Home মূল কাগজ ভালো মানুষ গড়াই লক্ষ্য

ভালো মানুষ গড়াই লক্ষ্য

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ

মির্জা মাহমুদ আহমেদ
চারদেয়ালে ঘেরা প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটক পেরোতেই চোখ জুড়াবে সবুজ মাঠ। অপরিকল্পিত নগরায়ণের চাপে যখন নাগরিক প্রাণ রুদ্ধ, তখন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির খোলা সবুজ প্রান্তর শিক্ষার্থীদের একটুখানি ছোটাছুটির ফুরসত এনে দেয়। মাঠ ধরে একটু এগোলেই মূল ভবনের সামনে ‘বিশ্বজয় ভাস্কর্য’। শিক্ষকের মুষ্টিবদ্ধ হাত যেন শিক্ষার্থীদের জানাচ্ছে বিশ্বজয়ের আহবান।
নিচতলায় শিশুদের ক্লাসরুম, করিডোর, বসার জায়গা সবই রঙিন। যেন রঙিন এক প্রজাপতি রাঙিয়ে দিয়ে গেছে পরম যত্নে। দ্বিতীয় তলা থেকে পঞ্চম তলার প্রতিটি করিডোর সাজানো হয়েছে বিষয়ভিত্তিক আয়োজন দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দিয়ে সাজানো ‘অপরাজেয় বাংলা’ গ্যালারিটি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণসহ সেখানে ঠাঁই পেয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সব উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বাংলাদেশের গুণী কবি-সাহিত্যিকদের জীবনী ও আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো ‘শিল্পাঙ্গন’ গ্যালারি। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘লোক ও কারুশিল্প কর্নার’। আর ‘সুরের ভুবন’ গ্যালারিটি সাজানো হয়েছে বাংলাদেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পীদের জীবনী ও ছবি দিয়ে।
এ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও চলমান উন্নয়ন-কর্মকান্ডের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ও ‘দুর্বার বাংলাদেশ’ গ্যালারিতে। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা তুলে ধরা হয়েছে ‘সশস্ত্রবাহিনী’ নামক গ্যালারিটিতে। অন্যদিকে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়ভিত্তিক মূল বিষয়গুলো সচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে বিজনেস, স্পোর্টস ও লাইসিয়াম গ্যালারিতে।
পুরো প্রতিষ্ঠানের করিডোরগুলো ঘুরে দেখলে জাদুঘর ভেবে বসতে পারেন নতুন কেউ। যেখানে তুলে আনা হয়েছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, গ্রামবাংলার অবারিত রূপসহ সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। জাদুঘরের আদলে সাজানো ইতিহাস-ঐতিহ্যের এমন ছবি দেখে ও বর্ণনা পড়ে গতানুগতিক পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীরা শিখছে-জানছে নিজের মতো করে।
ভালো কাজের স্বীকৃতি আরও ভালো কাজ করার উৎসাহ জোগায়। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা, সহশিক্ষা এবং শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য শ্রেণিশিক্ষকরা গ্রিনকার্ড দিয়ে উৎসাহিত করেন। প্রতি মাসে সর্বোচ্চ-সংখ্যক গ্রিনকার্ড পাওয়া শিক্ষার্থীরা আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে লাভ করে অধ্যক্ষের কাছ থেকে গোল্ডকার্ড।
স্কুল শাখার উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার কারিকাকে বলেন, ‘ভালো শিক্ষার্থী গড়ার পাশাপাশি ভালো মানুষও গড়তে চাই আমরা। তাই পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী শৃঙ্খলা ও নৈতিকতায় ভালো পারফরম্যান্স দেখায় তাদের গ্রিনকার্ড দেয়া হয়। এটি অর্জন করতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে।’ ভালো ফলাফল ও আচরণে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
শায়েলা মনোয়ার জানান, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার কারণে স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অশোভন উক্তি ও আচরণ করে থাকে। এগুলো প্রতিহত করতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড’ গঠন করা হয়েছে। স্কোয়াডের নির্বাচিত প্রতিনিধি নিজেরা অশোভন উক্তি ও আচরণ করে না, অন্য সহপাঠীদেরও এ ধরনের আচরণ থেকে বিরত রাখে।
শিশু-কিশোরদের মনের আঙিনায় কত মধুর স্মৃতিই তো দোলা দিয়ে যায়, স্মরণীয় হয়ে থাকে নানা ঘটনা। অনেকের ভাবুক মনের বিকাশও হয় এ সময়েই। যথাযথ মূল্যায়ন বা পরিচর্চা না পেয়ে সেগুলো হারিয়েও যায় অনেক সময়। তাদের সেই ছোট ছোট ভাবনা ও স্মরণীয় ঘটনাগুলো ‘বন্দি’ করে রাখতে প্রতিষ্ঠানটিতে ‘আইডিয়া প্যাড’ নামে এক অভিনব ডায়েরি লেখার প্রচলন আছে। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্মরণীয় মজার কোনো ঘটনা, ভাবনা, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদি লিখে রাখতে পারে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই যেখানে চক-ব্ল্যাকবোর্ড আর টেবিল-বেঞ্চির কাঠখোট্টা জায়গা; শিক্ষকের চোখ রাঙানি আর কঠোর অনুশাসন সেখানে স্কুলে গ্যালারি, বিনোদন পার্ক, অ্যাম্পিথিয়েটার প্রতিষ্ঠা বা অ্যান্টি বুলিং স্কোয়াড ও আইডিয়া প্যাডের মতো অভিনব উদ্যোগের ভাবনা কার? জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির উপাধ্যক্ষ শায়েলা মনোয়ার জানান, অভিনব এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করেছেন মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মেফতাউল করিম, অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল সৈয়দ এ কে এম সাব্বির আহমেদ ও প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ আহমেদ।
যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি, অত্যাধুনিক শিক্ষা উপকরণ, অভিজ্ঞ শিক্ষকমন্ডলী ও কঠোর শৃঙ্খলার কারণে প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে এ প্রতিষ্ঠানটি। বিগত বছরে অনুষ্ঠিত পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় শতভাগ পাসসহ এ প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ অর্জন করেছে। ২০১৭ সালের এইচএসসি পরীক্ষা এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে সাফল্যের ভিত্তিতে দেশের ৩১টি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের মধ্যে প্রথম রানার-আপ হয়ে সেনাবাহিনীপ্রধান ট্রফি অর্জন করার গৌরব অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠানটির মূল ভবনের সামনে আড্ডা দেয়ার জন্য রয়েছে চমৎকার একটি জায়গা। জানা গেল, দেশের প্রথিতযশা সফল মানুষেরা মাঝে মাঝে এখানে এসে তাদের সফলতার গল্প শুনিয়ে যান। ‘স্বপ্নসিঁড়ি’ নামের এই আয়োজনে সম্প্রতি এখানে এসেছিলেন ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা।
জনবসতির তুলনায় মিরপুরে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম বলে আক্ষেপ ছিল এখানকার বাসিন্দাদের। ২০১৪ সালে মিরপুর সেনানিবাসে ৩.৮৩ একর জমির ওপর মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সেই আক্ষেপ অনেকটাই ঘুচেছে। বর্তমানে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে ভালো মানুষ হওয়ার ব্রত নিচ্ছে চার হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।

NO COMMENTS

Leave a Reply