Home ফিচার পিলারে স্প্যানে গড়ে উঠছে স্বপ্নের মেট্রোরেল

পিলারে স্প্যানে গড়ে উঠছে স্বপ্নের মেট্রোরেল

0 125

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
বিমান বন্দর সড়কের বনানী ধরে পূরবী সিনেমার মোড় কিংবা মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কে গেলে দেখা মিলবে পিলারে স্প্যানে গড়ে উঠছে রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল। উত্তরার দিয়াবাড়ি থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রথম অংশের কাজ। হাজার হাজার শ্রমিক আর প্রকৌশলীদের দিন রাতের পরিশ্রমে যানজটের শহরে বাস্তব রুপ পাচ্ছে আশা জাগানিয়া মেট্রোরেল। মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রথম অংশে কংক্রীটের বেড়ার আড়ালে উঁকি দিচ্ছে পিলার। কোথাও কোথাও দৃশ্যমান হয়েছে স্প্যান। বড় বড় মেশিনের সার্হায্যে চলছে পাইলিং। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত কাজের সার্বিক অগ্রগ্রতি ৩৩ ভাগ। অন্যদিকে মতিঝিল থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত কাজের সার্বিক অগ্রগতি ২০ ভাগের মতো।
রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি জাপানে চলছে মেট্রোরেলের রেলকোচ তৈরির কাজ। জাপানের কাওয়াসাকি-মিতসুবিশি কনসোর্টিয়াম ইতিমধ্যে মেট্রোরেলের কোচ প্রস্তুত করেছে। এখন চলছে পরিদর্শন ও পর্যালোচনা কাজ। মেট্রোরেলের ট্র্যাক নির্মাণ শেষ হওয়ার পর জাপানে তৈরি কোচগুলো ট্র্যাকে বসিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হবে। প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চলতে শুরু করবে স্বপ্নের মেট্রোরেল। বাংলাদেশের ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে লাল-সবুজের আদলে নির্মিত হচ্ছে মেট্রোরেলের কোচ।
রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত হবে রাজধানীবাসীর স্বপ্নের মেট্রোরেল। পুরো পথে ৩৭৭ টি পিলারের উপর ৩৭৬ টি স্প্যানে চলবে মেট্রোরেল।
সম্পূর্ণ এলিভেটেড এবং বিদ্যুৎ চালিত এমআরটি-৬ উভয় পাশের চলাচলে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে। উত্তরা-মতিঝিল রুটে মোট ১৬টি স্টেশনের প্রতিটিতে ৪৫ সেকেন্ডের জন্য থামবে রেল।
উত্তরা নর্থ স্টেশন থেকে শুরু করে উত্তরা সেন্টার, উত্তরা দক্ষিণ, পল­বী, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজিপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সচিবালয় ও মতিঝিল স্টেশনগুলোতে উঠানামা করতে পারবেন যাত্রীরা। ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র ৩৮ মিনিট। আন্তর্জাতিক মানের ২৪ সেট মেট্রোরেল ট্রেন নিয়ে শুরু হবে এমআরটি লাইন-৬ এর যাত্রা। প্রতি সেটে প্রাথমিকভাবে ছয়টি করে কোচ থাকবে। পরে আরো দুইটি কোচ যোগ করে প্রতিটি ট্রেনে কোচের সংখ্যা ৮টিতে উন্নীত করা হবে। মেট্রোরেলের সুষ্ঠু পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে থাকবে অত্যাধুনিক অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টার। যাত্রীদের চলাচল ও ব্যবহারের সুবিধায় মেট্রোরেলের স্টেশনগুলো হবে এলিভেটেড।
