Home মূল কাগজ প্রচ্ছদ বাণিজ্যিক স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে নতুন ধারা

বাণিজ্যিক স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে নতুন ধারা

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম এবং বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় দুই কোটি। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর মতিঝিল ছিল ঢাকার প্রধানতম বাণিজ্যিক এলাকা। পাকিস্তান আমলের শুরুতে ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট গঠন করা হয়, যা ‘ডিআইটি’ নামে বহুল পরিচিত। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারকে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে দেখানো হয়। গুলশান-বনানী, উত্তরাকে তখন বিবেচনা করা হয় আবাসিক এলাকা হিসেবে। স্বাধীনতার পূর্ববতী সময়ে এবং পরবর্তী কয়েক দশক মতিঝিলকে ঘিরে আবর্তিত হতো দেশের সব ব্যবসা-বাণিজ্য। ব্যাংক-বীমাসহ বড় বড় বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অফিসগুলো সব মতিঝিলেই ছিল।
দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে এবং অর্থনীতি বিকশিত হলে মতিঝিল ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক এলাকা বিস্তৃত হয় গুলশানে। এক সময় অভিজাত আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত থাকলেও গুলশান এখন বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা। অনেক বহুজাতিক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা এখন গুলশানে। নামি-দামি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিসসহ এখানে গড়ে উঠেছে খ্যাতনামা অনেক করপোরেট অফিস।
পুরনো স্থাপত্যশৈলীর বদলে এসব করপোরেট অফিসের নির্মাণশৈলীতে ব্যবহৃত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। শুধু কংক্রিট-স্ট্রাকচারের বদলে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গ্লাস, কংক্রিট ও স্টিলের সংমিশ্রণে আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত অত্যাধুনিক সব বাণিজ্যিক ভবন। গুলশান অ্যাভিনিউয়ে রাস্তার দু’পাশে দেখা মিলবে সারি সারি ঝা-চকচকে আধুনিক সব বাণিজ্যিক বহুতল ভবন। যার বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে কংক্রিট, গ্লাস ও স্টিলের সমন্বয়ে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্থাপনার স্থাপত্যশৈলীতে যে নতুন ধারার সূচনা হয়েছে, আধুনিক বাণিজ্যিক ভবনগুলো দেখলে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। একসময়ের পাট ও চা রফতানিনির্ভর অর্থনীতি মোকাম বা গদিঘর ছেড়ে এখন ঝা-চকচকে আলিশান সুসজ্জিত করপোরেট ভবনে ঠাঁই করে নিয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশমান এই দিকটি লক্ষ্য করলেই উত্থান-পর্বটা সহজেই টের পাওয়া যায়।
১৮৫০ সালে নির্মাণশিল্পে প্রথমবারের মতো বৃহৎ আকারে গ্লাসের ব্যবহার শুরু হয়। ইংল্যান্ডের হাইড পার্কে ক্রিস্টাল প্রাসাদ নির্মাণে প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে গ্লাস ফ্রেম ও স্টিলের অবকাঠামো ব্যবহার করা হয়। প্রাসাদটি নির্মাণে সে-সময় তিন লাখ কাচের টুকরো ব্যবহৃত হয়েছিল। কাচের বড় বড় প্যানেলের সঙ্গে লোহার ফ্রেমগুলো সেট করে সেগুলো থেকে প্রাসাদটির দেয়াল এবং সিলিং তৈরি করা হয়েছিল। কাচের প্যানেল ও স্টিলের ফ্রেম দিয়ে নির্মিত প্রাচীন ক্রিস্টাল প্রাসাদের সঙ্গে হাল-আমলের গ্লাস স্ট্রাকচার ও স্টিল স্ট্রাকচারের মিল রয়েছে।
