Home মূল কাগজ সাক্ষাৎকার ভবনের নকশা তদারকির জন্য ‘বিল্ডিং রেগুলেশন বডি’ তৈরি হওয়া উচিত

ভবনের নকশা তদারকির জন্য ‘বিল্ডিং রেগুলেশন বডি’ তৈরি হওয়া উচিত

0 229

ড. মো. মাকসুদ হেলালী
অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। জানতে চাই, সামগ্রিকভাবে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটুকু শক্তিশালী বা দুর্বল বলে মনে করেন?
পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা খারাপ, সেটা বলা যাবে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকায় প্রতি বছর প্রতি লাখে অগ্নিদুর্ঘটনায় একজন মানুষ মারা যায়। রাশিয়াতে এই সংখ্যা সাতজন। ভারতে ১.৮ জন। মালয়েশিয়ায় ০.৪ এবং বাংলাদেশে এই সংখ্যা ০.১ জন। সেই তুলনায় আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার রাশিয়ার সত্তর ভাগের একভাগ, আমেরিকার দশভাগের একভাগ, ভারতের আঠারো ভাগের একভাগ ও মালয়েশিয়ার চারভাগের একভাগ। আমাদের দেশে অগ্নিদুর্ঘটনায় প্রতি লাখে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায়, তার সংখ্যাটা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক কম।

বনানীর এফ আর টাওয়ারসহ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটল। এর পেছনের কারণগুলো কী?
বিশ্বে শতকরা ৬০ ভাগের বেশি অগ্নিকান্ড ঘটে অসতর্কতার কারণে। আমাদের দেশে ইলেকট্রিক্যাল শর্টসার্কিট থেকেই বেশিরভাগ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়ে থাকে। ওয়্যারিংয়ের ভুল, নিম্নমানের ইলেকট্রিক্যাল সরঞ্জামের ব্যবহার, অদক্ষ লোক দিয়ে ওয়্যারিং এবং অতিরিক্ত লোডের কারণে শর্টসার্কিট হয় এবং সেখান থেকে আগুন লাগে। নতুন ভবনের নকশা করার সময় যে ধরনের ওয়্যারিং করা হয়, পরবর্তী সময়ে এর লোড ক্রমান্বয়ে যুক্ত হতে থাকে। লোড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারের সক্ষমতাও যে বাড়াতে হবে, ব্যাপারটা খেয়াল করা হয় না। এ কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। এ ছাড়াও ইলেকট্রিক্যাল গুডসের কোয়ালিটিও অনেক ক্ষেত্রে উন্নত নয়। ইলেকট্রনিকস গুডস কেনার সময়ও আমরা মান দেখে কিনি না।
বাসাবাড়ি ও রান্নাঘরে অগ্নিকান্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের অসতর্কতার কারণেই ঘটে থাকে। সিগারেটের আগুন থেকেও অনেক সময় অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে।

আপনি অগ্নিদুর্ঘটনা কবলিত এফ আর টাওয়ার পরিদর্শন করেছিলেন। ওই ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় কী কী ঘাটতি দেখতে পেয়েছেন?
বহুতল ভবনের অগ্নিপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, ধোঁয়াটা যাতে না ছড়ায়। দ্বিতীয়ত, আগুন লাগার পর মানুষ যাতে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে, সেই ব্যবস্থা বা পথ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আগুন লাগলে দ্রুত শনাক্তকরণ করে ফায়ার অ্যালার্ম বাজতে হবে। এফ আর টাওয়ারে এই তিনটির কোনোটাই ছিল না। আগুন লাগার পর ভবনে ধোঁয়া প্রতিরোধে যে ধরনের ব্যবস্থা থাকার কথা, সেটা এফ আর টাওয়ারে ছিল না। যে কারণে ধোঁয়াটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে গেছে। ভবনের ভুল নকশার কারণে ধোঁয়াগুলো সিঁড়ি, লিফট ও লবিতে চলে এসেছে। এগুলো একটা চিমনি হিসেবে কাজ করেছে। গ্লাসের তৈরি যে ফ্যাকেড ছিল, সেটার ডিজাইনটাও ভুল ছিল। যেভাবে ফ্যাকেডের ডিজাইন করা উচিত ছিল সেভাবে হয়নি। ফলে আগুন এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে ছড়িয়ে গেছে। মানুষের বের হওয়ার জন্য যে জরুরি সিঁড়ি ছিল, সেটা যথাযথ স্থানে ছিল না। কোনো কোনো ফ্লোরে জরুরি ফায়ার এক্সিট বন্ধ ছিল। ফায়ার ডোরসহ ফায়ার সেপারেশন ছিল না। আগুন শনাক্তকরণে ডিটেক্টর, অ্যালার্ম, হাইড্রেন্ট সিস্টেম- এগুলো কিছুই ছিল না।

ফায়ার কোড প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কোথায় বলে মনে করেন?
আমাদের দেশে ‘ভবন নির্মাণ আইন’ বা ফায়ার কোড মানার প্রবণতা তৈরি হয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন মানা হয় না। যারা ভবন তদারকির দায়িত্বে আছেন তারা সবাই অনুমতি দেন শর্ত সাপেক্ষে। কিন্তু শর্তগুলো মানা হলো কিনা- পরে আর তদারকি করা হয় না। ভবনের নকশা জমা দেয়ার পর নকশাতে ভুল আছে কিনা, সেটা বলা হয় না। শুধু শর্ত মেনে ভবন নির্মাণ করার কথা বলা হয়। কারণ ভবনের নকশা বুঝে অনুমতি দেয়ার জনবল নেই। এখন বলা হচ্ছে, ভবনের নকশা তদারকি করার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আউটসোর্সিং করা হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লোকবল থাকতে হবে। যারা দায়বদ্ধ হবে। নকশা তদারকির দায়িত্ব আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হলে দায়বদ্ধতা নিয়ে সমস্যা হবে বলে আমি মনে করি। এ ছাড়াও ভবন ব্যবহারের আগে ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা মানা হয় না। এটা আইনের পরিপন্থী।
আমাদের দেশে সবাই কাজ করে কিন্তু যার যে কাজ সেটা বাদ দিয়ে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত। রাজউক ভবনের নকশা তদারকি না করে বড় বড় ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করে। রেগুলেটরি বডি হিসেবে রাজউকের কাজ হচ্ছে ভবনের নকশা তদারকি করা। ফায়ার সার্ভিসের দায়িত্ব অগ্নিনির্বাপণ- সেই দায়িত্ব তারা যথাযথভাবে পালন করছে। তদারকির দায়িত্ব অন্য কোনো সংস্থাকে দেয়া উচিত। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে বলা আছে, ভবন তদারকির জন্য আলাদা সংস্থা থাকবে। সেই সংস্থা তো তৈরি হয়নি। বিল্ডিং রেগুলেশন বডি তৈরি হওয়া উচিত, যারা ভবন তদারকি করবে। অগ্নিনির্বাপণ ছাড়াও ফায়ার ডিজাইন বোঝার জন্য দক্ষ লোক তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
এছাড়া আমি মনে করি, ভবন অনুমোদনসহ সব নাগরিক সুবিধা প্রদানের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে থাকা উচিত। বাইরের দেশগুলোতে অগ্নিনির্বাপণসহ নগরের সব দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত থাকে।

ধন্যবাদ আপনাকে।
আপনাকেও ধন্যবাদ।

NO COMMENTS

Leave a Reply