Home মূল কাগজ ব্যক্তিত্ব মানবিক শহর হতে হলে

মানবিক শহর হতে হলে

কারিকা ডেক্স


নজরুল ইসলাম

মানব সভ্যতার ইতিহাসে নগর বিকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি আদর্শ নগরের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতেই হয়। তার মধ্যে প্রথমই হলো শহরটি হতে হবে মানবিক। আদর্শ নগরীর আরও কিছু বিশেষণ আমরা ব্যবহার করি। যেমন- নিরাপদ নগরী অথবা সুবসতি নগরী, বৈষম্যহীন নগরী, সুন্দর নগরী, তিলোত্তমা নগরী ইত্যাদি। কিন্তু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো মানবিক শহর। এখন মানবিক শহর কীভাবে করা যায় বা কখনও ছিল কি না সেটাই আলোচ্য বিষয়। হ্যাঁ, এক সময় হয়তো ছিল, যখন সমাজে বৈষম্য ছিল কম। আদিযুগে, পাঁচ হাজার বছর পূর্বে হরপ্পা, ব্যাবিলন, মিসরের যে শহরগুলো ছিল, সেগুলোতে বৈষম্য বা শ্রেণিকাঠামো আমরা দেখি। একেবারে আদিযুগে মিসরীয় শহর, ব্যাবিলন, মেসোপটেমিয়া শহর অথবা মহেন্দ্রদার সিন্ধু অববাহিকার শহর, সেগুলোতে ছিল পুরোহিত এবং রাজাদের জন্য বিশাল ব্যবস্থা। তারা বিশেষ একটি জায়গায় প্রাসাদ-অট্টালিকায় বসবাস করত। তাদের যে মন্ত্রী বা পরিষদ তাদেরও বড় বড় বাড়ি থাকত। আরও থাকত প্রশস্ত রাস্তাঘাট। সাধারণ মানুষের জন্য শহরের প্রান্তে ছোট ছোট বাড়ি থাকত। এমন একটা শ্রেণিকাঠামোর মধ্যেই আদি শহরগুলো গড়ে উঠত। মধ্যযুগেও একই অবস্থা। আধুনিক যুগে শিল্পবিপ্লবের পরে যে শহর হলো, এখানেও অবশ্যই শ্রেণিবৈষম্য আছে, শাসকশ্রেণি এবং প্রজাশ্রেণির মধ্যে। দেড়-দুশ’ বছর আগে যে শহরগুলো তৈরি হয়েছে সেগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে হয়েছে। যেমন- প্যারিস, ওয়াশিংটন ডিসি। পরবর্তীকালে অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা, ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসেলিয়া অথবা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। এটা আইয়ুব খানের সময়ে তৈরি হয়। খুব সুন্দর, সাজানো শহর। তারই একটা ছোট্ট আদল ছিল আমাদের শেরেবাংলা নগর। সংসদ ভবন, তার পাশেই ছিল মন্ত্রীদের বাসস্থান, সচিবদের বাসস্থান। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থানও এখানেই ছিল। ইসলামাবাদ ভালো দেখায় বড় পরিসরে। শেরেবাংলা নগর ছোট পরিসরে। উচ্চপদস্থদের জন্য বৃহৎ আকারের  বাড়ি। মাঝারি কর্মচারীদের জন্য মাঝারি বাড়ি। নিন্মশ্রেণির কর্মচারীদের জন্য ছোট ছোট বাড়ি। সবচেয়ে ন্যূনতম বাড়িটা খুব সুন্দর। মানবিক শহরে কম বেতনে যারা কাজ করে, সব শ্রেণির নাগরিকের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। বাসস্থান, কর্মসংস্থানসহ যাতে তারা ন্যূনতম আয়ের পথ খুঁজে পায়। নারীদের নানা রকম সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। খেলার মাঠ এবং সামাজিক সংঘাত নিন্মপর্যায়ে  থাকতে হবে। সংঘাত না হওয়াই কাম্য। কিন্তু আমরা দেখি ঢাকা, মুম্বাই, কলকাতা ইত্যাদি শহর মিশ্র অর্থনীতির ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় গড়ে উঠেছে। সেখানে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করে। একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মানুষ, যারা বস্তিবাসী, অতিদরিদ্র, তারা অত্যন্ত অমানবিক জীবনযাপন করে। বস্তিবাসীদের মাঝে মাঝেই উচ্ছেদ করা হয়। অত্যন্ত অমানবিক কাজ এটা। এসব গণতান্ত্রিক দেশেও হচ্ছে। ধনী দেশগুলো, যেমন- আমেরিকা, সেসব শহরেও কিন্তু বস্তি আছে। শ্রেণিকাঠামোর জন্যই হয়। তবে ওদের বস্তিসংখ্যা কম। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত এদের সংখ্যাই বেশি। আমরা যদি সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকাই, যেমন- চীন, রাশিয়া, সেখানে সবার জন্য ন্যূনতম ব্যবস্থাটা থাকে। একটা মানবিক পরিবেশ তৈরি করে। সেটা নিন্ম আয়ের দেশগুলোতে সম্ভব কিনা? বাংলাদেশে সম্ভব কিনা? ঢাকায় সম্ভব কিনা? ভারতে সম্ভব কিনা? পাকিস্তান, থাইল্যান্ডে সম্ভব কিনা? অর্থনৈতিক উন্নতি হলে নিন্মশ্রেণি উঠতে পারে, তারা ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পায়। কিন্তু বৈষম্য থেকেই যায়। এখন দেখা যায় চীনেও বৈষম্য প্রচ-ভাবে বেড়ে গেছে। তারপরও ন্যূনতম মানদন্ডে থাকে।

