Home বাজার দর অন্যান্য বায়ুদূষণের দায়ে জেল-জরিমানার বিধান আসছে

বায়ুদূষণের দায়ে জেল-জরিমানার বিধান আসছে

কারিকা প্রতিবেদক
বায়ুদূষণের মাত্রায় লাগাম টানতে দেশে প্রথমবারের মতো বায়ুদূষণবিরোধী আইন করতে যাচ্ছে সরকার।
‘নির্মল বায়ু আইন’ শিরোনামের আইনের মাধ্যমে বায়ুদূষণকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে যেতে চায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
খসড়া আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বায়ুদূষণের অপরাধ প্রমাণিত হলে দুই বছরের কারাদন্ড অথবা অনূর্ধ্ব ২ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইনটি পাস হলে প্রথমবার শাস্তি ভোগ করার পর আবার বায়ুদূষণ করা হলে দুই থেকে দশ বছর পর্যন্ত কারাদন্ড দেওয়া হবে। জরিমানা গুনতে হবে ২ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে। কিংবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হতে হবে। তৃতীয়বার একই অপরাধ করলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ও পরিবেশ আদালত- এই তিনটি আদালতে বায়ুদূষণের মামলা চলবে। খসড়া আইনটি তৈরি করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা)।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইনটি বাস্তবায়ন করা কতটা সহজ হবে- জানতে চাইলে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন অসংখ্য আইন আছে। আইনে কঠোর শাস্তির কথাও বলা আছে। কিন্তু আইন বাস্তবায়িত হয় না। আমরা ভারত, ভিয়েতনামসহ কয়েকটি দেশের বায়ুদূষণ আইন পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘নির্মল বায়ু আইন’টির খসড়া তৈরি করে দিয়েছি। দেখার বিষয়, আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন হয় কিনা। আমরা চাই, যারা বায়ুদূষণ করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সেটা বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব সরকারের।’
বায়ুদূষণের অপরাধী চিহ্নিত করার উপায় সম্পর্কে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, আইনের মাধ্যমে সরকার প্রথমে বায়ুদূষণের মানমাত্রা ঠিক করে দেবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরকারের বেঁধে দেওয়া মানমাত্রা অতিক্রম করলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। আইনটি পাস হওয়ার এক বছরের মধ্যে সরকার বায়ুদূষণের মানমাত্রা, এর পদ্ধতি ও মানদন্ড নির্ধারণ করে দেবে। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তি- যারা-ই নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে বেশি বায়ুদূষণ করবে, তাদের একটি তালিকা করা হবে। সেই তালিকা ধরে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
জানা গেছে, খসড়া আইনটি নিয়ে গত মাসে দিনভর বৈঠক হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরে। খসড়াটি পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে সংসদীয় কমিটি হয়ে পাঠানো হবে মন্ত্রিসভায়। তার আগে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বেশ কয়েকটি দিক বিবেচনা করে অর্থদন্ড কিংবা কারাদন্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। প্রথমেই দেখা হবে ওই ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বায়ুদূষণের পেছনে অবহেলা ও অসাবধানতার মাত্রা কতটা। জনস্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও পরিবেশের জন্য ওই অপরাধ কতটা প্রভাব রাখছে- এসব দিক বিবেচনা করে শাস্তি দেওয়া হবে। তবে দ্বিতীয়বার শাস্তি পাওয়ার পরও যদি কেউ বায়ুদূষণ করে তাহলে তার ওই শিল্প-কারখানা কিংবা প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে কোন কোন খাত থেকে বায়ুদূষণ হয় এবং কাদের এই আইনের আওতায় আনা হবে, সে বিষয়ে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ইটভাটা, সিমেন্ট, বয়লার, ইস্পাত, লৌহ ও ঢালাই, অ্যালুমিনিয়াম, কাগজ, চামড়া, ওষুধ, সার, ব্যাটারি, রাসায়নিক, সিরামিক, কাচ, বর্জ্য, চুল্লি, কাঠ, কয়লা ও জাহাজভাঙা শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের এই আইনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া যানবাহন, ইঞ্জিন শক্তি, অভ্যন্তরীণ নৌযানের সঙ্গে যুক্তদেরও এই আইনের আওতায় আনা হবে।
এই আইনের আওতায় কোনো কোম্পানি নির্ধারিত মানমাত্রার বেশি বায়ুদূষণ করলে অপরাধটি সংঘটনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত সব ব্যক্তি দায়ী হবে। তাদের বিরুদ্ধে যথারীতি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন, অপরাধটি তার অজ্ঞাতসারে হয়েছে বা অপরাধটি না হওয়ার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, তাহলে তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না। কোনো শিল্প-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে সরকারের বেঁধে দেওয়া মানমাত্রার চেয়ে বেশি পাওয়া যায় এবং সেখানে যদি প্রমাণিত হয় ওই অপরাধটি ওই কোম্পানির পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও সচিবের সম্মতি এবং যোগসাজশে হয়েছে, তাহলে তাকে যথারীতি আইনি প্রক্রিয়ায় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রেও একই বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, ‘বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে শক্ত কোনো ধারা নেই। শুধু বলা আছে, কেউ বায়ুদূষণ করলে পরিবেশ অধিদপ্তর ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বায়ুদূষণ বন্ধ করতে লিখিত নির্দেশ দিতে পারে। কিন্তু সরকার চায় একটা শক্ত আইন। যে আইনে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা যায়। আইনটি পাস হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্ষমতা আরও বাড়বে।’
খসড়া আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আইনের মাধ্যমে একটি বায়ুমান উন্নয়ন তহবিল গঠন করবে সরকার। সে তহবিলে টাকা আসবে সরকারের বাজেট অনুদান, বায়ুদূষণকারী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া জরিমানা এবং আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পাওয়া অনুদান থেকে। এই তহবিলের টাকা দিয়ে অভিযান, মামলা পরিচালনা করা হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি বায়ুদূষণ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর গুণগত মান রক্ষা ও উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখে, তাহলে সরকার সেই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করবে।
সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ৩০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭তম। বিশ্বের সবচেয়ে বায়ুদূষিত শহরের তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম। ২০১৮ সালের বায়ুদূষণের মাত্রা নিয়ে চলতি বছরের মার্চ মাসে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি সংস্থা এয়ারভিজ্যুয়াল ও গ্রিনপিস। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর বায়ুদূষণ রোধে নড়ে-চড়ে বসেন নীতিনির্ধারকরা। এরপরই বায়ুদূষণ রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। রাজধানীতে বছরজুড়েই খোঁড়াখুঁড়ি করে ওয়াসাসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এতে বায়ুদূষণ হয় মারাত্মকভাবে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৮ শতাংশ বায়ুদূষণ হয় ইটভাটা থেকে, যেসব ইটভাটা পরিচালনা করেন রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। ফলে নতুন আইন পাস হলেও এটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে পরিবেশবাদীদের মধ্যে।

NO COMMENTS

Leave a Reply