Home মূল কাগজ নগরোদ্যান বুড়িগঙ্গা তুরাগ উদ্ধারে দ্বিতীয় দফা অভিযান শুরু

বুড়িগঙ্গা তুরাগ উদ্ধারে দ্বিতীয় দফা অভিযান শুরু

নদী দখলকারীরা নির্বাচন ও ঋণ পাওয়ার অযোগ্য/ ‘তুরাগ নদকে’ জীবনসত্তা ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী তীর অবৈধ দখলমুক্ত করতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চ পর্যন্ত অভিযান চালায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রথম দফায় চার পর্বের উচ্ছেদ অভিযানে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে ১ হাজার ৮৪৩টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে।
১২ দিন বিরতির পর গত ৫ মার্চ থেকে বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে দ্বিতীয় দফা উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ জানায়, দ্বিতীয় দফার এ উচ্ছেদ অভিযান চলবে ২৮ মার্চ পর্যন্ত।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীর সংলগ্ন কামরাঙ্গীর চরের হুজুরপাড়া, আশ্রাফাবাদ, সাইনবোর্ড, খোলামোড়া ঘাট, লালবাগ কিল­ার মোড়, শশ্মানঘাট, লোহার ব্রিজ, ঝাউচর ও তুরাগ তীরবর্তী বসিলা ঢাকা উদ্যান ও কেরানীগঞ্জের মধু সিটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। উচ্ছেদ অভিযানে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবনসহ অনেক আধা পাকা স্থাপনা ও সীমানা দেয়াল উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক হাজারীবাগ শাখার নিকট দায়বদ্ধ একটি ভবনও ভেঙ্গে দেয়া হয়।
উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনে এসে নৌ-পরিবহন সচিব মোঃ আবদুস সামাদ নদীতীর উদ্ধার অভিযানে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বনের কথা বলেন। এছাড়া যত প্রভাবশালী লোকই হোক না কেন দল-মত-নির্বিশেষে এবং প্রভাব প্রতিপত্তি বিবেচনা না করে নদীতীরে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ন পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন।
সরেজমিন কামরাঙ্গীর চরের আশ্ররাফাবাদ, হুজুরপাড়া, সাইনবোর্ড, খোলামুড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যেসব জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে সেখানে ভবনের ধংস্বস্তুপ পড়ে আছে। এদিক সেদিক ভবনের ভাঙ্গা ইট সুরকি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, অবৈধ জায়গা উদ্ধার করতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ তাঁদের বৈধ স্থাপনাও ভেঙ্গে দিয়েছে। বৈধ কাগজপত্র থাকলেও বিআইডব্লিউটিএ সেসব দেখেনি এবং উচ্ছেদের আগে তাঁদের নোটিশ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। বসিলা ব্রিজের নিচে একটি আধা-পাকা বাড়ির মালিক জমিলাতুন নেসা অভিযোগ করে বলেন, তাঁর স্বামী জনৈক ইসহাক মিঞার কাছ থেকে ১৯৭৭ সালে আড়াই কাটা জমি কিনেন। তাঁদের কাছে দলিলও আছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে বিআইডব্লিউটিএ অবৈধ স্থাপনা দাবি করে তাঁর বাড়ি ভেঙ্গে দিয়ে গেছে।
ঢাকা নদী বন্দরের যুগ্ন পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর উদ্ধারকৃত জায়গায় ওর্য়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। বৃক্ষরোপন করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পাশাপাশি পথচারীদের বসার জন্য বেঞ্চ থাকবে। বিনোদনের জন্য ৩টি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হবে। এছাড়াও নদীতীর দখল করে যাতে ব্যবসায়িক মালামাল ওঠা-নামা না করতে পারে এজন্য নদীতীরে ১৯টি আরসিসি জেটি নির্মাণ করা হবে।
উদ্ধার অভিযান চলছে কর্ণফুলীতেও
ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ তীরে উদ্ধার অভিযান চালানোর পাশাপাশি চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতেও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে চট্রগ্রাম জেলা প্রশাসন।
