার্ডেন একদিকে যেমন হালকা ও টেকসই হয়, অন্যদিকে কাদা-ময়লা ও রোগবালাইও তুলনামূলক কম হয়। পাশাপাশি হাইড্রোফোবিক বা জলচাষ পদ্ধতিতেও মাটিবিহীন ভার্টিক্যাল গার্ডেন করা যায়।

NO COMMENTS

Leave a Reply