Home সর্বশেষ নির্মাণ শ্রমিকের রোজনামচা

নির্মাণ শ্রমিকের রোজনামচা

0 177

১লা মে পালিত হলো আর্ন্তজাতিক শ্রমিক দিবস

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
আসিতেছে শুভদিন,দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ! হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান। আজ থেকে বহুকাল আগে কাজী নজরুল ইসলাম শ্রমজীবী মানুষের জয়গান গেয়ে গেছেন। বলে গেছেন সাম্যের কথা। এত বছর পরে এসেও, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে শ্রমজীবী মানুষের জয় গান কী আমরা গাইতে পারছি?। কবির দেখা সেই শুভদিন কী এসেছে আজো?
নিঃসন্দেহে বলা যায় সেই শুভ দিন আসেনি। শ্রমজীবী মানুষের জয়গান গাওয়ার মতো উদারতাও আমরা অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের হাতুড়ি, শাবল, গাঁইতি আজও গড়ে তুলছে সুরম্য অট্রালিকা, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা।
সময়ের ব্যাবধানে শ্রমিকের মজুরি হয়তো বেড়েছে । কিন্তু দিন বদলায়নি একটুও।
ঘড়িতে সময় তখন সকাল সাড়ে সাতটা। পান্থপথ মোড়ের ব্যস্ত সড়ক। পাশের গ্রীনরোড পুলিশ বক্সের পেছনে জনাবিশেক লোক জটলা করে আছে। এরা সবাই শ্রমজীবী মানুষ। সকাল সকাল কাজের খোঁজে ভীড় জমিয়েছেন শ্রমবিক্রির হাটে। কথা বলে জানা গেল এরা প্রায় সবাই নির্মাণ কাজের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ নির্মাণ শ্রমিক। দৈনিক ছয়শো থেকে চারশো টাকা মজুরীতে রাজমিন্ত্রী ও যোগালীর কাজ করে থাকেন। এই প্রতিবেদককে দেখে কাজ পাবার আশায় ছুটে এলেন অনেকেই। জানতে চাইলেন লোক লাগবে কি না।
যখন জানালাম কাজ দিতে নয় আপনাদের সুখ দুঃখের কথা জানতে এসেছি। তখন হড়বর করে মনের অনেক কথাই বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। কিশোরগঞ্জের ফজলুুল হক জানালেন তার বাসা গ্রীনরোডের আলামিন গলিতে। সেখানে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ছেলেরা দোকান কর্মচারী হিসেবে কাজ করে। রাজমিন্ত্রীর যোগালী হিসেবে কাজ করেন ফজলুল হক। কাজের ধরন বুঝে দৈনিক ৬০০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান।
আর যেদিন কাজ পান না সেদিন? এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বললেন সেদিন ছেলেদের রোজগারে বাজার সদাই করতে হয়। মাঝে মাঝে ধার কর্জ করে চলি।
ফজলুল হকের সাথে কথা বলার সময় পাশে এসে দাঁড়ালেন স্বপন। স্বপন জানালেন এই কয়দিন ওয়াসার একটি প্রজেক্টে শ্রম দিয়েছেন। গতকাল কাজ শেষ হওয়ায় আজ আবার নতুন কাজের খোঁজে এসেছেন শ্রম বিক্রির হাটে।
ফজলুুল হক, স্বপনের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একজন এলেন শ্রমিকের খোঁজে। সবাই হুড়মুড়িয়ে ছুটলো সেদিকে। শ্রমিকের খোঁজে আসা লোকটি কাঙ্খিত শ্রমিক পেয়ে গেছেন। বাকিদের আবারো দর কষাকষি শেষে কাজে ডাক পাওয়ার অনিশ্চিত অপেক্ষা।
কিছুক্ষণ পরে আরেকজন এলেন শ্রমিকের খোঁজে। তাকে ঘিরে কাজ খোঁজা মানুষের জটলা তৈরি হলো নতুন করে। লোকটি কিছুক্ষণ দরাদরি করে তিনজন শ্রমিক নিয়ে চলে গেলেন।
তরাব আলী খানিকটা হতাশ হয়ে জানালেন আজকে ‘মার্কেটে’ (শ্রমের হাটে) লেবার বেশি তাই মজুরি কম।
অন্যদের মতো এস এ পরিবহনে রাতের পালায় কাজ করা বরিশালের মেহেদীও এসেছেন শ্রমের হাটে কাজের সন্ধানে। এস এ পরিবহনে কাজ করে আবার দিনে কাজ করতে আসা কেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে মেহেদী জানালেন ‘রাতের পালায় কাজ করে সংসার চলে না। তাই এই শ্রমের হাটে কাজ খুঁজতে এসেছেন। যদি কোন কাজ পাওয়া যায় তবে সংসারের অভাব ঘুচবে খানিকটা। ক’দিন আগেই মহাসমারোহে পালিত হলো মহান মে দিবস। শ্রমিকের আতœত্যাগের দিন।
