Home মূল কাগজ আপন আবাস বসতবাড়ি থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতা

বসতবাড়ি থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতা

0 360

দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবিদ ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ। বর্তমানে উন্নয়ন সংস্থা পল্লীকর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর চেয়ারম্যান। দেশ-বিদেশে নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের বর্ণিল সময় কাটিয়েছেন। জীবনের নানা সময়ে থাকতে হয়েছে বিভিন্ন বাড়িতে। তার আপন আবাসের স্মৃতি-অভিজ্ঞতা লিখেছেন ফারিয়া মৌ।


সিলেটের করিমগঞ্জ। এক সময় এই এলাকাটা ভারতের একটা অংশ ছিল। করিমগঞ্জ সাবডিভিশনের রাতারগুল থানায় পরিবারের সঙ্গে প্রথম বসবাস শুরু হয়। তার বাবা তৎকালীন ভারত সরকারের বিধানসভার একজন এমএলএ ছিলেন। পরে, ১৯৫২ সালে পরিবারের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন মৌলভীবাজারের রাজনগরে। সেখানে বিশাল বাড়ি ছিল তাদের। বাড়িতে প্রচুর লোকসমাগম হতো তখন। এমএলএ-বাবার কাছে প্রতিদিন অনেক মানুষ তাদের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা নানা বিষয়ে পরামর্শ নিতে আসতেন। ফলে অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হতো সে-সময়। তখন বাড়িতে আগত অতিথিদের এক ধরনের বিশেষ চা দিয়ে আপ্যায়নের একটা প্রচলিত নিয়ম ছিল। ফলে সবার মুখে মুখে ছিল এমএলএ-বাড়ির চায়ের প্রশংসা। তাই কিছু উৎসাহী মানুষ এই বিশেষ চা নিয়ে একটা গানও বেঁধেছিল। বাড়ির পাশেই ছিল দিগন্তজোড়া মাঠ। সেই মাঠে প্রতিদিন নিয়ম করে খেলতে যেতেন।
বর্তমানে রাজধানীর ইস্কাটন গার্ডেনে একটি পনের তলা অ্যাপার্টমেন্ট-বাড়ির দোতলায় সস্ত্রীক থাকছেন। ফ্ল্যাটের ভেতরটা দেখলে মনে হবে যেন একটা গোটা লাইব্রেরি। বাড়ির প্রবেশপথে ঢুকতেই একটা সরু করিডোর। করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেই সুসজ্জিত ড্রইংরুম। ড্রইংরুমে বেশ কয়েকটা চিত্রকর্ম। প্রয় সবগুলো দেয়াল ঘেঁষে সাজানো অজস্র বই। প্রথম দেখায় বসার ঘর না ভেবে একটা ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ভেবে ভুল করতে পারেন  যেকেউ। বাড়ির অন্য ঘরগুলো বেশ সাদামাটা। মাত্রাতিরিক্ত কোনো আসবাবও নেই সেখানে। তার স্ত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষকও তার মতোই সাদামাটা জীবন যাপন করেন। ফলে গোটা বাড়িটাই বেশ ছিমছাম, রুচিশীল। বাড়িজুড়ে একটা প্রাণের ছোঁয়া আছে। প্রবীণ বয়সে এসেও পেশাগত কারণে তাকে প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াতে হচ্ছে দেশ-বিদেশে। গত কয়েকবছর ধরে ড. খলীকুজ্জমান আহমদ পিকেএসএফ থেকে একটি বিশেষ প্রজেক্ট ‘সমৃদ্ধ বাড়ি’ নিয়ে কাজ করছেন। বলাবাহুল্য, এই প্রজেক্টটি বেশ সফল হয়েছে। এই প্রজেক্টের সাফল্যের জন্য তিনি ইতোমধ্যে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছেন। প্রজেক্টের মূল থিম হচ্ছে যেকোনো মানুষ তার বসতবাড়িকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারেন। একটা সমৃদ্ধ বাড়ির বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, বাড়ির পতিত জায়গায় ফল ও সবজি এবং ঔষধি গাছ লাগাতে হবে। এছাড়া হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, কবুতরসহ অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখি পালন করে আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে। গবাদি পশুর বিষ্ঠা থেকেই প্রাকৃতিক সার উৎপাদন সম্ভব, যা স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে উপকারি। এছাড়া প্রতিটি বাড়িতে একটি পুকুর থাকবে, যেখানে মাছের চাষ করে পরিবারের দৈনন্দিন মাছের চাহিদা মিটিয়ে মাছ বিক্রি করে আর্থিক স্বছলতা পাওয়া সম্ভব। এই সমৃদ্ধ বাড়ির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, প্রতিটি বাড়িতে ন্যূনতম একটি নিমগাছ ও সজনেগাছ থাকতে হবে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারি।  এছাড়া বাড়িতে অবশ্যই স্যানিটেশন-ব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ খাবারযোগ্য সুপেয় পানির জন্য টিউবওয়েলের ব্যবস্থা  অথবা জলকুপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
মানব উন্নয়নে তথা সমাজে যোগ্য মর্যাদা পেতে এবং মানবিক জীবনযাপনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কোনো বিকল্প নেই। তাই পিকেএসএফ-এর প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ একটি বাড়িতে বসবাসকারীদের জন্য আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে এই বিশেষ প্রজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু হয়। তিনি মনে করেন সারা বাংলাদেশে সমৃদ্ধ বাড়ির এই ধারণাকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।

NO COMMENTS

Leave a Reply