৪ ফ্রেরুয়ারি কর্ণফুলী নদীতীরে শুরু হওয়া প্রথম দফার প্রথমদিনের উচ্ছেদ অভিযানে সাম্পান সমবায় সমিতির কার্যালয়, যাত্রী ছাউনি, বিআইডব্লিউটিএ’র লোহার স্থাপনা, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের অবৈধ স্থাপনাসহ প্রায় ৫০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। চট্রগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায় প্রথম দফার ৫ দিনের উচ্ছেদ অভিযানে সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত প্রায় ২৩০টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১০ একর ভূমি। কর্ণফুলী নদীতীরের ভূমি উদ্ধারের পর সেখানে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করছে জেলা প্রসাশন। এরপর দ্বিতীয় দফায় পতেঙ্গা থেকে চাক্তাই পর্যন্ত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মন্নান জানান, সরকারের সবুজ সংকেত পেলে উদ্ধারকৃত জায়গায় বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। ওয়াকওয়ে, বিনোদন কেন্দ্র ও হাতিরঝিলের আদলে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হবে। যেখানে মানুষ স্বস্তির বাতাস নিতে পারবে। মুক্ত থাকবে যান্ত্রিক কোলাহল থেকে।
এদিকে নগরীর মাঝির ঘাট এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরির্দশনে এসে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠা কোনো অবৈধ স্থাপনা থাকবে না। ধীরে ধীরে সব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে। উচ্ছেদ করতে গিয়ে যারা হুমকি দিচ্ছেন তারা কেউ পার পাবে না। হুমকি দিলে উচ্ছেদ অভিযানের গতি আরও বাড়বে।
হাইকোর্টের রায়ে গতি পায় উদ্ধার অভিযান
ঢাকার তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে দেশের সকল নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘মাইলফলক’ এই রায়ে নদী দখলকারীদের নির্বাচন করার ও ঋণ পাওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। নদী রক্ষা কমিশন যাতে নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয় রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে, সেজন্য আইন সংশোধন করে ‘কঠিন শাস্তির’ ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে সরকারকে। পাশাপাশি জলাশয় দখলকারী ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণকারীদের তালিকা প্রকাশ, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ের ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানায় নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিতে বলা হয়েছে হাই কোর্টের রায়ে।
তুরাগ নদী রক্ষায় একটি রিট মামলার বিচার শেষে ৩ ফ্রেরুয়ারি রোববার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের হাই কোর্ট বেঞ্চ ঐতিহাসিক এ রায় দেয়।
হাইকোর্টের এই রায়ের পর বুড়িগঙ্গায় চলমান উচ্ছেদ অভিযান গতি পায়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ছাড়াও দেশের অনান্য নদ নদী উদ্ধারে জোরালো অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে তুরাগ নদীর অবৈধ দখলদারদের নাম ও স্থাপনার তালিকা হাই কোর্টে দাখিল করেছিল বিচার বিভাগীয় একটি তদন্ত কমিটি। ওই তালিকায় আসা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিরা পরে এ মামলায় পক্ষভুক্ত হন।
উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট নদী রক্ষায় গত ৩ ফ্রেরুয়ারি রায় ঘোষণা করে। সেদিন তুরাগ নদীকে ‘লিগ্যাল পারসন’ বা ‘জুরিসটিক পারসন’ ঘোষণা করা হয়, যা দেশের সব নদ-নদীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে রিটকারীপক্ষের আইনজীবী জানান।
‘প্যারেন্স প্যট্রিয়া জুরিসডিকশনের আওতায় আদালত তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা, জুরিসটিক ও লিগ্যাল পারসন হিসেবে ঘোষণা করছে।’ রায়ে বলা হয়েছে, দেশের সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয় রক্ষার জন্য ‘পারসন ইন লোকো পেরেনটিস’ বা ‘আইনগত অভিভাবক’ হবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। ফলে দেশের সকল সকল নদ-নদী খাল-বিল জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সকল দায়িত্ব বর্তাবে নদী রক্ষা কমিশনের ওপর।
এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে ও পত্রিকায় প্রকাশ, জাতীয় বা স্থানীয়- কোনো ধরনের নির্বাচনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ থাকলে তাকে নির্বাচনের অযোগ্য ঘোষণা, দেশের সকল সরকারি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে এক ঘণ্টা ‘নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ’, নদ-নদীর প্রয়োজনীতার বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠদানের ব্যবস্থাসহ নদীরক্ষায় রায়ে আরও কিছু নির্দেশনা দিয়েছে হাইকোর্ট।
রায়ের একটি অনুলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও পাঠাতে বলেছে আদালত, যাতে এ রায়ের ভিত্তিতে তিনি অবৈধ দখলকারী বা স্থাপনা নির্মাণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

NO COMMENTS

Leave a Reply