Home মূল কাগজ নগরোদ্যান নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা

কারিকা প্রতিবেদক
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো। রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেলা হচ্ছে এসব স্থাপনা। সম্প্রতি পুরান ঢাকার জাহাজ বাড়ি ভেঙে ফেলায় এই শঙ্কা আরও বেড়েছে। উচ্চ আদালত এসব ভবনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে সেটা রক্ষণাবেক্ষণের নির্দেশ দেওয়ার পরও সেই আদেশ মানছে না দায়িত্বশীল কেউ।
রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না বলে অভিযোগ করেছে হেরিটেজ স্থাপনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। তাদের দাবি, অতিদ্রুত নিরাপত্তা না বাড়ালে প্রভাবশালীদের ‘আক্রমণে’ হারিয়ে যাবে পুরান ঢাকার সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা।
ঈদের আগের দিন রাতে পুরান ঢাকার চক সার্কুলার রোডের ‘জাহাজ বাড়ি’ ভেঙে ফেলা হয়। ভবনটি ভাঙার সময় আরবার স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তখন পুলিশ গিয়ে ভবনটি ভাঙার কাজ বন্ধ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত বাড়িটি রক্ষা করা যায়নি। পুলিশও এর সঙ্গে জড়িত কাউকে আটক করেনি।
এর আগে সূত্রাপুর থানা ভবনসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি হেরিটেজ বাড়ি ভাঙা শুরু হলে পুলিশের সহযোগিতায় তা বন্ধ করা হয়। কিন্তু জাহাজ বাড়ি রক্ষা করতে না পারায় সংশ্লিষ্টদের মনে শঙ্কা বেড়েছে।
২০০৯ সালের ২ ফ্রেরুয়ারী পুরান ঢাকার চারটি অঞ্চলকে ঢাকার ঐতিহ্য বা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে রাজউক। গেজেটে ৯৩টি স্থাপনা ও ১৩টি সড়ককে ঐতিহ্যবাহী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৭ সালে হেরিটেজের সংখ্যা ৭৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। ১৩টি সড়কও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
রাজউকের তালিকাকে ক্রুটিপূর্ণ দাবি করে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে কাজ করা আরবান স্টাডি গ্রুপ। ২০০৪ সালে নিজেদের উদ্যোগে ঢাকার প্রায় ২ হাজার ৭০০ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকা তৈরি করে সংগঠনটি। এর মধ্যে গ্রেড-১ ও ২-এ ২ হাজার ২০০ ভবন রয়েছে। এই তালিকা রাজউক, সিটি করপোরেশন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে জমা দিয়ে কোনও লাভ হয়নি। পরে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের দাবিতে ২০১২ সালে উচ্চ আদালতে রিট করে আরবান স্টাডি গ্রুপ।
রিটের রায়ে আদালত বলেন, কোন কোন ভবন ঐতিহ্যবাহী ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তার তালিকা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আরবান স্টাডি গ্রুপের খসড়া তালিকাভুক্ত ভবনে কোনো প্রকার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করা যাবে না। তালিকাভুক্ত এসব বাড়ি বা স্থাপনা নির্মাণের নকশা অনুমোদন না দিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত এসব স্থাপনা যথাযথ আছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য একটি উপদেষ্টা কমিটি করতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিকে তিন মাস পরপর কাজের অগ্রগতি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে হবে। ওই তালিকায় গ্রেড-১-এ জাহাজ বাড়িটিও অন্তর্ভুক্ত আছে।
খোদ রাজধানীতে জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সবসময় ঐতিহ্য এবং হেরিটেজ সংরক্ষণের প্রতি দরদী হওয়ার কথা বলে আসছে। তারপরও জাহাজ বাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী ভবন ভেঙে দেয়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করছে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণে সিরিয়াস না।
জাহাজ বাড়ি ভাঙা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, ঐতিহ্যবাহী ভবনগুলো নিয়ে এখন প্রভাবশালীরা অঘোষিত যুদ্ধই ঘোষণা করেছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর, রাজউক ও পুলিশ কেউ আদালতের আদেশ মানছে না। ভবনগুলো ভাঙার ক্ষেত্রে দস্যুদের মতো আচরণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘শঙ্কায় আছি যেভাবে ভবনগুলো ভাঙা হচ্ছে, তাতে ঐতিহ্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। আর রাজউক যে গেজেট করেছে, প্রত্নতত্ত্ব আইন অনুযায়ী সেটা তারা করতে পারে না।’
জানা গেছে, উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে নির্মিত এই ভবনটি ঢাকার প্রথম বাণিজ্যিক ভবন হিসেবে বিবেচিত হতো। ওই ভবনের বিভিন্ন দোকানের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভবনটি ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে ছিল। তারা নিয়মিত ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রতিনিধিকে ভাড়া দিয়ে আসছিলেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘জাহাজ বাড়ি’ ভবনটি তৈরি করা হয়েছে আনুমানিক ১৮৭০ সালে। ভবনের মালিক ১৯২০ সালে বদু হাজির নামে ওয়াকফ সম্পত্তি করে দিয়ে যান। বদু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় সন্তান ফেকু হাজি ভবনটির দায়িত্বে ছিলেন। ফেকু হাজির মৃত্যুর পর তার বড় ছেলে হাজি আবদুল হক ভাঙার আগ পর্যন্ত ভবনটি তত্ত্ববধায়ন করছিলেন।
তিনতলা ‘জাহাজ বাড়ি’র দোতলায় নকশা করা রেলিং, ছাদওয়ালা টানা বারান্দা ছিল। আর অবয়বজুড়ে ছিল নানা রকম কারুকাজসমৃদ্ধ। কোনাকৃতি আর্চের সারি, কারুকাজ করা কার্নিশ। কলামে ব্যবহার করা হয়েছে আয়নিক ও করিন্থিয়ান ক্যাপিটাল। ভবনের পশ্চিম প্রান্তে আর্চ ও কলামের সঙ্গেও নানা রকম অলংকরণের ব্যবহার দেখা যায়। সব মিলিয়ে এই ভবনটিতে যে ধরনের অলংকরণের ব্যবহার রয়েছে, তা একে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এই ধরনের অলংকরণ পুরান ঢাকায় আর কোনো ভবনে দেখা যায় না। সেদিক থেকে এর নান্দনিক গুরুত্বের জন্যই ভবনটি সংরক্ষণ করার প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

NO COMMENTS

Leave a Reply