লাল জমিনের উপর কাস্তে হাতুড়ি খচিত পতাকা আর শ্রমিকের মুষ্টিবদ্ধ হাতের মিছিলে ছেঁয়ে গেল পুরো শহর।
মে দিবস নিয়ে শ্রমের হাটে আশা এই মানুষগুলোর ভাবনা কী? শ্রমিকদের জটলার মধ্যে এক প্রকার ছুঁড়ে দেই প্রশ্নটা।
প্রশ্নের উত্তরে যা জানা গেল সেটা বেশ হতাশাজনক। এখানে উপস্থিত কেউ-ই মে দিবস সম্পর্কে জানেন না।
মে দিবসে ছুটি প্রাপ্তি কিংবা নিজেদের অধিকার আদায়ে একত্রে জমায়েত হওয়া সেটাতো তাহলে কল্পনাতীত ব্যাপার। অন্য সব শ্রম খাতের চেয়ে নির্মাণ খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা অসংগঠিত এবং অধিকার বঞ্চিত। নির্মাণ শ্রমিকদের অধিকার আদায় ও স্বার্থ সংরক্ষণে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলসের) উদ্যোগে ‘নির্মাণ শ্রমিক ঐক্যজোট গঠন’ করা হয়। যদিও এখানকার শ্রম হাটে আসা নির্মাণ শ্রমিকরা সেই খবরটি জানেন না।
রহমত আলী অনেকটা আক্ষেপের সুরে জানালেন কাজ করলেই তাঁদের দুটো ডাল ভাত খাওয়ার পয়সা জোটে। সেখানে মে দিবসে ছুটি কাটানো বা মিটিং মিছিল করার সুযোগ কোথায়?
অন্য সব দিনের মতো মে দিবসেও কাজের খোঁজে তাঁদের আসতে হয়েছে পান্থপথের এই শ্রমের হাটে।
এখানে কাজের খোঁজে আসা শ্রমিকেরা জানালেন বহুতল ভবনে কাজ করার সময় কোন নিরপত্তা ব্যবস্থা তারা গ্রহণ করেন না। নিয়োগকারী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের কখনো হেলমেট সেফটি বেল্টের মতো নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহুতল ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে কাজ করতে হয় তাঁদের।
ঠিকা শ্রমিক হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে দুঘর্টনায় আহত নিহত হলেও তেমন কোন ক্ষতিপূরন পান না তারা। কর্মক্ষেত্রে দুঘর্টনার শিকার হয়ে আহত নিহত হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়োগকারী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দয়া দাক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করতে হয়।
কাজ শেষে প্রকল্প এলাকাতে গাদাগাদি করে অস্বাস্থকর পরিবেশে বিশ্রাম নিতে হয়।
প্রতিদিন কাজ যোগাড় করাটাই যেখানে চ্যালেঞ্জ সেখানে নিয়োগকারী ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ক্ষতিপূরণ বা বিমা সুবিধা চাওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না নির্মাণ শ্রমিকরা।
প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে পড়ে গত ২৮ মার্চ আশরাফুল ইসলাম নামে এক নির্মাণ শ্রমিক নিহত হয়েছেন। প্রত্যাক্ষদর্শীরা জানান কোনরকম নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ছাড়াই রড মিন্ত্রী আশরাফুল ইসলাম নির্মাণাধীন ভবনটির ১৮ তলায় কাজ করছিলেন। আশরাফুল ইসলামের মতো এরকম হাজারো নির্মাণ শ্রমিককে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁিক নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলসের) জরিপ বলছে বিগত বছরে ১৬১ জন নির্মাণ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুঘর্টনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। আহত হয়েছেন ১০৭ জন নির্মাণ শ্রমিক।
প্রতিদিন কাজ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা, পাশাপাশি ঝুকিঁপূর্ণ কাজে আছে প্রাণহানীর শস্কা।
অনিশ্চয়তা আর শস্কা সঙ্গী করে পান্থপথ মোড়ের তেতুলতলায় কাজের আশায় বসে আছেন জনা দশেক শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ। মনে উৎকন্ঠা।

NO COMMENTS

Leave a Reply