মানবিক হতে হলে শহরটা সহনশীল হতে হবে। শ্রেণিগত বৈষম্য, বর্ণগত বৈষম্য যেন না হয়। ধর্মগত সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। ভাষাগত বৈষম্যও যেন না থাকে। আমেরিকার মতো দেশে বর্ণবৈষম্য শুরু হয়েছে, আগেও ছিল, এটা কাম্য নয়। বৈষম্য কমিয়ে এনে দরিদ্র দেশের দরিদ্র শহরগুলোও মানবিক করা যায়। এর জন্য, কারো কারো বিশাল বিত্তের অধিকারী হওয়ার সুযোগ কমাতে হবে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম জীবনধারণের সুযোগ করে দিতে হবে। সেটা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান তো বটেই, সঙ্গে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। আর হলো নিরাপত্তা। নিরাপত্তা না থাকলে কোনো শহরই মানবিক হবে না। সেখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, গোষ্ঠীগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এটাই মানবিক শহরের প্রধান শর্ত। এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে, মানবিক শহর আপনি কোথায় দেখেছেন? এর সঠিক উত্তর কঠিন হবে। উন্নত বিশ্বে অনেক জায়গায় আছে। যেমন- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকার কোনো কোনো জায়গায়, ইউরোপে, ইংল্যান্ডে তাদের ন্যূনতম ব্যবস্থাটা আছে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঢাকাকে আমরা মানবিক শহর বলতে পারি না। এখানে বিত্তের চমক কোনো কোনো জায়গায় আমরা দেখি। সেটা বাসস্থান, পরিবহন, গাড়ি-ঘোড়ায়, স্কুলের শিক্ষায় দেখা যায়। অধিকাংশ মানুষ সাধারণ, খুব কষ্টের জীবনযাপন করে। নিন্মবিত্ত, বস্তিবাসী দরিদ্র যারা,  তাদের জীবন দুর্বিষহ। সুতরাং তাদের কাছে এই শহরটা মানবিক নয়। আর যারা বিত্তবান, উচ্চবিত্ত তাদেরও যদি মানবতাবোধ থাকে তারাও কিন্তু এই বৈষম্যের শহরে আরামে থাকেন বলে মনে হয় না।

বিবেকবোধ থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু যেটা চেয়েছিলেন। স্বাধীন দেশের সংবিধানে তিনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সবার সমান অধিকার থাকবে, বাকস্বাধীনতা থাকবে। তিনি চেয়েছিলেন সব বাংলাদেশির জন্য জাতীয়তাবাদ। বাঙালি হোক, আদিবাসী হোক সবার জন্য সমব্যবস্থা। আরেকটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। আমাদের চারটি প্রধান ধর্ম। এরা যেন একসঙ্গে বসবাস করতে পারে। এভাবে মানবিক দেশ, মানবিক শহর করতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তবে অনেক দিক থেকেই কিন্তু আমাদের ঢাকা শহর মানবিক। এখানে ধর্মীয় উন্মাদনা অনেক দেশের তুলনায় কম। আমেরিকা, ইউরোপ এমনকি ভারতের তুলনাতেও কম। গণতান্ত্রিক চেষ্টা আছে। সমাজতান্ত্রিক আকাংক্ষা ছিল, চেষ্টা ছিল। কিন্তু এগোতে পারছে না। আবার দূরে সরে যাচ্ছে। এক সময় পুরান ঢাকায় ধনী-গরিব-মধ্যবিত্ত সব কাছাকাছি, পাশাপাশি বাস করত। তখন বরং শহরটা আরও মানবিক ছিল। ঢাকা একশ’ বছর আগে বোধহয় আরও মানবিক ছিল। মানবিক শহর হতে হলে গণতান্ত্রিক হতে হবে, সমাজতান্ত্রিক হতে হবে এবং অবশ্যই ধর্মনিরপেক্ষ শহর হতে হবে। আর জাতীয়তাবোধ থাকতেই হবে।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply