Home মূল কাগজ বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়তে কাজ শুরু করেছি : মেয়র আ জ ম নাছির...

বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়তে কাজ শুরু করেছি : মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন আ জ ম নাছির উদ্দীন। একই বছরের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে শপথ গ্রহণ এবং ২৬ জুলাই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২৫ জুলাই পূর্ণ হলো দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর। এক বছরে গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কারিকা’র মুখোমুখি হয়েছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
সাক্ষাৎকার আবদুল্লাহ আল মামুন

সিটি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হলো। কেমন উপভোগ করেছেন?
এক বছর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এবার পুরোদমে কাজ শুরু করার পালা। তবে আমি বসে থাকিনি। একটি বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে রাত-দিন কাজ করেছি। সিটি করপোরেশনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছি। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছি। দীর্ঘদিনের জমে থাকা জঞ্জাল দূর করেছি। কিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কিছু শুরুর পথে। আশা করছি বাকি সময়ে আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব।

এক বছরের গৃহীত কাজকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আসলে মূল্যায়ন বা বিচারের জন্য এক বছর যথেষ্ট সময় নয়। তবুও কিছু কাজ তো করেছি। চট্টগ্রাম পাহাড়ে ঘেরা সুবজ নগর। দীর্ঘদিন বিলবোর্ডের জঞ্জালে ঢাকা ছিল এই সবুজ নগর। বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বিলবোর্ডগুলো অপসারণ করেছি। এখন চারিদিকে অবারিত সবুজ। এ নগর আর বিলবোর্ডের জঞ্জালে ভরে উঠতে পারবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে ১১৬টি খাল থেকে প্রায় ২০ হাজার ঘনমিটার মাটি ও আবর্জনা উত্তোলন করা হয়েছে, যা অতীতে কখনও হয়নি। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে দিনের পরিবর্তে রাতে আবর্জনা পরিষ্কার কাজ শুরু করেছি। ১ আগস্ট থেকে ঘরে ঘরে গিয়ে আবর্জনা সংগ্রহ করা হবে। প্রাথমিকভাবে ৭টি ওয়ার্ডে শুরু করা হবে। পরবর্তীতে পাঁচ ধাপে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে তা বাস্তবায়ন করা হবে। নগরের বিভিন্ন মোড় আলোকিত করতে ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নগরের ১৭৫টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মেটাল হ্যালাইড বাতি স্থাপন করা হয়েছে। ৭৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক আলোকায়নের আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে ৬০ কিলোমিটার সড়ক কার্পেটিং করা হয়েছে। কাঁচা রাস্তা পাকা করা হয়েছে ২৭ কিলোমিটার। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৭৭ জন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশন পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ফি ৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে প্রতিবন্ধী কর্নার ও দন্ত্য বহির্বিভাগ চালু করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নত পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষা নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। থমকে থাকা আবাসন প্রকল্পগুলোসহ আয়বর্ধক প্রকল্পগুলো সচল করা হয়েছে। নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ে তোলার জন্য একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে চট্টগ্রামকে সাজিয়ে তুলবেন। এর বাইরেও অনেকগুলো পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখন এক বছর কী করেছি তার বিচারের ভার নগরবাসীর হাতে।

নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এক বছরে নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে কী করেছেন?
তাৎক্ষণিকভাবে চাইলে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ। তবুও নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরের ১১৬টি খাল থেকে মাটি উত্তোলন করা হয়েছে। নালা-নর্দমা পরিষ্কার করা হয়েছে। যার কারণে এবার ভয়াবহ জলাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়নি। পানি উঠলেও স্থায়ী হয়নি। খুব দ্রুত নেমে গেছে। বহদ্দারহাটের বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত নতুন খাল খননের কাজ এ অর্থবছরে শুরু হবে। নতুন আরও দুটি খাল খননের প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সংসদ সদস্য জিয়াউদ্দিন বাবলুর সঙ্গে আলোচনা করে মদুনাঘাট থেকে নেভাল পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর পাড়ে বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২৬টি খালের মুখে স্লুইচ গেট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের সহায়তায় বাস্তবায়ন করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশকে কমে যাবে। পাহাড়ঘেরা এ শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা সিলট্রেশন। বৃষ্টি হলেই বৃষ্টির পানির সঙ্গে বালি ও মাটি এসে খাল-নালা ভরাট হয়ে যায়। তাই জাইকার অর্থায়নে পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

‘ক্লিন সিটি, গ্রিন সিটি’ ছিল আপনার স্লোগান। এ স্লোগান বাস্তবায়নে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
ক্লিন সিটি গড়তে ইতোমধ্যে নগরীকে বিলবোর্ডমুক্ত করা হয়েছে। এখন চট্টগ্রামের যেদিকে তাকান সবুজ দৃশ্য আপনার চোখে পড়বে। রাতের বেলা আবর্জনা অপসারণ করায় ভোরে চট্টগ্রাম নগর থাকে ঝকঝকে-তকতকে। পূর্ণাঙ্গ ক্লিন সিটি গড়ে তুলতে নগরবাসীদেরও সচেতন হতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ডোর টু ডোর আবর্জনা সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হবে। এটি সফল হলে আশা করছি ক্লিন সিটির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে চট্টগ্রাম। আর গ্রিন সিটি গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার সঙ্গে সিটি করপোরেশনের চুক্তি হয়েছে। তারা আগামী দুই বছরের মধ্যে সড়কের দুইপাশে ফুটপাত ঘেঁষে বাগান এবং সবুজায়ন করবে। এছাড়া রাস্তার মোড়ে আধুনিক ফোয়ারা স্থাপন, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, সড়কের দুইপাশে হালকা নান্দনিক বিন স্থাপন, মোড়ের কাছাকাছি আধুনিক যাত্রী ছাউনি নির্মাণ ও শৌচাগার নির্মাণসহ নান্দনিক চট্টগ্রাম বাস্তবায়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।

চট্টগ্রাম নগরের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ কী পরিকল্পনা রয়েছে আপনার?
বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে তিন বছরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে তিন অর্থবছরে শতভাগ উন্নয়ন করা হবে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নগরীকে বিউটিফিকেশনের আওতায় আনা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে এলইডি লাইটিংয়ের মাধ্যমে পুরো নগরীকে আলোকায়ন করা হবে। এছাড়া পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সব কাঁচা ও ইটের রাস্তা কার্পেটিং করা। ভঙ্গুর সেতু-কালভার্ট মেরামত ও সংস্কার। বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন সেতু ও রাস্তা নির্মাণ। খাল খনন প্রকল্প, ভূমি ও পাহাড়ের ক্ষয়রোধে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ। সড়ক দ্বীপ বনায়ন, ফুটপাত উন্নয়ন, যাত্রী ছাউনি ও গণশৌচাগার ইত্যাদি নির্মাণ। সাহায্য সংস্থার অর্থায়নে স্মার্ট সিটি, খাল খনন ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন। এসব পরিকল্পনা ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে ৪০ ভাগ, ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ৫০ ভাগ এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে অবশিষ্ট ১০ ভাগ বাস্তবায়ন করা হবে। এছাড়া নগরের উন্নয়নে ছয়টি মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম হবে সত্যিকার অর্থে একটি আধুনিক ও মডেল নগরী।

মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
কারিকাকেও ধন্যবাদ।

NO COMMENTS

Leave a Reply