দোতলায় থাকবে টিকিট কাউন্টার ও অন্যান্য ব্যবস্থা। ট্রেনে চড়ার প্ল্যাটফরম থাকবে তিনতলায়। প্রত্যেকটি স্টেশনে লিফট, চলন্ত সিঁড়ি, সার্বক্ষণিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ, প্রবেশপথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিকিট সংগ্রহের মেশিনসহ আন্তর্জাতিক মানের সব ধরনের ব্যবস্থা থাকবে মেট্রোরেলের স্টেশনে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা বেষ্টনী বা ‘প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোর’ স্থাপন করা হবে। নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, প্রতিবন্ধীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ও আরামদায়ক পরিবেশে মেট্রোরেলে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। পরিবেশবান্ধব মেট্রোরেলের কোচগুলো হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, থাকবে সুবিন্যস্ত আসনব্যবস্থা, যাত্রা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সংবলিত ডিসপ্লে প্যানেলসহ থাকবে নানা ব্যবস্থা। কোচের ভেতরের তাপমাত্রা হবে ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী যাত্রীদের জন্য প্রতিটি ট্রেনের কোচগুলোতে থাকবে নির্ধারিত স্থান। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে থাকবে নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও। সড়কের বিভাজক বরাবর মাটি থেকে প্রায় ১৩ মিটার উপর দিয়ে নির্মিত এলিভেটেড মেট্রোরেলের কম্পন নিয়ন্ত্রণে থাকবে ফ্লোটিং স্ল্যাব ট্র্যাক ও বিরামহীন ওয়েল্ডেড রেল। দ্রুতগতিতে চলা ট্রেনের শব্দ নিয়ন্ত্রণের জন্য স্থাপন করা হবে শব্দ নিরোধক দেয়াল।
এমন সব ব্যবস্থার কারণে মেট্রোরেলের রুটে অবস্থিত ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য সব ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ। দিনের ব্যস্ততম সময়ে প্রতি সাড়ে চার মিনিট পরপর প্রতিটি স্টেশনের উভয় দিকে মেট্রোরেল থামবে। এমআরটি-৬ চালু হলে ২০২১ সালে প্রতিদিন প্রায় ৫ লাখ যাত্রী মেট্রোরেলে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন। উত্তরা থেকে মতিঝিল রুটে ২০.১ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশের দূরত্ব ১১.৭৩ কিলোমিটার আর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত অংশের দূরত্ব হবে ৮.৩৭ কিলোমিটার। মেট্রোরেলের ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৩৯০ কোটি টাকা আর বাকি ১৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকার যোগান দেবে উন্নয়ন সংস্থা জাইকা।
চলতি বছরের শেষ নাগাদ উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ডিএমটিসিএল সূত্রে জানা গেছে, মেট্রোরেলের কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুতগতিতে মেট্রোরেলের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে জাপান সরকারের দাতা সংস্থা জাইকা জানিয়েছে ২০২২ সাল নাগাদ মেট্রোরেলের পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
জাইকার আবাসিক প্রতিনিধি হিতোশি হিরাতাসহ তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ফ্রেরুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করে এই তথ্য জানান।


