Home ফিচার প্রাচীন দুর্গ থেকে রাজপ্রাসাদ, অতঃপর ল্যুভর…

প্রাচীন দুর্গ থেকে রাজপ্রাসাদ, অতঃপর ল্যুভর…

0 96

আবুল হোসেন আসাদ
হিম হিম ঠান্ডা সকাল। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। সারারাত ঘুম হয়নি ভুবনবিখ্যাত রহস্যময়ীকে দেখব বলে। প্যারিসের হোটেল ডি ভিলা থেকে মেট্রোরেলে চড়ে মিউজি ডি ল্যুভরে এলাম। ল্যুভর মিউজিয়ামের সঙ্গেই লাগোয়া এই মেট্রো স্টেশন। ছোটবেলায় বইয়ে পড়েছি, দেখেছি এক রহস্যময়ীর ছবি : মোনালিসা। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির তৈলরঙে আঁকা কালজয়ী চিত্র মোনালিসার রহস্যময় হাসিতে উদ্ভাসিত এক জাদুঘর, নাম তার ল্যুভর।
শুধু মোনালিসার জন্যই নয়, স্বীয় স্থাপত্যবৈশিষ্ট্য, নান্দনিক নির্মাণশৈলী, প্রাচীন দুর্গ থেকে রাজপ্রাসাদ, অতঃপর মিউজিয়ামে পরিণত হওয়া- সব মিলিয়ে ল্যুভর নিজেই একটি ইতিহাস। সুবিশাল প্রদর্শনীর জায়গা নিয়ে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন বুকে ধারণ করে ল্যুভর নিজেই হয়ে উঠেছে বিশ্বসেরা আর্ট মিউজিয়াম। ফ্রান্সের প্যারিসে সিন নদীর তীরে অবস্থিত এই ল্যুভর মিউজিয়াম সময়ের সিঁড়ি বেয়ে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে সমকালে, মহাকালের ধারক হিসেবে।
প্যারিস। যার উপমা অর্ধেক নগরী, অর্ধেক কল্পনা। এ কল্পনার রাজ্যে একসময়ের রাজপ্রাসাদে অধুনা ল্যুভরের দ্বিতীয় তলার ফ্রেমে ঝুলছে কল্পনার মানবী মোনালিসার ছবি। প্রশস্ত প্রাঙ্গণ পেরিয়ে ল্যুভরে ঢুকতেই পেলাম কাচের পিরামিড। কাচের পিরামিডের ভেতর দিয়ে ল্যুভরের মূল ভবনে প্রবেশ করলাম। কারও কারও মনে হতে পারে ল্যুভরকে জাদুঘর বানানোর জন্যই বুঝি তৈরি করা হয়েছিল। এ ধারণাকে পোক্ত করে দেয় ল্যুভরের কাচের পিরামিড। আদতে ল্যুভর হচ্ছে একটি প্রাচীন দুর্গ। ১২ থেকে ১৩ শতকের মাঝে ল্যুভর নির্মিত হয়েছিল দুর্গ হিসেবে। ধারণা করা হয়, দুর্গটির নির্মাণ শুরুর সময় ১১৯০ সাল। তখন ছিল রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের শাসনামল। ভাইকিং দস্যুদের হাত থেকে প্যারিস শহরকে রক্ষা করার জন্য সিন নদীর তীরে শহরের সংযোগস্থলে নির্মিত হয়েছিল ল্যুভর। প্রতিরক্ষার জন্য দুর্গের নকশাটিকে করা হয় চতুষ্কোণ। যার চারপাশ দিয়ে ঘেরা ছিল পরিখায়। বেশকিছু ওয়াচ টাওয়ার বা প্রতিরক্ষামূলক টাওয়ারও ছিল প্রাচীরের সঙ্গে, চারদিকে। প্রধান টাওয়ারটি ছিল ঠিক মাঠের মাঝখানে আলাদা এক পরিখায় ঘেরা। সময়ের আবর্তে নগরীর পরিধি বাড়তে থাকায় দুর্গটি আর ব্যবহৃত হয়নি। এখনো জাদুঘরের বেজমেন্ট বা সবচেয়ে নিচের তলায় পুরনো দুর্গের অংশবিশেষ দেখা যায়, যা ১২২৬ থেকে ১২৭০ সালে নির্মিত হয়েছিল। ১৫৪৬ সালে সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিস এতে বসবাস শুরু করে ল্যুভরকে প্রাসাদের মর্যাদা দেন। এরপর থেকেই ফরাসি রাজা কিংবা সম্রাটদের প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ল্যুভর। ল্যুভরের পশ্চিম দিকের অংশ তৈরি হয়েছিল প্রথম ফ্রান্সিসের সময়। আর ল্যুভরের বেশিরভাগ অংশের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় সম্রাট ত্রয়োদশ লুইস ও চতুর্দশ লুইসের সময়। সে সময়কালটি সতেরশ’ শতক। তাদের দু’জনই ছিলেন শিল্পের প্রতি প্রচন্ড অনুরক্ত। তাদের মন্ত্রীরা বিভিন্ন স্থান থেকে মূল্যবান শিল্পকর্ম সংগ্রহ করতেন। সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সময় ল্যুভরে আরও দুটি অংশ নির্মাণ করে বর্ধিত করা হয়। সম্রাট নেপোলিয়নের শাসনামলে যুদ্ধের সময় ফরাসি সেনাবাহিনীর বাজেয়াপ্ত করা শিল্পকর্ম দিয়ে ল্যুভরকে সমৃদ্ধ করা হয়। সম্রাট নেপোলিয়নের মৃত্যুর পর বাজেয়াপ্ত করা শিল্পকর্মগুলো আবার মূল মালিকদের কাছে ফেরত দেয়া হয়। ১৬৪২ সালে চতুর্দশ লুইস ল্যুভরকে রাজসংগ্রহ প্রদর্শনীর জন্য ছেড়ে দিয়ে ভার্সাই প্রাসাদে চলে যান। ১৭৯৩ সালের ১০ আগস্ট ল্যুভর পরিপূর্ণ মিউজিয়াম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ৫৩৭টি চিত্রকর্ম প্রদর্শনীর মাধ্যমে। বহু ভবনবিশিষ্ট ল্যুভরের স্থায়ী কাঠামো সম্পূর্ণ হয়ে যায় ১৮৫৭ সালের মধ্যে। মিউজিয়াম হিসেবে আধুনিক সরঞ্জামাদি সংযুক্ত করা হয় ল্যুভরে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০-এর মাঝামাঝি সময়ে। ৭২,৭৩৫ বর্গমিটার জায়গাজুড়ে রয়েছে ল্যুভরের প্রদর্শনীর স্থান। স্থপতি আইএমপে কাচের পিরামিড নির্মাণ করেন ল্যুভরে ১৯৮৮ সালে। কাচের পিরামিড আধুনিকতা ও প্রাচীন ঐতিহ্যের মধ্যে এক সমন্বয় তৈরি করেছে। ল্যুভরের রয়েছে তিনটি উইং ডেনন, সুলি ও রিচেলিউ। এর ফ্লোর রয়েছে চারটি। মোনালিসার অবস্থান ডেনন উইংয়ের দোতলায়। দর্শনীয় বস্তুর স্থাপনা অনুযায়ী, নিচতলার ডেনন উইংয়ে রয়েছে ইউরোপীয়, ইতালীয় ও স্প্যানিস ভাস্কর্য, মিসরীয় পুরাকীর্তি এবং গ্রিক ও রোমান পুরাকীর্তি। সুলি উইংয়ের কিছু অংশে রয়েছে প্রাচ্যের নিদর্শন এবং কিছু অংশে গ্রিক ও মিসরীয় নিদর্শন। রিচেলিউ উইংয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে ফরাসি ভাস্কর্যের বিশাল সমাহার। শিল্পসংগ্রহকে আটটি বিভাগে বিন্যাস করা হয়েছে। মোনালিসা চিত্রকর্মের চারদিক থেকে ঘেরা বুলেটপ্রুফ কাচে এবং পাহারা দেয়ার জন্য রয়েছে সবসময় সশস্ত্র প্রহরী। জলবায়ু ও আলোক নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। লেজার সিকিউরিটি ও ক্লোজ-সার্কিট সিকিউরিটি ক্যামেরা তো রয়েছেই। এককথায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় আচ্ছাদিত মোনালিসার চিত্রকর্মটি। দেয়ালে ঝোলানো মোনালিসার চিত্রকর্মের সামনে কিছুটা দূরত্বে কাঠের একটি অর্ধবৃত্তাকার রেলিং দিয়ে দর্শকদের জন্য সীমারেখা টানা হয়েছে। ছবি তুলতে হয় দূর থেকে এবং ছবি তুলতে কোনো ধরনের ক্যামেরার ফ্লাশলাইট ব্যবহার করা যায় না ল্যুভরে। ল্যুভরে রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজারের বেশি দর্শনীয় বস্তু। সবগুলো যদিও প্রদর্শন করা হয় না। বিশ্বসেরা এ ল্যুভর মিউজিয়াম দুনিয়ার সব পুরনো ও বড় মিউজিয়ামগুলোর মধ্যেও অন্যতম।

লেখক : সাইক্লিস্ট ও সাইকেলে বিশ্বভ্রমণকারী

NO COMMENTS

Leave a Reply