Home মূল কাগজ নগরে সবুজ আবাস গড়তে অকৃত্রিম বন্ধু

নগরে সবুজ আবাস গড়তে অকৃত্রিম বন্ধু

0 200

সোহরাব আলম


শহরের ভেতরে থাকা ফাঁকা জায়গাগুলোতেও দ্রুত মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ইট-পাথরের ভবন। নগরায়ণের এই অদৃশ্য পাগলা ঘোড়া মাড়িয়ে দিচ্ছে হাজারো গাছের প্রাণ। ফলে আশঙ্কাজনক হারে কমছে নগরের সবুজ। বিশেষত ঢাকা শহরে এই সমস্যা বেশ প্রকট। দরকারি অক্সিজেনসমৃদ্ধ নির্মল বায়ু পেতে এবং সৌন্দর্যের জন্য যে পরিমাণ গাছপালা তথা সবুজ থাকা দরকার তা ঢাকায় কতুটুকু আছে?
বিদ্যমান এই পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে নগর-পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে সচেতন নাগরিকরা ঢাকায় সবুজায়নে কাজ করে যাচ্ছে। কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কেউ সাংগঠনিকভাবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগকে কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে সাংগঠনিক রূপ দিয়ে সবুজায়নে কাজ করছেন এমন উদাহরণও আছে। ঢাকা মহানগরীতে এখন বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের কার্যক্রমের বদৌলতে শহরের অনেক বাসা-বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বারান্দা সবুজ হয়ে উঠেছে ফুল-ফল-সবজির গাছে। ছাদে শোভা পাচ্ছে পরিকল্পিত বাগান। এমনকি সবুজ হয়ে উঠছে সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন, সড়কসহ বিভিন্ন কারখানা। সংগঠনগুলো ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গাছ লাগানোসহ বাসা-বাড়ি, অফিস ও কারখানায় সবুজায়নে কাজ করছে। সেবা দিচ্ছে রোপণ করা বা টবে লাগানো গাছের নিয়মিত যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রেও। ঢাকা শহরে এই ছাদবাগান কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করেছেন কিছু সংগঠন ও ব্যক্তি।
একটা সময় ছিল যখন স্বল্পসংখ্যক বাড়ির মালিক ছাদে বাগান করতেন। এখন রাজধানী ঢাকাসহ অন্য শহরগুলোর অনেক বাড়িতেও দেখা যায় ছোট বাগান। বিশেষ করে আগের তুলনায় গত ৫-৭ বছরে ছাদবাগান ও বারান্দায় নান্দনিকভাবে গাছ লাগানোর চর্চা শুরু হয়েছে জোরেশোরে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত উদ্যোগে এসব বাগান করলেও বেশিরভাগই উৎসাহী হচ্ছেন সবুজ ছড়িয়ে দিতে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে। সবুজ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলো গাছ দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে অফিস সাজাতেও এগিয়ে আসছে।
ঢাকা শহরে ছাদবাগান কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা ব্যক্তিদের অন্যতম একজন আহসান রনি। সবুজ বাঁচাতে তার গড়ে তোলা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘গ্রীন সেভারসে’র সদস্যরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
আহসান রনি জানান, ২০১১ সাল থেকে ছাদবাগান কার্যক্রম শুরু করে গ্রীন সেভারস। এরপর ২০১৪ সাল নাগাদ প্রায় তিন হাজার বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় বাগান গড়ে দিয়েছে সংগঠনটি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সবুজায়নে কাজ করেছে তারা। এছাড়া প্রতি মাসে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্কুলে স্থাপন করেছে ‘অক্সিজেন ব্যাংক’। এখানে স্কুলের শিশুদের জমানো টিফিনের পয়সায় তাদের স্কুলে হয় ‘বাগান’।
‘ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ ক্লিনিক’ গ্রীন সেভারসের একটি অনন্য উদ্যোগ। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে গাছ কিনতে ও লাগাতে উৎসাহিত করা হয়। শহরবাসীর দোরগোড়ায় গাছ লাগানোর উপকরণ, মাটি, সার ও গাছের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেয়া হয়। ‘প্ল্যান্টস ডক্টর’ নামে সংগঠনটির একটি মোবাইল অ্যাপ রয়েছে। এই অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে গাছপালাবিষয়ক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বিস্তারিত জানতে ফেসবুক পেজ : Green Savers.
ঠিকানা : গ্রীন সেভারস, ই-১৬, শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও, বেতার ভবনের কাছে, পরিবেশ অধিদফতরের সামনে। ফোন : ০১৫৫৮-১৬৬২৬৪।

