Home মূল কাগজ আপন আবাস ভাড়া-নৈরাজ্যের সঙ্গে জঙ্গিভীতি ভালো নেই ভাড়াটিয়ারা

ভাড়া-নৈরাজ্যের সঙ্গে জঙ্গিভীতি ভালো নেই ভাড়াটিয়ারা

কারিকা ডেক্সঃ
রাজধানী ঢাকার আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি ‘বাড়িভাড়া’। এই সমস্যা আছে দেশের অন্যান্য মহানগরীতেও। অতিরিক্ত ভাড়া গুনেও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা পরিপূর্ণভাবে না পাওয়ার অভিযোগ ভাড়াটিয়াদের।
ঢাকা মহানগরীর বাসিন্দাদের বড় একটা অংশই বিভিন্ন আবাসিক ভবনে ভাড়ায় থাকেন। এর মধ্যে প্রায় সবাই মধ্যবিত্ত ও নিন্মবিত্ত শ্রেণির। জনসংখ্যার ঘনত্ব থাকায় বাড়িওয়ালারা আছেন সুবিধাজনক অবস্থানে। নিয়ম-নীতি ও আইনের তোয়াক্কা না করে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বেশিরভাগ বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে।
জীবন-জীবিকার তাগিদে ঢাকা মহানগরীতে থাকতে বাধ্য, এমন মানুষেরা বাড়িভাড়া নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য করেন না। তবে অসন্তোষ যে চরমে, তা একটু খোঁজ নিলেই পরিষ্কার বোঝা যায়। এই অসন্তোষের সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে নতুন ঝামেলা। রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়াল দু’পক্ষই আছে অসুবিধায়। বিশেষত ঢাকা শহরের অসংখ্য ব্যাচেলর সবচেয়ে ঝামেলায় রয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া দিতে চেয়েও অনেক এলাকায় বাড়িভাড়া পেতে ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে তাদের।

অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ভাড়াটিয়ারা
রাজধানীর বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ভাড়ার রশিদ না দেয়া, ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি, জোর করে ভাড়াটিয়া তুলে দেওয়াসহ নানা ধরনের অভিযোগ রয়েছে। ভাড়াটিয়ারা জানিয়েছেন, অগ্রিম ভাড়া, বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ কাজের খরচ, ইউটিলিটি বিল নেওয়ার ক্ষেত্রেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছেন না বাড়ি-মালিকরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আগারগাঁও ও রামপুরা এলাকার কয়েকজন ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে। ঢাকা মহানগরীর এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে গত পাঁচ-ছয় বছরে বাড়িভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়নি। অভিজাত ফ্ল্যাটগুলোতে ভাড়া বেড়েছে। তেমনি বেড়েছে বস্তিতেও। গত বছর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে রাজধানীর বাড়িভাড়া আরেক দফা বাড়ান বাড়িওয়ালারা। কোথাও কোথাও আবার ভাড়া বাড়ে ষান্মাসিক হিসেবে!
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ২৪ বছর আগে করা ত্রুটিপূর্ণ আইনের সুযোগে বাড়িওয়ালাদের স্বেচ্ছাচারিতার যেন শেষ নেই। বাড়িভাড়া বাড়ানো নিয়ে নৈরাজ্য ঠেকাতে ১৯৯১ সালে ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ন্ত্রক, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রক ও উপনিয়ন্ত্রক নিয়োগেরও বিধান রাখা হয়েছে আইনে। আইনটি প্রণয়নের পর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকা ও অবস্থানভেদে ভাড়ার হারও নির্ধারণ করে। কিন্তু পরে এসবের কিছুই আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। সর্বশেষ গত বছরের শেষদিকে ‘ছয় মাসের মধ্যে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন’ গঠন করে বাড়িভাড়া নিয়ে বিরোধের কারণ চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
কামাল হোসেন নামের একজন ভাড়াটিয়া জানান, গত বছর সরকারের বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর অজুহাতে বাড়িওয়ালারা নতুন বছরের শুরুতে বর্ধিত ভাড়ার স্লিপ ধরিয়ে দেন। একই তথ্য দেন অন্যরাও। ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ এলাকাভেদে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, তা বাস্তবায়ন হলে সমস্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন তারা। কারণ গ্যাসের দাম বাড়লে বাড়িভাড়াও অনেক বেড়ে যাবে। যদিও বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির মূল্য ভাড়াটিয়ারাই পরিশোধ করেন। এ ধরনের বিল আগে বাড়িভাড়ার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
মূলত বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ভাড়াটিয়াদের জন্য আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছরই বাড়িভাড়া গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণের কোনো উদ্যোগ না থাকায় যে যেভাবে পারছেন ইচ্ছেমতো ভাড়া নির্ধারণ করছেন বাড়িওয়ালারা। বাধ্য হয়েই রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত, গার্মেন্ট শ্রমিকসহ নিন্মবিত্ত আয়ের মানুষকে তাদের কষ্টার্জিত আয়ের বেশিরভাগই বাড়িভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে।
এদিকে বাড়ির মালিকদের কাছে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরের প্রায় পাঁচ কোটি ভাড়াটিয়া জিম্মি হয়ে পড়লেও সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগী হচ্ছে না বলে অভিযোগ ভাড়াটিয়া কল্যাণ সমিতির। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে তারা এ অভিযোগ করেছে। সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, একদিকে লাগামহীন বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও অন্যদিকে যখন-তখন স্বল্প নোটিশে ভাড়াটিয়াদের বাড়িছাড়া করছেন ভবন-মালিকরা। রসিদের পরিবর্তে হাতে হাতে লেনদেন হওয়ায় এ নিয়ে আইনের আশ্রয়ও নেওয়া যাচ্ছে না। গত ২৫ বছরে (১৯৯০ থেকে ২০১৫) ছয়টি বিভাগীয় শহরে বাড়িভাড়া আড়াইশ’ শতাংশ বেড়েছে বলে সংগঠনটির এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়।

ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ারা জটিল সমস্যায়
‘ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া বিপজ্জনক’ ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোর বাড়িওয়ালাদের মনোভাব এখন এমনই। কয়েকমাস আগেও কিছু বাড়িওয়ালা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া পেয়ে খুশি থাকতেন। কারণ ব্যাচেলরদের কাছ থেকে তুলনামূলক বেশি ভাড়া পাওয়া যায়। গণেশ উল্টে যায় ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার পর।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ব্যাচেলরদের ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্ক হতে। গুলশান হামলায় জড়িতরা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাড়ির ফ্ল্যাটে নাম-পরিচয় গোপন করে ভাড়া নেয় এবং বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়ার তথ্য সংগ্রহ করে থানায় জমা দেয়নি। এ অভিযোগে ফ্ল্যাটের মালিকসহ বাড়ির কেয়ারটেকারকে জেলে যেতে হয়। একই ঘটনা ঘটে কল্যাণপুরের অভিযানে জঙ্গি নিহত হওয়ার পরও। ‘জাহাজবাড়ি’ খ্যাত বাড়িটার মালিককে যেতে হয় জেলে। এ দুই ঘটনায় বাড়িওয়ালাদের মনে ঢুকে যায় আতঙ্ক।
তাছাড়া আগে থেকেই পুলিশ ভাড়াটিয়ার তথ্য-সংরক্ষণ ও থানায় জমা দেওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি করছিল। সব মিলিয়ে বাড়িওয়ালারা এখন ব্যাচেলর শুনলেই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছেন। পারতপক্ষে কোনো ব্যাচেলরকে ফ্ল্যাট ভাড়া দিতে চান না তারা। জঙ্গি ইস্যুতে অনেক ব্যাচেলরকে ফ্ল্যাট ছাড়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কাউকে কাউকে ফ্ল্যাট ছাড়তে বাধ্যও করা হয়েছে।
এদিকে বাসাভাড়া দেওয়া নিয়ে বাড়িওয়ালারাও বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিনই ভাড়াটিয়াদের ওপর বিশেষ নজর রাখতে হচ্ছে। পুলিশের নির্দেশনা অনুসারে নতুন-পুরনো ভাড়াটিয়ার বিস্তারিত তথ্য থানায় জমা দিতে হচ্ছে। ভাড়াটিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র নেওয়া হলেও তা সত্য না মিথ্যা সেই চিন্তায় থাকতে হচ্ছে। বর্তমানে বাড়ির মালিকরা বাসাভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, তেমনি জঙ্গিবাদের আতঙ্কও রয়েছে তাদের মধ্যে। ফলে বাসা খালি থাকলেও পরিবার ছাড়া ভাড়া দিচ্ছেন না।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং সন্ত্রাসীসহ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে বছরখানেক আগে নাগরিক তথ্য ভান্ডার তৈরির লক্ষ্যে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ লক্ষ্যে ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৭৪টি ফরম বিতরণ করে রাজধানীর ৪৯ থানা পুলিশ।
তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ব্যাচেলরদের বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো বিধিনিষেধ নেই। বাড়িওয়ালাদের কোনো ভীতি থাকাও উচিত নয়। যাদের কাছেই (ব্যাচেলর বা ফ্যামিলি) বাসা ভাড়া দেওয়া হোক না কেন, সেই তথ্য পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছে।

যা আছে বাড়িভাড়া আইনে
‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১’ অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পর (নিয়ন্ত্রকের মাধ্যমে) ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা যাবে। কিন্তু ঢাকায় বছরে দুইবার ভাড়া বৃদ্ধির নজিরও আছে। ভাড়ার রসিদ ও বাড়ি ছাড়ার জন্য নোটিশের কথা বলা হয়েছে আইনে। বাড়িভাড়া আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রকের লিখিত আদেশ ছাড়া কোনো অগ্রিম ভাড়া আদায় করা যাবে না। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক মাসের অগ্রিম ভাড়া গ্রহণ করা যেতে পারে।
আইনে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়া যদি নিয়মিতভাবে ভাড়া পরিশোধ করতে থাকেন এবং বাড়িভাড়ার শর্ত মেনে চলেন তাহলে যতদিন ভাড়াটিয়া চাইবেন ততদিন থাকবেন, তাকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এমনকি বাড়ির মালিক পরিবর্তিত হলেও ভাড়াটিয়া যদি আইনসম্মত ভাড়া দিতে রাজি থাকেন, তবে তাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। আইন অনুযায়ী, ভাড়ার আগে দু’পক্ষের মধ্যে লিখিত চুক্তি থাকতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ভাড়ার রসিদ দিতে ব্যর্থসহ নানা অপরাধের জন্য জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে।

NO COMMENTS

Leave a Reply