দ্বিতীয় অংশের কাজ শুরু হওয়ায় সংকুচিত হচ্ছে ঢাকার পথ
আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের দ্বিতীয় অংশের কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মতিঝিল থেকে বিমান বন্দর, ভিআইপি সড়ক নামে পরিচিত এ সড়কের ফার্মগেট, কাওরান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগের অনেক অংশে সড়ক বিভাজক তুলে কংক্রীটের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে প্রকল্প এলাকা। প্রাথমিক খোঁড়াখুঁড়িসহ এখন চলছে ইউটিলিটি লাইন সরানোর কাজ। যার ফলে সড়কের দৈর্ঘ্য নেমে এসেছে অর্ধেকে। যানজটের সাথে বেড়েছে দুর্ভোগও। ইতিমধ্যে কয়েকটি রুটের প্রায় শতাধিক বাসের গতিপথ বদলে গেছে। গতিপথ বদলে দেওয়ায় গাবতলী থেকে মতিঝিল বা সদরঘাটমুখী বাস ফার্মগেটের পরিবর্তে সাইন্সল্যাবরেটরী হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রামপুরা, মালিবাগমুখী যানবাহন ফার্মগেটের পরিবর্তে বিজয় সরণি ও সাতরাস্তা হয়ে যাচ্ছে। ফলে এসব যানবাহনে করে ফার্মগেট ও কাওরান বাজারমুখী যাত্রীরা বিপাকে পড়ছেন। গাবতলী- সদরঘাট রুটে চলাচলকারী ৮ নাম্বার বাসের চালক হাবিব জানান, ফার্মগেট, কাওরানবাজারগামী যাত্রীদের অন্য জায়গায় নামিয়ে দিলে যাত্রীরা বিরক্ত হচ্ছেন। মাঝে মাঝে চালক ও সহকারির সাথে বচসার ঘটনাও ঘটছে। আগের থেকে যাত্রীও কমে গেছে বলে জানালেন তিনি। সাভার-মতিঝিল রুটের স্বজন পরিবহনের চালক মকবুল জানালেন রুট পরিবর্তন করায় যাত্রীর পাশাপাশি যানজটের কারণে ট্রিপের সংখ্যাও কমে গেছে।
এদিকে ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে মেট্রোরেলের দ্বিতীয় অংশের কাজ পুরোদমে শুরু হলে আরও কিছু বাসের গতিপথ বদলে যেতে পারে। যানজট কমাতে ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কে পিক আওয়ারে প্রাইভেট কার বন্ধ রাখার চিন্তা করছে ট্রাফিক বিভাগ।
ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পিক আওয়ার হিসেবে সকাল আটটা থেকে সকাল সাড়ে দশটা এবং বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সপ্তাহে রবি থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন মোট সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ফার্মগেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত প্রাইভেটকার চলাচল বন্ধ রাখা হবে।
প্রথম দিকে রাজধানীতে ১৫০০-১৮০০ সিসির ‘গ’ সিরিজের প্রাইভেট কার বন্ধ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে পরবর্তী সময়ে ৮০০ সিসির ‘ক’ ও ১০০০-১৩০০ সিসির ‘খ’ সিরিজের প্রাইভেট কারগুলো বন্ধ রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে অ্যাম্বুলেন্স, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, রোগী বহনকারী ও ওষুধ পরিবহনের মতো জরুরি সেবার গাড়িগুলো এর আওতার বাইরে থাকবে বলে জানা গেছে।
বিজয় সরণী থেকে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউগামী প্রাইভেট কার গুলোকে আল রাজী হাসপাতালের পাশ দিয়ে তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড়ের দিকে ডাইভারশন হবে। এর অংশ হিসেবে আল রাজী হাসপাতালের সামনের সড়কের বিভাজক তুলে সড়ক প্রশস্ত করা হবে। নির্বির্ঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে সড়কটি রিকশামুক্ত রাখা হবে। এ ছাড়া তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনে রেলক্রসিংয়ে বাঁক তুলে সড়কটি সোজা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, যাঁরা গুলশান বা মগবাজার দিয়ে প্রাইভেট কারে কারওয়ান বাজার এলাকার দিকে আসবেন, বিকল্প হিসেবে তাঁদের এফডিসি সড়ক দিয়ে হোটেল সোনারগাঁও মোড়ের কাছাকাছি নেমে যেতে হবে। একইভাবে মিরপুর বা ধানমন্ডি থেকে আসা প্রাইভেট কারের যাত্রীদের বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের কাছাকাছি নেমে যেতে হবে।
ফার্মগেট-শাহবাগ সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে মোটরসাইকেলকে প্রাধান্য দেওয়ার চিন্তা করছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।
বাণিজ্য মেলা, বিপিএল এবং আবাসন মেলা শেষ হলেও যানজটের ভোগান্তি থেকে মিরপুরবাসীর মুক্তি মিলছে না। অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুরু এবং শেষের সময় যানজটের ভোগান্তি মাত্রা ছাড়িয়ে যায় বলে জানালেন স্থানীয়রা। মেট্রোরেলের কর্মীরা যানজট নিরসনে কাজ করলেও সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় যানজট নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বেসরকারি চাকরিজীবী আদনান আহমেদ বলেন, আগে দেড়ঘন্টায় মিরপুর থেকে মতিঝিলের অফিসে যাওয়া যেত। এখন সকাল সাতটার সময় বাসা থেকে বের হয়েও ঠিক কখন অফিসে পৌছাবো সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার সময়েও একই ভোগান্তি পোহাতে হয়। মেট্রোরেল চালু হলে হয়ত ভোগান্তি কমবে কিন্তু তাঁর আগে যানজট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

NO COMMENTS

Leave a Reply