Home বাজার দর অন্যান্য বাড়ছে সিলিন্ডার-দুর্ঘটনা

বাড়ছে সিলিন্ডার-দুর্ঘটনা

মজুদ, পরিবহন ও ব্যবহারে মানা হচ্ছে না নিয়ম

কারিকা প্রতিবেদক
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ সাইফুল ইসলাম ওরফে রুবেল মারা যান গত বছরের ৬ নভেম্বর। একই ঘটনায় রুবেলের স্ত্রী সাজেনা আখতার আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চলতি বছরের ২৩ মে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে গাজীপুরে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু হয়। সম্প্রতি গ্যাস সিলিন্ডারজনিত অগ্নিদুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে সিলিন্ডার-ব্যবহারকারীদের মনে। এ-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বেড়ে গেলেও সিলিন্ডার বিক্রি, পরিবহন, মজুদ ও ব্যবহারে সচেতনতার অভাব এবং বিধিমালার তোয়াক্কা না করার বিস্তর অভিযোগ আছে। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ও ব্যবহারকারীরা সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম ও সংরক্ষণের উপায় জানেন না। আর যাদের এসব বিষয় দেখভালের কথা, তারাও জনবল সংকটের অজুহাতে দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, গ্যাস সিলিন্ডারের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে কোম্পানিগুলোকে আরও সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে, বাড়াতে হবে সংশ্লিষ্ট দফতরের তদারকি ও নজরদারি।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাস সিলিন্ডার প্রস্তুতকারক কোম্পানির মূল ডিলাররা সরকারি বিধি মেনে মজুদ, পরিবহন ও সরবরাহ করলেও খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকেই এসব নিয়মের ধার ধারছেন না। মগবাজার ও পুরান ঢাকার বেশিরভাগ এলাকায় সিলিন্ডার বিক্রির দোকানগুলো গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবনের নিচে। এসব দোকানে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপক-ব্যবস্থা। আবাসিক ভবনের নিচেই তারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাস সিলিন্ডার মজুদ করছেন। এছাড়া ফুটপাত ও রাস্তার ওপরও দোকানিরা গ্যাস সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখছেন।
রাজধানীর বিমানবন্দর ও মহাখালী এলাকার বিভিন্ন খাবারের হোটেল ও চায়ের দোকানগুলোতে দেখা যায়, চুলার একেবারে কাছাকাছি রেখে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। কেউ কেউ সিলিন্ডার মাটিতে শুইয়ে রেখে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহার করছেন।
বড় মগবাজারের লতিফ সরদার লেনে গিয়ে দেখা যায়, একটি রঙের দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। দোকানের সামনে দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রঙে কয়েকটি বড় ক্যানের সঙ্গে রাখা হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। দোকানটির ভেতরে রঙ ও রঙের কাজে ব্যবহৃত নানা ধরনের কেমিক্যাল রয়েছে। এ ছাড়াও সেখানে বিক্রি হচ্ছে গ্যাসের চুলাসহ হার্ডওয়্যারের বিভিন্ন পণ্য। দোকানের ভেতরে রঙের পাশেই রাখা হয়েছে ১২ কেজি ওজনের নয়টি গ্যাস সিলিন্ডার। শুধু তা-ই নয়, এসব সিলিন্ডারের ওপরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাখা হয়েছে বিভিন্ন মালামালও। দোকানের মালিক সিদ্দিকুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের এটা হার্ডওয়্যার ও রঙের দোকান।’ গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘রঙের ব্যবসার পাশাপাশি বিক্রির জন্য কয়েকটি সিলিন্ডার রাখা হয়েছে।’ দোকানে অগ্নিনির্বাপক কোনো যন্ত্র আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, নেই’।
একই এলাকার একটি আবাসিক ভবনের নিচে দেখা যায়, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির আরও দুটি দোকান পাশাপাশি। দুটি দোকানেই বেশকিছু সিলিন্ডার রাখা আছে। তবে এ দুটি দোকানে সামান্য কিছু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দেখা গেল। আলাপে দোকান-কর্মচারী রাজু জানান, দোকানে ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকলেও তিনি এটির ব্যবহার জানেন না। গ্রাহকরা ফোন করলে তারা সাইকেলে করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্রাহকের বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে আসেন।
অনুমোদন ছাড়াই রঙের মতো দাহ্য পদার্থের দোকানে বিক্রি হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাস। সিলিন্ডার বিক্রি ও মজুদের বিষয়ে বিস্ফোরক পরিদফতরের কোনো অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে নাদিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক খুরশেদ মিয়া বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স আছে। কিন্তু বিস্ফোরক পরিদফতর লাইসেন্স দেয় নাই। অনেক টাকা লাগে। আর ছোট জায়গা বলে তারা লাইসেন্সও দেয় না।’
এদিকে, বিমানবন্দর এলাকার গোলচত্বরে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের পেছনে রয়েছে কয়েকটি খাবার হোটেল। সরেজমিনে দেখা যায়, হোটেলের বাইরে একটি বড় গ্যাস সিলিন্ডার আড়াআড়িভাবে মাটিতে ফেলে রেখে ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার-বিধিতে বলা আছে, কখনও উপুড় বা কাত করে নয়, সিলিন্ডার খাড়াভাবে রেখে ব্যবহার করতে হবে।
গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে কিনা জানতে চাইলে ওই খাবার হোটেলের ম্যানেজার রূপক বলেন, ‘আইনা চাবি দেই, পরে আগুন জ্বালাই। প্রয়োজন শেষ হলে বন্ধ করে দিই। কাইত কইরা রাখলে পইরা যাওয়ার রিস্ক থাকে না।’

গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালায় যা আছে
‘গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা ১৯৯১’-তে বলা হয়েছে, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়ের জন্য কমপক্ষে পাকা ফ্লোরসহ আধাপাকা ঘর থাকতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা-সংক্রান্ত লাইসেন্স ও ছাড়পত্রসহ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার এক্সটিংগুইশার এবং মজবুত ও ঝুঁকিমুক্ত সংরক্ষণাগার থাকতে হবে।
সিলিন্ডার আমদানির বিষয়ে বিধির তৃতীয় পরিচ্ছেদে বলা আছে, লাইসেন্স ছাড়া সিলিন্ডার আমদানি নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তি বিনা লাইসেন্সে গ্যাসপূর্ণ বা খালি সিলিন্ডার আমদানি করতে পারবেন না।
সিলিন্ডার পরিবহনের বিষয়ে বিধিমালার চতুর্থ পরিচ্ছেদে বলা আছে, গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার কোনো দ্বিচক্রযানে (মোটরসাইকেল, সাইকেল) পরিবহন করা যাবে না। কোনো যানে সিলিন্ডার পরিবহনের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের কোনো অংশ ওই যানের বাইরে থাকা চলবে না। যানের যে অংশে সিলিন্ডার রাখা হয়, সে অংশে কোনো ধারালো বস্তু থাকবে না।
বিধিমালার সপ্তম পরিচ্ছদে সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি ও গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুদ রাখার বিষয়ে বলা আছে, লাইসেন্স ব্যতীত সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি ও সংরক্ষণ নিষিদ্ধ। বিধি-৪১-এর বিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বিনা লাইসেন্সে সিলিন্ডারে গ্যাস ভর্তি করতে পারবেন না অথবা গ্যাসপূর্ণ কোনো সিলিন্ডার তার অধিকারে (মজুদ) রাখতে পারবেন না।
এ প্রসঙ্গে কথা হয় মগবাজারের তাজউদ্দিন রোডের ওমেরা গ্যাস সিলিন্ডার কোম্পানির ডিলার মো. লতিফ রেজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডারের ডিলারশিপ নিতে হলে খোলা জায়গা প্রয়োজন। এছাড়া বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স ও নকশা নিয়েই আমরা ব্যবসা করছি। কিন্তু এখন অলিগলিতে খুচরা ব্যবসায়ীরা লাইসেন্স ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছে।’
বিস্ফোরক পরিদফতরের পরিচালক মো. সামসুল আলম বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডারের যারা ডিলার বা সাব-ডিলার রয়েছেন, তাদের অবশ্যই বিস্ফোরক অধিদফতরের লাইসেন্স নিতে হবে। এছাড়া যারা খুচরা ব্যবসায়ী আছেন, তারা বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স ছাড়া ন্যূনতম ১০টি সিলিন্ডার বিক্রি করতে পারবেন। ১০-এর বেশি সিলিন্ডার মজুদ বা বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশও ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
বিস্ফোরক পরিদফতরের লোকবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একটি বিভাগে মাত্র তিন-চারজন করে অফিসার রয়েছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এত কম লোকবল দিয়ে কাভার করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া, অফিসিয়াল কাজের প্রচুর চাপ থাকে। তাই মাঠপর্যায়ে সব সময় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ যদি আমাদের সহায়তা না করে, তবে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হয়ে যাবে।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, ‘সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনার হার আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ বিষয়ে মানুষের সচেতনতার অভাবেই দুর্ঘটনা ঘটছে।’
এজন্য ব্যবহারকারীদের প্রতি ছয় মাসে সিলিন্ডারগুলো মনিটর করার ওপর জোর দেন ডা. সামন্তলাল।

NO COMMENTS

Leave a Reply