Home মূল কাগজ ব্যক্তিত্ব নির্মানশিল্পী: ফনডাজিওয়ান রেনজো পিয়ানো

নির্মানশিল্পী: ফনডাজিওয়ান রেনজো পিয়ানো

0 1676

বিংশ শতাব্দীতে এসে যেসব স্থপতি স্থাপত্যশিল্পের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন, তেমন ১৫ জন প্রভাব বিস্তারকারী স্থপতি নির্বাচন করেছে ‘কলারকোট’। নির্বাচিত সেই স্থপতিদের নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের ত্রয়োদশ কিস্তি ছাপা হলো এ-সংখ্যায়

বিশ্ববিখ্যাত নির্মাণশিল্পী ফনডাজিওয়ান রেনজো পিয়ানো একাধারে একজন স্থাপত্যবিদ, শিল্পী ও স্থাপত্যকলার শিক্ষাগুরু এবং প্রকল্প পরিকল্পনাকারী। যদিও অনেক পাঠক নামের শেষে পিয়ানো থাকায় প্রথম দর্শনে হয়তো একজন পিয়ানো-বাদকের পরিচিতিমূলক আখ্যান তুলে ধরছি বলে ভ্রমে পড়ে যেতে পারেন।

যা-ই হোক, ১৯৩৭ সালে ইতালির জেনোয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই গুণী শিল্পী ফোরেন্স এবং মিলানে শিালাভ করেন এবং সেখানে তিনি তৎকালীন বিখ্যাত স্থাপত্যশিল্পী ফ্রাঙ্কো আলবিনির মতো শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান। আলবিনির সান্নিধ্যে থাকার সময় তিনি ১৯৬০ সালে প্রথম ছাত্র আন্দোলনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

নির্মাতা-পরিবারে জন্মগ্রহণের সুযোগে রেনজো পিয়ানো প্রায়ই তার পিতা কার্লোসের নির্মাণ প্রকল্প-এলাকা পরিদর্শনে যেতেন। ফলশ্রুতিতে তিনি স্থাপত্যশিল্পে একাধারে ব্যবহারিক ও পুঁথিগত অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি মিলানের পলিটেকনিকো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সহোদর ভাই ইরমান্নোর সঙ্গে যৌথভাবে তার পরীক্ষামূলক বিভিন্ন কাজের জন্য একাধিকবার গ্রেট ব্রিটেন ও আমেরিকা সফর করেন।

দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭১ সালে তিনি যৌথভাবে রিচার্ড রজারের সঙ্গে লন্ডনে পিয়ানো ও রজার্স নামে নির্মাণশিল্পের জন্য অফিস স্থাপন করেন। এর পরপর তিনি পমপিডিও সেন্টার নির্মাণ-প্রতিযোগিতার জন্য বিজয়ী হন এবং পরবর্তী সময়ে প্যারিসে পাড়ি জমান। এর মধ্যে তিনি ৭০ দশকের প্রথম থেকে ৯০ পর্যন্ত এটলিয়ার পিয়ানো এবং রাইস নামের একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন এবং যৌথভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত।

১৯৮১ সালে সারা দুনিয়ায় সাড়া জাগানো রেনজো পিয়ানো বিল্ডিং ওয়ার্কশপ (জচইড) প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে এর কর্মচারীর সংখ্যা ১৫০ জন। এর অফিস রয়েছে প্যারিস, জেনোয়া ও নিউইয়র্কে।

জচইড পৃথিবীব্যাপী দুর্লভ ও মূল্যবান সব স্থাপত্য-নকশা প্রণয়ন করে পৃথিবীবাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। জচইড-এর উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্মের মধ্যে মেনিল কালেকশন ইন হাউসটন, দ্য টার্মিনাল ফর কানসাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ইন ওসাকা, দ্য ফাউন্ডেশন বেইলার মিউজিয়াম ইন ব্যাসেল, দ্য জিন ম্যারি জিবাউ কালচারাল সেন্টার ইন ক্যালেডোনিয়া, পোর্টসড্যামার প্লাজ ইন বার্লিন, দ্য রিডেভেলপমেন্ট অব দ্য জেনোয়া হারবার, দ্য অডিটোরিয়াম ‘পারকো ডিলা মিউজিকা’ ইন রোম, দ্য নাশের স্কাল্পচার সেন্টার ইন ডালাস, দ্য এক্সটেনশন অব দ্য হাই মিউজিয়াম অব আর্ট ইন আটলান্টা, মর্গান লাইব্রেরি অব নিউইয়র্ক, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস হেডকোয়ার্টার্স, দ্য ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্স ইন সানফ্রান্সিসকো, দ্য মডার্ন উইং অব আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো, লসঅ্যাঞ্জেলেস কান্ট্রি মিউজিয়াম অব আর্ট এবং দ্য ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়াম অব বোস্টন বিশেষভাবে তাদের খ্যাতির আলোকে উজ্জ্বল করেছে।

