Home চট্টগ্রাম প্রধান সড়কের মাঝখানে সুপারশপ দিচ্ছে চউক!

প্রধান সড়কের মাঝখানে সুপারশপ দিচ্ছে চউক!

0 208

বাড়বে যানজট, ঘটবে প্রাণহানি, কমবে যানবাহন চলাচলের পরিসর

আবদুল্লাহ আল মামুন
কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কটি চট্টগ্রামের প্রধান সড়ক। নগরের মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারের নিচে সড়কের মাঝখানে ১৪টি দোকান ও তিনটি সুপারশপ বরাদ্দ দিচ্ছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ইতোমধ্যে বরাদ্দের বিজ্ঞপ্তি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। সড়কের মাঝখানে এভাবে দোকান নির্মাণকে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বলছেন পরিবহন ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এটা সড়কের ধারণক্ষমতা কমাবে, বাড়বে প্রাণহানি ও যানজট। তবে বিশেষজ্ঞদের এসব পরামর্শে কর্ণপাত করতে রাজি নয় চউক। এ বিষয়ে স্বয়ং চউকের নগর পরিকল্পনাবিদদেরও কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘ফ্লাইওভারের নিচে সড়কের মাঝখানে দোকান দেওয়ার চিন্তাটা উদ্ভট। এসব দোকানে ক্রেতারা কীভাবে যাবেন। রাস্তা পারাপার করে লোকজন দোকানে গেলে তো দুর্ঘটনা ঘটবে। এভাবে হতে পারে না। নগরে দোকান দেওয়ার কি জায়গার অভাব হয়েছে। তাছাড়া দোকান দিতে হলে সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। আমরা ট্রেড লাইসেন্স দেব না।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘ফ্লাইওভারের নিচে দোকান হলে কোনো যানজট ও দুর্ঘটনা হবে না। সেভাবে দোকান ও সুপারশপের নকশা ডিজাইন করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানে পার্কিংয়ের জন্য আলাদা জায়গা থাকবে। সড়ক দিয়ে যাতে দোকানে মানুষ যাতায়াত না করে, সেজন্য ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতি মাসে ফ্লাইওভারের ওপর লাইট জ্বালানোর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিল আসে ১০ লাখ টাকা। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরো কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এত বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয় করার মতো ফান্ড চউকের নেই। তাই রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় নির্বাহের জন্য দোকান ও সুপারশপগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চউকের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে এ ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। সুতরাং নির্মাণ ব্যয় ফেরত দেওয়ার কোনো বিষয় নেই এখানে। স্রেফ বাণিজ্যের জন্য ব্যক্তিস্বার্থে এখানে দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে।’ এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খানের কাছে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে অবগত নন বলে জানিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) কুসুম দেওয়ান বলেন, ‘ফ্লাইওভারের নিচে দোকান নির্মাণের বিষয়ে চউক আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি, পরামর্শও নেয়নি। সড়কে যত্রতত্র মানুষ পারাপারের কারণে দুর্ঘটনা যেমন বাড়ছে, তেমনি যানবাহন চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। সড়কের মাঝখানে দোকান নির্মাণ করা হলে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনাও বাড়বে। এটি কোনোভাবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নয়।’
চউক সূত্র জানায়, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের নাসিরাবাদ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের র‌্যাম্পের নিচে আটটি, এর বিপরীতে সানমার ওশান সিটির সামনে ৬টিসহ ১৪টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া সড়কের মাঝখানে তিনটি সুপারশপ নির্মাণ করা হবে। এগুলো হলো নগরের মুরাদপুর সড়কের মাঝখানে ফ্লাইওভারের নিচে একটি, ষোলশহর বেবি সুপার মার্কেটের সামনে ফ্লাইওভারের নিচে একটি ও লালখানবাজার সড়কের মাঝখানে ফ্লাইওভারের নিচে একটি। র‌্যাম্পের নিচে প্রতিটি দোকান হবে ১৩২ বর্গফুট ও সড়কের মাঝখানে ফ্লাইওভারের নিচে সুপারশপগুলো হবে সাত হাজার বর্গফুটের বেশি। দোকানের প্রতি বর্গফুট ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা ও প্রতি বর্গফুট সুপারশপের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ টাকা। দোকান ও সুপারশপগুলো বরাদ্দের বিষয়ে গত ২৪ ডিসেম্বর স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে সিডিএ।
সড়কের মাঝখানে দোকান বরাদ্দ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘সড়কের মাঝখানে সুপারশপ ও দোকান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা অনিরাপদ। এখানে দোকান দেওয়া হলে মানুষ বারবার সড়ক পারাপার করবে। এতে মানুষের সঙ্গে যানবাহনের সংঘর্ষ বাড়বে। প্রাণহানি ঘটবে। সড়কের ডানপাশে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল করে। দোকান করা হলে লোকজন এখানে গাড়ি ও রিকশা দাঁড় করাবে। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়ে যানজট তীব্র আকার ধারণ করবে। বিশ্বের কোথাও সড়কের মাঝখানে এ ধরনের দোকান দেওয়ার কোনো নজির নেই।’
পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সাধারণ সম্পাদক স্থপতি জেরিনা হোসেন ও সদস্য প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘এটি চট্টগ্রামের প্রধান সড়ক। এমনিতে ফ্লাইওভারের র‌্যাম্পের কারণে এ সড়ক সংকুচিত হয়েছে। এখন এর নিচে দোকান দেওয়া হলে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে যাবে। এগুলো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরো একধাপ অকার্যকর করবে।’

NO COMMENTS

Leave a Reply