Home মূল কাগজ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে

তানজিম হাসান
স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর


রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নতুন ভবনের দিকে তাকালেই যে কারোর দৃষ্টি আটকে যায়। শুধু নান্দনিকতা দিয়েই নয়, ভবনটি তার ভিন্ন বিশেষত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করেন এমন মানুষকে চোখের পলকেই কাছে টেনে নিয়ে যায়। ভবনটির এমন গুণের রসদদাতা এক স্থপতি-দম্পতি তানজিম হাসান ও নাহিদ ফারজানা। এই দম্পতি তাদের মেধার সর্বোচ্চ স্ফূরণ ঘটিয়ে তৈরি করেছেন এর নকশা। যে নকশার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ ঘটেছে এক অনন্য উচ্চতা নিয়ে। সম্প্রতি স্থপতি তানজিম হাসান এই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন কারিকার সঙ্গে। কথোপকথনের চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন মো. জগলুল হায়দার

তরুণ এই স্থপতির মুক্তিযুদ্ধ দেখার সুযোগ না হলেও মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে রয়েছে গভীর গবেষণা। তারই আলোকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, সংগঠিত একটি সামরিক শক্তির সঙ্গে ছিল সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা। এটা শক্তিশালী ছিল। কারণ সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যখন যুদ্ধ করে তখন সেটার প্রেক্ষাপট দাঁড়ায় এক রকম, আর যখন ডাক্তার, রিকশাচালক ও ছাত্ররা হাতে অস্ত্র ধরেছে সেটা কিন্তু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব খুব জটিল ও অস্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সাইক্লোন, বন্যা ও মহামারি ইত্যাদি যেমন সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য জটিল ঘটনা, যুদ্ধও ঠিক তেমনটি। সব সময় একটা জনগোষ্ঠী যুদ্ধ দেখতে চায় না। তারা শান্তি চায়। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ যুদ্ধ এসে যায়। নিঃসন্দেহে যেকোনো জনগোষ্ঠির জন্য যুদ্ধ একটি অভিশাপ। বাংলাদেশের মতো শান্তিপ্রিয় মানুষ যে এই অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছিল সেটাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এই শান্তিপ্রিয় মানুষগুলোই অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়েছে, তারা অশুভ শক্তি দ্বারা কী পরিমাণ নিষ্পেষিত হলে সেটা বুঝতে হবে। আমার জন্ম মুক্তিযুদ্ধের পরে হলেও পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার বদৌলতে এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারি। আমরা ভৌগলিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করেছি এবং সেটা অর্জন করতে পেরেছি। কিন্তু সত্যিকার স্বাধীনতা এখনও অর্জিত হয়নি। সাধারণ মানুষের পূর্ণাঙ্গ অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। মানুষের ওপর শোষণ এখনও চলছে। শোষকের চেহারা পাল্টালেও পাল্টায়নি শোষণের চেহারা।

