Home সর্বশেষ পানাম নগর: জনপদ জুড়ে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য

পানাম নগর: জনপদ জুড়ে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য

কারিকা ডেস্ক :
প্রাচীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয় অবস্থিত পানাম নগর। এখানেই ছিল মসলিনের মূল বাণিজ্যকেন্দ্র। এখনো পানাম নগরে দেখা যায় অপূর্ব ও নিপুণ কারুকাজখচিত প্রাচীন সব ইমারত। সরু রাস্তার দুই পাশে অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুর ঘর, গোসলখানা, কূপ, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাঁকশাল, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ, প্রশস্ত দেয়াল, প্রমোদালয় জানান দেয় এ নগরের প্রাচীন সমৃদ্ধির কথা।
আজ থেকে প্রায় চার শ বছর আগে পানাম নগর স্থাপন শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ধাপে ধাপে মোগল নির্মাণশৈলীর সঙ্গে ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলীর সংমিশ্রণে নির্মিত হয় এ নগর।
কালে কালে পানাম নগর হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক রূপ, সৌন্দর্য ও জৌলুস। এই নগরের অনেক প্রাচীন স্থাপনাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। প্রায় ১০ বছর আগে এ নগর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। নগরের পুরনো ভবনগুলোর ইট, সুরকি ধসে পড়ছে। ভবনের দখল নিয়েছে শেওলা ও আগাছা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় ভুতুড়ে বাড়ি।
পানাম নগর একসময় সন্ধ্যা নামার পর নাচ, গান, সুর ও সাকির আয়োজনে মেতে উঠত; নৃত্যের তালে তালে ঝুমুরের শব্দ ও তানপুরার সুরে মুখর হয়ে উঠত সোনারগাঁর বাতাস। আজ সেই নগরে সন্ধ্যা নামলে নেমে আসে গা-ছমছমে নীরবতা। নামিদামি বণিক ও পর্যটকদের ডিঙি নৌকা ভেড়ে না নগরের ময়ূরপঙ্খি ঘাটে। এখন যেন পানাম নগরের দেয়ালে কান পাতলে শোনা যায় নগরের হাহাকার আর আর্তনাদ।
তবু প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ভিড় জমায় পানাম নগরে। দেশ-বিদেশের প্রচুর পর্যটক আসে এখানে। যারা সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে বেড়াতে আসে, তারাও ঘুরে যায় বিবর্ণ এই নগরে।
পানাম নগর ঘুরে দেখা যায় ৪০০ বছরের পুরনো মঠবাড়ি, যার পশ্চিমে রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির বাণিজ্যকুঠি (নীলকুঠি) পোদ্দারবাড়ি, কাশীনাথের বাড়িসহ নানা প্রাচীন ভবন। তবে সেগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শের শাহের আমলে নির্মিত সোনারগাঁ থেকে সিন্ধু পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মাইল দীর্ঘ ঐতিহাসিক গ্র্যান্ডট্যাংক রোডের নির্দশন এখনো বর্তমান। পাঁচটি প্রশস্ত ছয় মিটার দীর্ঘ সড়কের দুই পাশে একতলা, দোতলা ও তিনতলা প্রায় ৫২টি ভবন রয়েছে পানাম নগরে, যার বেশির ভাগই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ১০টি ভবন প্রায় বিলুপ্তির পথে। সব ভবনের বেশির ভাগ কক্ষের ইট খসে পড়েছে, কারুকাজগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকা অবকাঠামো দেখে সহজেই অনুভব করা যায়, পানাম নগর কত সুন্দর ছিল! সরকার পানাম নগরকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নিয়ে নিয়েছে।
পানাম নগরে প্রবেশের আগে দক্ষিণ দিকে পঙ্খিরাজ খালের ওপর ঐতিহ্যবাহী পঙ্খিরাজ সেতু। এখন এটি ব্যবহৃত হচ্ছে সোনারগাঁর একাংশের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। এই সেতুর একাংশে বিশাল গর্ত। ভেঙে যাচ্ছে সেতুর রেলিংও। পানামের প্রবেশপথে পঙ্খিরাজ খালের উপর থাকা প্রাচীন সেতুটি নিশ্চিহ্ন করে বেশ কয়েক বছর আগেই তৈরি করা হয়েছে বাস চলাচলের রাস্তা। ঈশা খাঁর নাচঘর হিসেবে কথিত বাড়ি নীহারিকার একাংশ ধ্বংস করে তৈরি হয়েছে একটি নতুন রাস্তা।
একইভাবে অস্তিত্ব হুমকির মুখে এই নগরের প্রাচীন বাড়িগুলোও। তবু প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকে আসে প্রাচীন এ নগর দেখতে।তারা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করে বলেন, অচিরেই পানাম নগর সংস্কার করা না হলে এই নগরকে কোনোভাবেই রক্ষা করা যাবে না।
পানাম নগরে মূলত উচ্চ মাধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যবসায়ী ও জমিদাররা বসবাস করতেন। এর পাশাপাশি রাজাদের আমির-ওমরাহদের জন্য পানাম নগর ও এর আশপাশের গ্রামগুলোতে গড়ে উঠেছিল নিপুণ কারুকাজখচিত পাকা ইমারত। পানাম ও এর আশপাশ ঘিরে পঞ্চদশ শতক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ জনজীবন ছিল।
ইতিহাসবিদ জেমস টেলরের মতে, আড়ংয়ের তাঁতখানা সোনারগাঁর পানাম নামক স্থানে ছিল এবং মসলিন শিল্প কেনাবেচার এক প্রসিদ্ধ বাজার ছিল পানাম নগর।

NO COMMENTS

Leave a Reply