Home অন্তর্জাতিক পৃথিবীর সেরা তিন পাবলিক হাউজিং প্রজেক্ট

পৃথিবীর সেরা তিন পাবলিক হাউজিং প্রজেক্ট

খালিদ জামিল


পরিবেশগত বা অন্য কোনো কারণে একটি বিশেষসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসনের চাহিদা থেকে এসেছে ‘পাবলিক হাউজিং’য়ের ধারণা। এটার উদ্দেশ্য বেশ ইতিবাচক হলেও সব ক্ষেত্রে পাবলিক হাউজিং সাফল্য পায়নি। সত্যি বলতে, প্রথম দিকের হাউজিং প্রজেক্টগুলোর একটিকেও সফল বলা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে ওইসব এলাকায় অপরাধের হার বেড়ে গেছে কিংবা জমজমাট হয়ে উঠেছে মাদক-ব্যবসা। সবচেয়ে বড় সমস্যাটা হলো, হঠাৎ করে একটি এলাকায় নতুন একটি হাউজিং প্রজেক্ট গড়ে উঠলে সেখানকার নতুন বাসিন্দারা আশপাশের মানুষের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না।
তবে ভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। কিছু প্রজেক্ট রীতিমতো প্রমাণ করেছে স্থাপত্যবিদ্যা এর আওতার বাইরের অনেক প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারে। এদিক দিয়ে এগিয়ে থাকা পৃথিবীর সেরা তিন পাবলিক হাউজিং প্রজেক্ট নিয়ে এবারের আয়োজন।

১. কুয়াইসাইড ভিলেজ, কানাডা
এ প্রজেক্টে মোট ১৯টি আবাসিক ইউনিট রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি আলাদাভাবে সীমিত আয়ের মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যেই রাখা হয়েছে। সামাজিক পার্থক্যকে কমিয়ে আনার চিন্তা থেকেই নেয়া হয় এমন উদ্যোগ। প্রতিটি ইউনিট ১ থেকে ৩ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট এবং সবগুলোই হুইল চেয়ার প্রবেশের উপযোগী করে তৈরি।

যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে প্রজেক্টটি সেরা
• পুরো প্রজেক্টটি করা হয়েছে এক হাজার বর্গমিটারের মধ্যে, যাতে শক্তির সাশ্রয় হয়।
• স্থানীয় বাজার থেকে শুরু করে বাসস্টপ, রেস্টুরেন্ট ও পার্কসহ এমন সবকিছুই পায়ে হাঁটা দূরত্বে। তাই মূল শহুরে জীবন থেকে এখানকার বাসিন্দাদের কখনোই আলাদা হতে হয় না।
• হাউজিংয়ে রয়েছে ২৩২ বর্গমিটার কমন স্পেস আর ৬০ বর্গমিটার বাণিজ্যিক অংশ।
•হাউজিংয়ের কমন রান্নাঘর, লন্ড্রি আর ডাইনিং রুমও আছে যেখানে বিভিন্ন উপলক্ষে সিনেমা প্রদর্শন করা হয়।
•সব ইউনিট তৈরিতেই ব্যবহৃত হয়েছে এই সাইটেই পাওয়া পুরনো উপকরণ। যেমন- রঙিন কাচ, কাঠের দরজা, ওক কাঠের মেঝে ইত্যাদি।
• যেসব পরিবারে বাচ্চা আছে তাদের জন্য নিচের দিকের ইউনিটগুলো বরাদ্দ করা হয়েছে। শিশুদের জন্য আলাদাভাবে নিরাপদ খেলার জায়গারও বন্দোবস্ত আছে এখানে।
• ওপরের দিকের বাসাগুলো থেকে ভ্যানকুয়েভার ডাউন-টাউন আর পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখা যায়।
• প্রায় সব ইউনিটের মূল দরজাই উঠোনের মতো একটা জায়গার দিকে মুখ করা, যেখানে ফুলের বাগান করা হয়েছে। এখানে বাসিন্দারা নিজেদের খাওয়ার জন্য সবজিও উৎপাদন করতে পারে।
• হাউজিংয়ের অনেককিছুই নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। তবে বাসিন্দাদের নিজেদের মতো করে জীবনযাপন করতে সমস্যা হয় না। সবার পারিবারিক গোপনীয়তার বিষয়টি মাথায় রেখেই এ হাউজিংয়ের নকশা করা হয়েছে।
• সাধারণ হাউজিংয়ের মতো এখানে ডাস্টবিন নেই। বর্জ্যরে ধরন ভেদে আলাদা বিন রাখা আছে। প্রতিটির ওপর লেবেল লাগানো রয়েছে, যাতে সবাই বুঝতে পারে কোথায় কী ফেলতে হবে।
• পানির অপচয় রোধ করতে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন-ব্যবস্থা। রান্নাঘরের সিঙ্ক, বাথটাব ও লন্ড্রিতে যে পানিটা খরচ হয়, সেটা পুনরায় ব্যবহার করা হয় টয়লেট ফ্ল্যাশ করার কাজে।
• এ হাউজিং প্রজেক্টে বাস করেন সমাজের নানা স্তরের মানুষ। তবে সবাইকে একত্রিত করতে সপ্তাহে অন্তত একবার একটা উৎসবের মতো আয়োজন করা হয়।

২. সাভনারি হেইম্যানস পাবলিক হাউজিং, ব্রাসেলস
এটা শতভাগই পাবলিক হাউজিং স্কিম, যেটা নির্মাণ করেছে এমডিডব্লিউ আর্কিটেকচার। ব্রাসেলসের গার্ডেন প্যালেস থেকে মাত্র আধা মাইল দূরে এর অবস্থান। নির্মাণ করা হয়েছে মূলত এক সময়ের সাবান কারখানাকে রূপান্তর করে। বর্তমানে এখানে আছে ৪২টি হাউজিং ইউনিট। মানের দিক থেকে অবশ্য সবগুলো এক পর্যায়ের নয়। আছে ১ থেকে ৬ বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টও। কোনোটিকে বলতে হবে চিলেকোঠা, কোনোটি আবার ডুপ্লেক্স। এ ভিন্নতা গোটা কমপ্লেক্সের ভবনগুলোকে আরো বৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলেছে। কোনো কোনো অংশ একেবারেই নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে আবার আগেরটার খানিকটা পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে নতুন রূপ। এ বৈচিত্র্যই জানান দেয় ব্রাসেলসের মতো একটি শহরের নানান শ্রেণির মানুষের কথা।
প্রজেক্টটিতে রয়েছে নানা ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। লাইব্রেরি, ছোট বাগান, খেলার মাঠ, ত্রিমাত্রিক ল্যান্ডস্কেপ পার্ক আর হাঁটার জন্য রাস্তা। সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আছে বিশেষ ব্যবস্থা। পুরো কমপ্লেক্সটি কাচের আবরণ দিয়ে ঘেরা। যে কারণে সারাবছর এর প্রতি বর্গমিটার উষ্ণ রাখতে খরচ হয় মাত্র ১৫ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ। ছাদে রয়েছে ৬০ বর্গমিটার আয়তনের সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল। বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্যও আছে বিশেষ ব্যবস্থা। রান্না আর গোসলের পানিও সংরক্ষণ করা হয় টয়লেটে ব্যবহারের জন্য। এক সময় যেটা সাবান কারখানার চিমনি ছিল সেটা এখন বেজমেন্টের ভেন্টিলেশন সিস্টেমের অন্যতম অংশ।
হাউজিং কমপ্লেক্সটি ঘনবসতিপূর্ণ হলেও একসঙ্গে শহরের কেন্দ্রে কীভাবে বাস করা যায় সেটা এখানকার বাসিন্দারা দেখিয়েছেন দারুণভাবেই।


৩. কুইনটামনোরি হাউজিং, চিলি
এটা কুইনটামনোরি এলেমেন্টা কোম্পানি নির্মিত প্রথম বিখ্যাত হাউজিং প্রজেক্ট। চিলির স্থপতি আলেজান্দ্র্রো আরাভেনাকে সরকার দায়িত্ব দিয়েছিল ৫ হাজার বর্গমিটারের মধ্যে ১০০ পরিবারের বসবাসের বন্দোবস্ত করার। ওই পরিবারগুলো চিলিতে ৩০ বছর ধরে অবৈধভাবে বাস করে আসছিল। কঠিন এই কাজটার প্রত্যেক পর্যায়ে তিনি দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন।

অসুবিধাগুলো
• শহরের এমন একটা জায়গায় এর অবস্থান, যে-কারণে জমির দাম অনেক বেশি। তারপরও আলেজান্দ্রো চেয়েছেন প্রজেক্টের সব বাসিন্দা যেন শহরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। এছাড়া প্রজেক্টের অবস্থানের কারণে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এখানে থাকা সব ধরনের সম্পদের দামই বাড়ছে দ্রুতগতিতে। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের সময় এ বিষয়টাও মাথায় রাখা হয়েছে।
• প্রতি পরিবারকে সরকার ৭,৫০০ ডলার করে ভাতা দেয়, যেটা ওই জমি ও অবকাঠামোর দাম পরিশোধের জন্য যথেষ্ট নয়। আর বাজেট কম থাকায় প্রজেক্ট নির্মাণ করতে হয় ৩০ বর্গমিটারের মধ্যে।
• প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গেলে দরকার হচ্ছিল অতিরিক্ত জমির। ভার্টিক্যাল হাউজিংয়ে জায়গা লাগছিল প্রচুর। কিন্তু আলেজান্দ্রো এমনভাবে জমির ব্যবহার করলেন যাতে যতটুকু জমির ওপর ঘর বানানো হয়, তারচেয়ে দ্বিগুণ জায়গা পাওয়া যায় ভেতরে।

সমাধান
• প্রথমত তারা ভুলেই গেল, এগুলো কোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘর হবে। যেন তাদের বাজেট ৭ হাজার ৫০০ নয়, ৭ লাখ ৫০০ ডলার!
• প্রতিটা বাড়ি হলো ৭২ বর্গমিটারের মধ্যে, অথচ এর অর্ধেক টাকা দেয়ার মতো ক্ষমতাও পরিবারগুলোর ছিল না। প্রথমে বাড়িতে একেবারেই মৌলিক বিষয়গুলো রাখা হলো, যেমন- রান্নাঘর, বাথরুম, দুই ঘরের মধ্যকার বিভাজন, সিঁড়ি ইত্যাদি।
• বাড়িগুলো কেবল নিচতলা আর দোতলা বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়, যাতে দুইতলার বেশি কেউ বাড়ি তুলতে না পারে। তবে প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে তার সমপরিমাণ জায়গা খালি রাখা হয়েছে, যাতে এর মালিক পরবর্তীতে প্রয়োজন ও আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় নিজের বাসস্থানের আয়তন বাড়িয়ে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নিজের বাড়ির নকশা আর রঙও এর ক্রেতারা পছন্দ করে নেয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

প্রজেক্টের ধরনের কারণে বাসিন্দারা এটাকে নিজেদের সম্পদ ধরে নিয়ে যতেœর সঙ্গে ব্যবহার করেন। নির্মাণের এক বছরের মাথায় প্রতিটি ইউনিটের দাম হয়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি।

NO COMMENTS

Leave a Reply