যদিও স্টিল আবিষ্কারের শতাব্দী পূর্ণ হতে চলল, তবুও নির্মাণশিল্পে স্টিলের ব্যবহার খুব বেশি পুরনো নয়, বিশেষত বহুতল ভবনে স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার। ১,৮০০ দশকের শেষদিকে বহুতল ভবন নির্মাণে প্রথম স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার শুরু হয়। বিশ শতকের শুরুর দিকে স্টিল স্ট্রাকচার নির্মিত বহুতল ভবন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বহুতল ভবনে গ্লাস স্ট্রাকচারের ব্যবহার বেশ পুরনো হলেও একদম নিরুপায় না হলে স্টিল স্ট্রাকচার ব্যবহারের পক্ষপাতি নন স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ। তিনি কারিকাকে বলেন, ‘স্টিল বিল্ডিং সেসব জায়গায় ব্যবহার করা উচিত, যেখানে মাটির বহনক্ষমতা কম। ঢাকার সয়েল খুব ভালো। আর ঢাকায় পনের-বিশতলা ভবনকেই আমরা বহুতল ভবন মনে করে থাকি। সেক্ষেত্রে স্টিল বিল্ডিং করার কোনো অবকাশ নেই, দরকারও নেই। ভবন নির্মাণে স্টিল স্ট্রাকচারের যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও কম নয়। কংক্রিটের তুলনায় স্টিল খুব ব্যয়বহুল। আমরা যে অবস্থানে এখন আছি, তাতে এখনো আমরা স্টিল ব্যবহারে বাধ্য নই। স্টিল স্ট্রাকচারের বিল্ডিংয়ে অগ্নিপ্রতিরোধক একটা প্রলেপ (ফায়ার কোটিং) দিতে হয়। ফায়ার কোটিং দেয়াটা খুব ব্যয়বহুল।’
ওয়ান এলিভেনে টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার ঘটনা স্মরণ করে মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, ‘আমরা দেখেছি টুইন টাওয়ারের স্টিল স্ট্রাকচারের বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে খুব সহজে সেটা ধসে পড়েছিল। তাপমাত্রায় স্টিল প্রসারিত হয়ে বিম ঝুলে পড়ে নাট-বল্টু খুলে সব একসঙ্গে কলাপস করার ঝুঁকি থাকে।’
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুউচ্চ ভবন নির্মাণে স্টিলের বদলে কংক্রিট বেশি উপযোগী বলে মনে করেন তিনি। কংক্রিটের আরসিসিতে স্টিল ব্যবহার করা হচ্ছে উল্লেখ করে মুস্তাফা খালিদ পলাশ বলেন, ‘কংক্রিটের সুবিধা হচ্ছে, এটি একটি কম্প্রিহেনসিভ ম্যাটেরিয়াল। সেই কম্প্রিহেনসিভটা কংক্রিট নিতে পারে। আবার স্টিল ভেতরে যেটা থাকে, সেটা টেনশাইল ম্যাটেরিয়াল। স্টিল টেনশাইল বহন করে। স্টিল ও কংক্রিট যুগপৎভাবে একটা স্ট্রাকচারকে ধারণ করে।’
আমাদের জলবায়ু, আর্দ্র আবহাওয়া, অগ্নিপ্রতিরোধমূলক জ্ঞানের অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি বহুতল ভবনে স্টিল স্ট্রাকচারের ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘এফআর টাওয়ারের অগ্নিদুর্ঘটনা যদি কোনো স্টিল বিল্ডিংয়ে ঘটত, তাহলে হয়তো পুরো দালানটিই ধসে পড়ত।’
রাজধানীর গুলশানে গড়ে উঠছে হাল আমলের অন্যতম করপোরেট ডেস্টিনেশন বিটিআই ল্যান্ডমার্ক। মুস্তাফা খালিদ পলাশের স্থাপত্য-নকশা করা বিটিআই ল্যান্ডমার্ক বাণিজ্যিক ভবন সম্পর্কে তিনি কারিকাকে বলেন, ‘বিটিআই ল্যান্ডমার্কে সহজ লাগসই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটিতে কংক্রিটের পাশাপাশি যেসব কাচ ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো লোই কাচ। লোই কাচ তাপ প্রতিরোধ করে। স্যান্ডউইচ গ্লাস হওয়ার ফলে বাইরের তাপ ভেতরে ঢুকছে না, ভেতরের তাপ বাইরে বের হচ্ছে না। এতে করে বিদ্যুৎ খরচ কম হয়। এয়ার কন্ডিশনিং লোডটা কম পড়ে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন তৈরি পোশাক, চামড়া, সফটওয়্যার, কনজিউমার গুডস, টেলিযোগাযোগ, ফার্মাসিউটিক্যাল ও গ্যাসের মতো বিকাশমান সেক্টরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। সেই সঙ্গে করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অফিসগুলোর স্থাপত্যনকশাতেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, যা বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্থাপনায় নতুন ধারা যোগ করেছে।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply