Home মূল কাগজ নগরোদ্যান পুরনো ঢাকার চেনা দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে সবুজ মাঠ

পুরনো ঢাকার চেনা দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে সবুজ মাঠ

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
পুরনো ঢাকার কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ঘিঞ্জি গলিপথ আর গায়ের ওপর গা লাগানো দালানকোঠায় ঠাসা রুদ্ধ এক জনপথের কথা ।
চিরচেনা এই দৃশ্যের বাইরে চতুভুর্জ আকৃতির একখন্ড সবুজ মাঠ খানিকটা অবাক-ই করে দেয়। মাঠ জুড়ে সবুজের সমারোহ চোখে দেয় স্বস্তি, মনে প্রশান্তি।
অথচ বছর দুয়েক আগেও দৃশ্যপটটা ঠিক এমন ছিলো না। ঢাকার অন্যসব পার্কের মতো লালবাগের এই মাঠটিতে উৎকট গন্ধের সাথে ছিলো ময়লা আবর্জনার স্তুপ। সামনের সড়কে ছিলো পিকআপ ভ্যান, রিক্সা, লেগুনার অবৈধ পার্কিং, বস্তি আর টং দোকানের সারি। সংস্কারে পুরোপুরি বদলে গিয়ে নতুন অবয়ব পেয়েছে পুরনো ঢাকার ঢাকেশ্বরী সড়কের শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠ। মাঠটিতে বালুর বদলে এখন দোল খাচ্ছে দৃষ্টিনন্দন সবুজ ঘাস। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে আমড়া, কামরাঙা, লটকনসহ দেশীয় ফল ফুলের নানা জাতের গাছ। সেখানে প্রজাপতি,ফড়িং, পাখিদের সাথে নিরন্তন খেলায় মেতে উঠছে শিশুরা।
সম্প্রতি মাঠটি ঘুরে দেখা গেছে, খেলার মাঠের মূল কাজ শেষ হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে হাঁটার পথ। এর নিচে আছে পানি নিষ্কাশনের সংযোগ ও ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষনের ব্যবস্থা। মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ পরিখায় সংরক্ষিত হবে পাঁচ লক্ষ লিটার বৃষ্টির পানি। ভূগর্ভে সংরক্ষিত এই পানি মাঠে ব্যবহার করা হবে। বাড়তি পানি পরিশোধন করে কফিশপ, পাবলিক টয়লেট, ব্যায়ামাগার এবং পাশ্ববর্তী মসজিদের চাহিদা পূরণ করা হবে। জরুরি প্রয়োজনে অগ্নিনির্বাপনের কাজেও ব্যবহার করা যাবে এই পানি। মাঠের উত্তর-পূর্ব দিকে করা হয়েছে একটি দোতলা ভবন। এর নিচতলায় করা হয়েছে ব্যায়ামাগার ও পাবলিক টয়লেট। দোতলায় একটি কফি শপ করা হয়েছে। কফিশপের সাথেই থাকছে পাঠাগার ও বই বিক্রয় কেন্দ্র। মাঠের উত্তরপাশে ক্রিকেট অনুশীলন করার জন্য পিচ আকৃতির একফালি জায়গা রাখা হয়েছে। পূর্ব দিকে রাখা হয়েছে শিশু কর্নার। সেখানে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে। মাঠের চারপাশে লাগানো হয়েছে এলইডি বাতি। উদ্ধোধনের আগেই মাঠের চারপাশের অংশে বিভিন্ন বয়সী মানুষজন হাঁটাচলা করছেন। অনেকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
চকবাজার নিউমার্কেট রুটে চলাচলকারী লেগুনার লাইনম্যান হাবিব বৈশাখের তপ্ত রোদে গাছের ছায়ায় বসে খানিকটা জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। কথায় কথায় জানালেন মাঠের আগের অবস্থার কথা। বললেন আগে মাঠে খেলা তো দূরে থাক, মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটার পরিস্থিতি ছিল না। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীরা অসামাজিক কার্যকলাপ চালাতো। মাঠ সংস্কারের পর আশপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে।
মা রোকেয়া ইসলামের হাত ধরে ঘুরতে এসেছে ছোট্ট মিহিরিমা। লালবাগের স্থানীয় বাসিন্দা রোকেয়া জানালেন প্রায়ই মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন তিনি। আগে মাঠের চারপাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং বখাটেদের উৎপাতের কারনে এদিকে আসতেন না। এছাড়া বছরের বেশিরভাগ সময়ই মাঠ দখল করে চলতো মেলা। সংস্কার কাজের পর মাঠের চারপাশের পরিবেশ উন্নত হয়েছে। আশেপাশের মানুষের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানান তিনি।
সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা গেছে সংস্কারের পর এই মাঠে যাতে মেলাসহ অনান্য কর্মকান্ড চলতে না পারে সেজন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের অনুরোধে মাঠটিতে শুধু ঈদের নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠের সংস্কার কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-৩ (আজিমপুর)। জল সবুজে ঢাকা প্রকল্পের আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে আওতাধীন এরকম আরও ১৯টি পার্ক এবং ১২টি খেলার মাঠের উন্নয়ন কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ নাগাদ পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের প্রধান স্থপতি রফিক আজম কারিকাকে বলেন আগে যেমন মনে করা হতো দেয়াল দিয়ে মাঠটিকে সুরক্ষিত করা যাবে এটা আসলে ভুল ধারণা। দেয়ালের কারনে মনোজাগতিক বাধা তৈরি হয়। দেয়াল থাকার ফলে নিদিষ্ট সময়ের পর এলাকাবাসী যখন মাঠটি আর ব্যবহার করতে পারতেন না। তখন সন্ধ্য্যার পর দেয়াল টপকে সেখানে দুষ্টুলোকেরা ঢুকতো। দেয়ালের আবডাল থাকায় দুস্কৃতিকারীদের জন্য মাঠটি দখল এবং অপকর্ম করা সহজ হতো। তাই আবদুল আলীম মাঠসহ জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের সব মাঠ ও পার্কের স্থাপত্য নকশা করার সময় দেয়াল উঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। দেয়াল তুলে দেয়ার ইতিবাচক দিকটি বোঝাতে সিটি কর্পোরেশনসহ সব মহলের কাছে আমার অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত আমি তাঁদের বোঝাতে পেরেছি। দেয়াল না থাকার ফলে স্থানীয়রা মাঠটি নিজেদের বলে ভাবছে, যখন ইচ্ছে তখন ব্যবহার করতে পারছে। মাঠে আগত দর্শনার্থীদের চোখ এক্ষেত্রে নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করবে। সেই সঙ্গে আছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি।
খেলাধূলার বাইরে মাঠের বহুবিধ ব্যবহার প্রসঙ্গে রফিক আজম বলেন, আগে মাঠটিতে শুধু ফুটবল খেলা হতো। কিন্তু নতুন করে সংস্কার করার পর মাঠটিতে ফুটবল খেলার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা থাকবে। শিশুদের খেলার জায়গা থাকবে, বড়দের হাঁটার জায়গা থাকবে, যারা স্বাস্থ্য সচেতন তাঁদের জন্য ব্যায়াম করার ব্যবস্থা থাকবে। পড়–য়াদের জন্য মাঠ সংলগ্ন ভবনের ওপরতলায় বই পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে গল্প করা যাবে। ওয়াইফাই ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ সারা যাবে।
অতীতে এমন অনেক ভালো উদ্যোগ শুধুমাত্র রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এই মাঠটি সংরক্ষণে কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রফিক আজম বলেন, মাঠটি দেখাশোনার জন্য স্থানীয় জনগনের অংশগ্রহনে একটি কমিটি করে দেয়া হবে। মাঠ সংলগ্ন বাড়িতে বসবাসরত নারী, পুরুষ, কিশোর, কিশোরী, খেলোয়াড়, মসজিদের ইমাম, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় বরেণ্য ব্যাক্তি সেই কমিটির সদস্য হবেন।
মাঠটি রক্ষাবেক্ষনের জন্য মালি, পরিছন্নতা কর্মী, লাইব্রেরিয়ান, কফি শপের দোকানীও স্থানীয় পর্যায় থেকে নিয়োগ দেয়া হবে।
পরিকল্পিত নগর স্থাপত্য শিশু মনোজগতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে উলে­খ করে রফিক আজম বলেন, শহীদ আব্দুল আলীম খেলার মাঠটি শিশুদের জন্য একটি প্রাকৃতিক শিক্ষাদান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ছয় ঋতু সম্পর্কে জানতে তাকে আর বইয়ের কাছে যেতে হবে না। সে প্রকৃতি থেকেই ছয় ঋতু সম্পর্কে জানবে। গাছ চিনবে। ফুল চিনবে। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাওয়ার যে অপরিসীম আনন্দ সেটা শিশুরা এখানে উপভোগ করতে পারবে। ঢাক গাছ থেকে যে ঢাকা নামের উৎপত্তি সেটা শিশুরা এই মাঠ থেকেই জানবে।
এখন থেকে পুরনো ঢাকার শিশু কিশোররা ড্রাগের পেছনে না ছুটে প্রজাপতির পেছনে ছুটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেন।
ছোট খাটো সংস্কার কাজ শেষ হলে এবং কফি শপ ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ান চেইন শপ সিক্রেট রেসিপির সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে খুব শীঘ্রই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হবে লালবাগের শহীদ আবদুল আলীম মাঠ। পুরনো ঢাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয় হবে এই মাঠটি। আর জল সবুজের ঢাকা প্রকল্পের পুরো কাজ শেষ হলে নগরবাসীর সামনে হাজির হবে নতুন এক সবুজাভ ঢাকা।

NO COMMENTS

Leave a Reply