Home ফিচার বায়ু দূষণে ওষ্ঠাগত ঢাকার প্রাণ

বায়ু দূষণে ওষ্ঠাগত ঢাকার প্রাণ

0 151

কারিকা প্রতিবেদক
চোখ বন্ধ করে ভাবুন তো, সকালে উঠে দেখলেন আপনার শরীরে অক্সিজেন ফুরিয়ে এসেছে। সিলিন্ডার প্রায় খালি, কাজে যাওয়ার আগে আপনাকে ছুটতে হচ্ছে অক্সিজেন সংগ্রহ করার দীর্ঘ লাইনে। আমাদের ভাগ্য ভাল যে প্রতিদিনকার শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অক্সিজেন সংগ্রহ করতে আমাদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয় না। পিঠে করে বইতে হয়না অক্সিজেনের ভারী সিলিন্ডার। প্রাকৃতিক নিয়মেই আমরা আশেপাশের সবুজ বৃক্ষরাজি থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করি এবং বিষাক্ত কার্বণ ড্রাই অক্সাইড নিঃসরণ করি। তবে প্রাকৃতিক নিয়মে অক্সিজেন সংগ্রহ করার এই প্রক্রিয়াটাও স্বস্তিকর থাকছে না এখন আর। বিশেষ করে আমরা যারা ঢাকায় থাকি তাঁদের জন্য খবরটি বেশ উদ্বেগের। সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত ৩০ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭তম। বিশ্বের সবচেয়ে বায়ু দূষিত শহরের তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম। ২০১৮ সালে বায়ু দূষণের মাত্রা নিয়ে চলতি বছরের ৫ মার্চ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি সংস্থা এয়ারভিস্যুয়াল ও গ্রিণপিস। পিএম২.৫ র মাত্রা সর্বোচ্চ ১০০ ধরে এ তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই পিএম২.৫ মানুষের ফুসফুসের ক্ষতি ও রক্তপ্রবাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তালিকায় দেশ হিসেবে শীর্ষ অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের বাতাসে পিএম২.৫র গড় মাত্রা ৯৭ দশমিক ১ শতাংশ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তান ও ভারতে এর মাত্রা যথাক্রমে ৭৪ দশমিক ৩ ও ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান ও বাহরাইন। এরপর রয়েছে যথাক্রমে মঙ্গোলিয়া, কুয়েত, নেপাল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও নাইজেরিয়া।
এছাড়াও ২০১৭ সালে প্রকাশিত বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। ঢাকার পরেই রয়েছে পাকিস্তানের করাচি ও চীনের বেইজিং। বৈশ্বিক বায়ু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৯৯০ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত বায়ু দূষণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে ভারত ও বাংলাদেশে।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর সর্বশেষ প্রতিবেদনও বলছে একই কথা, বিশ্বে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। সংগঠনটির তথ্য মতে, বিশ্বের শীর্ষ দূষিত বায়ুর দেশ হিসেবে প্রথম অবস্থানে নেপাল, তারপর পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান ও কঙ্গোর নাম উঠে এসেছে। আর নির্মল বায়ুর দেশ হিসেবে প্রথমে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এরপর রয়েছে বার্বাডোজ, জর্ডান, কানাডা ও ডেনমার্ক।
পরিবেশদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান-বিষয়ক প্রতিবেদনটি গত বছরের জানুয়ারীতে ইপিএ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বিশ্বের ১৮০টি দেশ সামগ্রিকভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় কী ধরনের ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে একটি সূচক তৈরি করেছে। তাতে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৭৯তম স্থানে নেমে এসেছে। ২০০৬ সালে সর্বপ্রথম ওই সূচকটি তৈরি করা হয়েছিল, সে বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৫তম। অর্থাৎ গত এক যুগে দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্প থেকে দেশের আটটি শহরের বায়ুর মান প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়। তাতে দুই মাস ধরে ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরের বায়ুর মান মারাত্মক ও খুব অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর হলো রাজধানী ঢাকা। এরপর রয়েছে রাজশাহী। বরিশাল সবচেয়ে কম দূষিত শহর হলেও এর বায়ু মানমাত্রার চেয়ে খারাপ, অর্থাৎ আশঙ্কাজনক।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন বলছে, বায়ুতে যেসব ক্ষতিকর উপাদান আছে, তার মধ্যে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে মারাত্মক উপাদান হচ্ছে পিএম ২.৫। এত দিন এই উপাদান সবচেয়ে বেশি নির্গত করত চীন। গত দুই বছরে চীনকে টপকে ওই দূষণকারী স্থানটি দখল করে নিয়েছে ভারত। চীন ও ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান।
পিএম২.৫ হচ্ছে এমন এক ধরনের কঠিন বা জলীয় অতি সূক্ষকণা যা আড়াই মাইক্রোন বা তার কম চওড়া। পিএম২.৫ এর কণাগুলো এত সূক্ষ যে খুব সহজেই প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে হার্ট হয়ে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর শ্বাসতন্ত্রের নানাবিধ রোগ যেমন হাঁচি, কাশি, শ্বাসকষ্ট, নাক দিয়ে পানি পড়া থেকে শুরু করে এমন ছোটখাট অসুখ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসসহ হার্ট অ্যাটাক এবং ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা পিএম২.৫ কে ‘জি-১ কার্সিনোজেন ‘ এর তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ এ কণা মানদেহের ক্যান্সার সৃষ্টিতে একদম প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। তাছাড়া, বৃদ্ধ এবং বাচ্চাদের জন্য এ কণা আরো বেশি ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
বায়ু দূষণের কারণে ঢাকার ৪০ শতাংশ বাসিন্দা শ্বাসনালীর রোগে আক্রান্ত বলে জানিয়েছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম। ফ্রেরুয়ারিতে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম আয়োজিত এক মানববন্ধন থেকে এ তথ্য জানানো হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ ,নির্মাণ সামগ্রী খোলা স্থানে ফেলে রাখা, উম্মুক্তভাবে বালু ও মাটি পরিবহন, যানবাহন ও কল কারখানার কালো ধোঁয়ার কারণে বায়ু দূষণ হচ্ছে। ইটভাটা ,মেট্রোরেল ও অনান্য সেবামূলক কাজের জন্য ঢাকার বায়ু দূষণ পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। বায়ু দূষণ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও কার্যকর

NO COMMENTS

Leave a Reply