তানজিম হাসান, স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেক সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা আছে। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আছে। তারা সব সময় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও বাহ্বা পায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে এমন অনেক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল যাদের কোনো পরিচিতি নেই। কেউ তাদের চিনেনও না বা স্মরণও করেন না। অথচ মুক্তিযুদ্ধে তাদেরও ছিল অগ্রণী ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে তাদের অসামান্য অবদানকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নির্মাণকাল প্রসঙ্গে তানজিম হাসান বলেন, যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর নির্মাণের দেখভালের দায়িত্ব দেয়া হয়, আমি এই দায়িত্বকে আমানত হিসেবে মনে করেছি। বাংলাদেশ সরকারের ও জনগণের টাকার কোনো অপব্যবহার যেন না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেছি। কোনো মালামাল বা উপকরণ সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি।
তিনি জানান, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের নকশা প্রণয়নের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তখন তিনি আবুধাবিতে ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। পরে জানতে পারেন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেছেন। যেটি ছিল তার জন্য আশাতীত প্রাপ্তি। তিনি চাকরি ছেড়ে দেশে চলে আসেন।
তরুণ এই স্থপতি বলেন, নকশাটি নিয়ে তাকে গভীরভাবে কাজ করতে হয়েছে। জীবনের সব দক্ষতাকে এখানে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। নকশাটিকে প্রাথমিক রূপদান করতেই তাকে কাজ করতে হয়েছে তিন মাস। নকশা নির্বাচিত হওয়ার পর এর পূর্ণাঙ্গতা আনতে ২০১০ সাল থেকে আরও এক বছর কাজ করতে হয়েছে। নির্মাণ-কাঠামোয় নকশার বাস্তবায়নে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছে। তবে আসল জায়গায় একটুও ছাড় দেয়া হয়নি।
তানজিম হাসান বলেন, বাংলাদেশের অস্তিত্ব ভৌগলিক ও রাজনৈতিকভাবে অর্জিত হয়েছে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দীর্ঘ সময় পরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এই দেশের মাটিতে গড়ে উঠেছে। এই জাদুঘর হয়তো কখনোই এই দেশের মানুষের যে ত্যাগ-তিতীক্ষা আর হাহাকারের পূর্ণাঙ্গতা ধারণ করতে পারবে না। কিন্তু যেকোনো মূল্যে এই জনগোষ্ঠীর আশা-আকাঙ্খা আর অনুভূতির ধারক ও বাহক হয়ে এই বাংলার মাটিতে কাল নিরবধি বহমান থাকবে। এই জাদুঘরের সঙ্গে যেমন মিশে আছে এদেশের সংগ্রামী সত্ত্বা তেমনি আছে যুদ্ধের ভয়াবহতার শিকার সর্বস্তরের মানুষের ক্ষতচিহ্ন।
তিনি বলেন, স্থাপনাটির মূলকেন্দ্রে আছে একটি গোলাকার শূণ্যস্থান, যা যুদ্ধের বিভীষিকাহৃত সর্বস্ব প্রাণের উপমা। দর্শক এর গ্যালারি পরিদর্শনের প্রতি মুহূর্তে অবগত থাকবেন এই শূণ্যতাকে ঘিরে। সর্বশেষে যাত্রা সমাপ্ত হবে একটি আত্মজিজ্ঞাসার স্থানে। যা হবে আগামীর পথচলার শক্তি। উপরে উন্মুক্ত আকাশ, নিচে শিখা চির-অম্লান। মাঝখানে মানুষ। এরই মাঝে মানুষ খুঁজে পাবেন তার চিরন্তন সত্ত্বাকে। এখানে আগুনটা হলো শক্তি। যেকোনো দ্রোহের চিহ্ন হলো আগুন। মানুষ প্রথমেই যুদ্ধ করেনি। আগে দ্রোহ করেছে। তারপর আস্তে আস্তে যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। এছাড়া লাঠিয়াল ও মিছিল এই দুটোও দ্রোহের চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এর চিহ্ন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। লাঠিয়ালরা যেমন একসময় জমিদারের পক্ষে যুদ্ধ করে আবার একসময় দেশের পক্ষেও যুদ্ধ করে। লাঠিয়ালরা দ্রোহী। তাদের একটা বিশেষত্ব আছে।
স্বপ্নবাজ এই স্থপতি বলেন, জাদুঘরটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন তার সব সময় মনে হয়েছে তার চেয়ে কমবয়সীরা যখন এখানে আসবে তখন তারা তাদের আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা খুঁজে পাবেন এই জাদুঘরে। তারা এখান থেকে অতীতের সব বিষয় জানতে পারবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই তথ্য স্থানান্তর করতে এই জাদুঘর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
তানজিম হাসান আরও বলেন, এমন চিন্তা-চেতনার ভবন আর কোথাও নেই। চেতনার শক্তি হিসেবে কাজ করবে ভবনটি। ভবনে সবাইকে আহ্বান করা হয়েছে একটা বোধে আসার জন্য। এই জাদুঘরের কাছে গেলেই একটা বোধ কাজ করে। সারা পৃথিবী কিন্তু যুদ্ধমুক্ত নয়। মানবিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে জাদুঘরটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশের সীমানার গন্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর নিষ্পেষিত মুক্তিকামী মানুষের জন্য এই জাদুঘরটি হতে পারে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

NO COMMENTS

Leave a Reply