১৯৮৯ সালে স্থাপত্যশৈলীতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রেনজো পিয়ানো রিবা রয়্যাল গোল্ড মেডেল পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে প্রিমিয়াম ইমপেরিয়াল ইন টোকিও, ১৯৯৮ সালে প্রিজকার আর্কিটেকচার পুরস্কার এবং ২০০৮ সালে এআইএ গোল্ড মেডেল অব দ্য আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস লাভ করেন।

বর্তমানে পিয়ানো পৃথিবীর যেসব বিখ্যাত স্থাপনার সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কাজ করছেন সেগুলো হলোÑ ক্যামব্রিজের ফগ মিউজিয়াম (ম্যাসাচুসেটস), নিউইয়র্কে অবস্থিত কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস, দ্য লন্ডন ব্রিজ টাওয়ার, তুরিনের সান পাওলো টাওয়ার ইত্যাদি।

ব্যক্তিগত জীবনে চার সন্তানের জনক এই বিখ্যাত নির্মাণশিল্পী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তার নির্মাণ-দর্শনে ইন্দ্রজালের মতো মুগ্ধ করে রেখেছেন পুরো পৃথিবীর মানুষকে। নিজ কর্মের দায়বদ্ধতা থেকে বয়োবৃদ্ধ এই মানুষটি এখনও নতুন প্রজন্মের স্থাপত্যের শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিবছর শিক্ষাদান করে চলেছেন নিরলসভাবে।

রেনজো পিয়ানোর ৫ কীর্তি

দ্য স্যার্ড স্কাইস্কিপার
২০১২ সালে সম্পন্ন লন্ডন ব্রিজ সংলগ্ন দ্য স্যার্ড স্কাইকিপার হলো ইউরোপের উচ্চতম ভবন। ২০১৩-এর ১ ফেব্রুয়ারি এটা সাধারণের জন্য উন্মূক্ত করে দেয়া হয়। এই ভবন শুধু ইতালীয় স্থাপত্যের প্রতীক নয়, রেনজো পিয়ানোর বিশেষ সৃষ্টির প্রতীকও।

সেন্ট্রাল জর্জ পামপিডু
প্যারিসে অবস্থিত সেন্ট্রাল জর্জ পামপিডু যৌথভাবে নকশা করেন পিয়ানো এবং রিজার্চ রগার। ১৯৭৭ সালে সম্পন্ন হওয়া এ স্থাপনায় রয়েছে পাঠাগার, গ্যালারি এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনার জন্য একাধিক হলরুম।

ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অব সাইন্স
সানফ্রান্সিসকোতে অবস্থিত ‘দ্য ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকাডেমি অব সাইন্স’ প্রকৃতির ইতিহাস নিয়ে দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় এক যাদুঘর। এই ভবন শক্তি-স্বয়ম্বর এবং এর সবুজ ছাদ প্রাকৃতিক নানা উদ্ভিদের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত।

ত্যাজিবেও কালচারাল সেন্টার
স্প্যাসিফিক দ্বীপের রাজধানী নোমিওতে অবস্থিত দ্য জেন-ম্যারি ত্যাজিবেও ক্যালচারাল সেন্টার হলো পিয়ানো-সৃষ্ট আরেকটি অসাধারণ ক্ষুধিত নিশ্চল সাংস্কৃতিক আকর্ষণ। এতে রয়েছে প্রদর্শনী কেন্দ্র, পাঠাগার এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র।

ফনডেসান বেয়েলা
সুইজারল্যান্ডের বাসেলের কাছে অবস্থিত ফনডেসান বেয়েলা জনগণের জন্য উন্মূক্ত এক গ্যালারি। যে গ্যালারির শিল্পকর্ম সংগ্রহ হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে, এর সংগ্রাহক আর্নেস্ট বেয়েলা ও হিলডা কানজ। এ স্থাপনা সম্পন্ন হয় ১৯৯৭ সালে।

এম. এম. আলী

NO COMMENTS

Leave a Reply