নগরে সবুজ ছড়িয়ে দিতে কাজ করা আরেকটি সংগঠন ‘সবুজ ঢাকা’। এর প্রতিষ্ঠাতা রূপাই ইসলাম। ২০১২ সাল থেকে সংগঠনটি কাজ শুরু করে। তবে ব্যাপক কাজ শুরু করে ২০১৪ সাল থেকে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মিলে ছাদবাগান তৈরিসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণে কাজ করেছে সংগঠনটি। কিছু স্কুলে গড়ে তুলেছে ফলের বাগান। বড় কিছু কাজে নামার প্রস্তুতি হিসেবে সংগঠনটি সম্প্রতি নিজেদের কার্যক্রম একটু ধীরলয়ে চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন রূপাই ইসলাম। এর মধ্যে সরকারের সঙ্গে মিলে বেশকিছু কাজ করছে তারা। তবে কেউ ছাদবাগান করতে চাইলে এখনো পাশে পাবে ‘সবুজ ঢাকা’কে।
রূপাই ইসলাম বলেন, আমারা শুরুতে বিনামূল্যেই এ ধরনের কাজ করে দিতাম। আমাদের একটা পরিকল্পনা ছিল ‘আইডিয়া গার্ডেনিং’ নামে। কেউ যদি তার বাড়ির ছাদটাকে সবুজ করতে চায়, তাহলে কীভাবে করবে, কী ধরনের গাছ হলে ভালো হয়, ছাদের ওপর গল্পের জন্য বসার জায়গা বা ঘাসের ওপর শোয়ার জায়গা তৈরি এ রকম পরিকল্পনা চাইলেও আমরা করে দেব। যে কেউ আমাদের ‘সবুজ ঢাকা’ ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করতে পারেন।
ঠিকানা : সবুজ ঢাকা, বাড়ি : ২, রোড : ১৮, ব্লক : সি, মিরপুর-১০, ঢাকা-১২১৬। ফোন : ০১৮৩০-০৬৯৪৯৪।
সবুজায়ন নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কাজ করছে ‘এনি’স গার্ডেন’। বাড়ির বারান্দা বা ছাদে বাগান তৈরি করা, অফিসে গাছ ভাড়া দেয়া ও গাছের পরিচর্যা করা, কারখানায় বাগান করে দেয়া, ফলের বাগান করে দেয়া এবং বাগানে ফোয়ারা স্থাপন করে দেয়ার মতো কাজ করে সংগঠনটি। এ প্রসঙ্গে এনি’স গার্ডেনের স্বত্বাধিকারী শাহানাজ চৌধুরী এনি বলেন, ‘ঢাকায় বাড়ি করার সময় আগের গাছগুলো কাটা পড়ে। ওই অক্সিজেন থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। ভবনের ছাদে ও বারান্দায় বাগান করে আমরা সেই অক্সিজেন পেতে পারি। একই সঙ্গে পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করতে পারি।’
ইনডোর প্লান্ট-সার্ভিস সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী গাছগুলোকে সাজিয়ে দেই। এরপর আমাদের কর্মীরা সপ্তাহে দু’দিন যায়, গাছের যতœ নেয়। গাছগুলো পরিষ্কার করে। কোনো গাছ নষ্ট হয়ে গেলে মাস শেষে বদলে দেওয়া হয়। মাস শেষে আমরা একটা সার্ভিস চার্জ নিই। আলোচনা সাপেক্ষে ঢাকা শহরসহ দেশের যেকোনো শহরে গাছ সরবরাহ করা হয় বলেও জানান তিনি।
বিস্তারিত জানতে ফেসবুক পেজ : anys garden। ফোন : ০১৮৪১-৪৬৬৯৯৯।
ঢাকায় সবুজায়নে কাজ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান ‘স্মার্ট গার্ডেন’। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আলিমুজ্জামান মিলটন জানান, তারা মূলত আধুনিক কৃষি নিয়ে কাজ করেন। পাশাপাশি নগর-বাগান নিয়েও কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরকে আধুনিকায়ন করার জন্য এখন মেট্রোরেল ও ফ্লাইওভারের মতো বড় উন্নয়নকাজ হচ্ছে। এসব করতে গিয়ে অনেক গাছ কাটা পড়ছে। এতে পরিবেশের যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে, এটা পুষিয়ে নিতে কীভাবে সবুজায়ন করা যায়, এগুলো আধুনিকভাবে ডিজাইন করে এবং মেইনটেন্যান্সে কী হবে এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করি। বেশকিছু কাজ চূড়ান্ত পরিকল্পনার পর্যায়ে আছে। শিগগিরই এসব কাজ শুরু হবে। এর মধ্যে কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি এবং ধানমন্ডিতে একটি আধুনিক ছাদবাগানের কাজ হবে।’
গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ‘স্মার্ট গার্ডেন’ কাজ করে জানিয়ে মিলটন বলেন, ‘আমরা বাগান করার পরিকল্পনা করতে সহায়তা করি। তাছাড়া গার্ডেনিং ইকুইপমেন্ট হোম ডেলিভারি করি। আমাদের ইতোমধ্যে তিন শতাধিক গ্রাহক আছে। আমরা সরাসরি এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য পৌঁছে দেই।
বিস্তারিত জানতে ফেসবুক পেজ : ঝসধৎঃ Smart Garden।
ঠিকানা : স্মার্ট গার্ডেন ৭/৫, সলিমুল্লাহ রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ফোন : ০১৭১৭-৯১২৫৮২।

NO COMMENTS

Leave a Reply