Home ফিচার বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে করণীয়

বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকতে করণীয়

0 182

সোহরাব আলম

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রাক-বর্ষা মৌসুমে কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় আঘাত হানে। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে এর পরিমাণ থাকে বেশি। বিগত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ দিক থেকেই ঝড় বইতে শুরু করেছে, সঙ্গে ঘটেছে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাও।
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া), সাতক্ষীরা-যশোরের বিল অঞ্চল আর উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। অধিকাংশই মারা যান মাঠে অথবা জলাধারে (নদী-খাল-বিল) কাজ করার সময়। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বজ্রপাত হলেও তা টের পাওয়া যায় কম। হতাহতের পরিমাণও হাতেগোনা। ধারণা করা হয়, বৈদ্যুতিক তারের আধিক্যের কারণে শহরে বজ্রপাতে হতাহতের পরিমাণ কম।
বজ্রপাতে চলতি বছরের ৩১ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের তিন জেলায় চারজনের মৃত্যুর খবর এসেছে। বজ্রপাতে মৃত্যু শুধু বাংলাদেশেরই সমস্যা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বড় দেশ ভারতে প্রতি বছর অনেক মানুষ মারা যায় বজ্রপাতে। এ অঞ্চলের আরেক দেশ নেপালে গত ৩১ মার্চ ভয়াবহ বজ্রঝড়ে ২৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনায় গুরুতর আহত হয় সাড়ে ৪০০ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মকালে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাতাস গরম হয়ে উপরে ওঠে। পরে জলীয়বাম্পের সঙ্গে মিশে এই গরম বাতাস যখন দ্রুত ঠান্ডা হয় তখনই বজ্রমেঘের সৃষ্টি হয়। জলবায়ুজীবীরা বজ্রপাতের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের একটা সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট অব স্পেস স্টাডিজের (জিআইএসএস) কলিন প্রাইস আর কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিড রিন্ড তাদের প্রকাশিত নিবন্ধে (পসিবল ইমপ্লিকেশন অব গ্লোবাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অন গ্লোবাল লাইটেনিক) জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বজ্রপাত আর দাবানল বা ফরেস্ট ফায়ারকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে। তাদের পরীক্ষাগারের তত্ত্ব অনুযায়ী (যাকে তারা জিআইএসএস মডেল বলছেন), পরিবেশে এখন যে পরিমাণ কার্বন আছে, তা যদি কোনোভাবে দ্বিগুণ হয়ে যায়, তাহলে বজ্রপাতের পরিমাণ প্রায় ৩২ ভাগ বেড়ে যাবে। ঢাকার বাতাসে কার্বণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। তাই বাড়ছে বজ্রপাতের ঝুঁকিও।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, দেশের কিছু জায়গা বজ্রপাত-প্রবণ। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল অন্যতম। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্রীষ্মকালে যেসব এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, সেসব এলাকায় যে মেঘের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকেই বজ্রপাতের আশঙ্কা থাকে। বজ্রপাতে মৃত্যুর বিষয়টিকে এখন অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতোই বিবেচনা করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। শহরে বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা কম হলেও সতর্ক থাকা জরুরি।

বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বলছে
মাথা ঠান্ডা রাখুন, ভড়কে যাবেন না।
আশপাশে উঁচু কোনো গাছ থাকলে, তার থেকে দূরে সরে যান।
ওপরে ছাদ আছে এমন জায়গায় চলে যান।
সম্ভব হলে টিনের ছাদ এড়িয়ে চলুন।
গাড়ির ভেতরেও নিরাপদ। গাড়ির ধাতব বডির সঙ্গে শরীরের সংযোগ না থাকলেই হলো
শুধু গাছ নয়, যেকোনো উঁচু জিনিস; যেমন বিদ্যুতের খুঁটি, টাওয়ার এসব থেকে দূরে থাকুন।
ঘন ঘন বজ্রপাতের সময় যদি ঘরের ভেতরে থাকেন, তাহলে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি যেমন মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, কর্ডলেস ফোন, ল্যান্ডফোন ব্যবহার না করাই ভালো।
আশপাশে নদী, পুকুর বা কোনো জলাশয় থাকলেও সেখান থেকে দূরে সরে যেতে হবে।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আইআর এবং কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের সহকারী পরিচালক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ আকরাম পলাশের সঙ্গে কথা হয় এ ব্যাপারে। তিনি বলেন, ‘বজ্রপাত হওয়ার মতো পরিবেশ টের পেলেই নিজেকে আগে নিরাপদ জায়গায় নিতে হবে। বাড়ির ছাদে ধাতব কোনো বস্তু রাখলে সেটা আর্থিং হিসেবে কাজ করতে পারে। বৃষ্টির পরপরই বাড়ি থেকে বের হওয়া যাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অনেকে বৃষ্টির পরপরই বেরিয়ে যায়। ছাতাও সঙ্গে নেয় না। হাতে ছাতা থাকলে কিন্তু সরাসরি শরীরে বজ্রপাতের আশঙ্কা অনেকটা কমে আসে। সাধারণত বৃষ্টির পরপরই বজ্রপাত হয়। তাই এ-সময় খোলা জায়গায় থাকা যাবে না। যেকোনো একটা শেডের নিচে থাকতে হবে।’

বজ্রপাতের সময় নিরাপদ থাকার আরও কিছু পরামর্শ
উঁচু গাছপালা বা বিদ্যুতের খুঁটিতে বিদ্যুৎ-স্পর্শের আশঙ্কা বেশি থাকে। এ-সময় গাছ বা খুঁটির কাছাকাছি থাকা নিরাপদ নয়। ফাঁকা জায়গায় যাত্রী ছাউনি বা বড় গাছে বজ্রপাত হওয়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে। তাই এসব স্থান এড়িয়ে চলুন।

ঘন ঘন বজ্রপাতের সময় খোলা বা উঁচু জায়গায় না থেকে দালানের নিচে আশ্রয় নিন। বজ্রপাতের সময় ঘরের জানালার কাছে উঁকিঝুঁকি মারা থেকে বিরত থাকুন।

বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ, জানালার গ্রিলসহ যেকোনো ধাতব পদার্থ সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। এ সময় মোবাইল ও ল্যান্ডফোন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকুন।

প্রতিটি বাড়ি বা বিল্ডিংয়ে বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন নিশ্চিত করুন। খোলা স্থানে অনেকে একত্রে থাকাকালীন বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরত্বে সরে যান।
কোনো বাড়িতে যদি পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সাবাই এক কক্ষে না থেকে আলাদা আলাদা কক্ষে যান। ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে অতি জরুরি প্রয়োজনে রাবারের জুতা পরে বাইরে বের হতে পারেন এবং প্লাস্টিক বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করুন।
বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ুন।

বজ্রপাতে আহতদের বৈদ্যুতিক শকের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply