Home চট্টগ্রাম মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম হবে বিশ্বমানের শহর

মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম হবে বিশ্বমানের শহর

আশিক ইমরান
প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট অ্যান্ড সিইও, ফিআলকা

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মির্জা মাহমুদ আহমেদ

স্থপতি হিসেবে আপনার শুরুটা কেমন ছিল?
স্থাপত্য বিষয়ে আমি স্নাতকোত্তর করেছি ১৯৯৩ সালে। অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি রাজ্য বেলারুশ থেকে। ১৯৯৪-এর শেষের দিকে দেশে ফিরে এসেই নিজস্ব আর্কিটেক্ট ফার্ম শুরু করি। কিন্তু এটা ছিল খুবই স্ট্রাগলিং। চট্টগ্রামে সে-সময় তেমন আর্কিটেক্ট ছিল না। ভালো কাজও তেমন হতো না। বেশিরভাগ কাজ করতেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। হাতেগোনা কয়েকজন আর্কিটেক্ট ছিলেন তখন। তার মধ্যে আমি একজন।

সাম্প্রতিক সময়ে আপনার উল্লেখযোগ্য কাজ সম্পর্কে জানতে চাই।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বেশ কিছু প্রজেক্টের কাজ করছি এখন। সিটি করপোরেশনের সেবক (পরিছন্নতাকর্মী) যারা আছেন তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওখানে বেশ বড় একটা কমিউনিটি বাস করে। ছয়’শর মতো ফ্ল্যাট তৈরি করা হচ্ছে সেখানে। এ ছাড়াও নাগরিক যে সুযোগ-সুবিধাগুলো আছে, সেগুলো নিশ্চিতে স্কুল, সংস্কৃতিচর্চাকেন্দ্র ও পরিছন্নতাকর্মীদের নিজস্ব ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে একটা টাউনশিপের মতো হবে সেটি। এ ছাড়াও গণপূর্ত বিভাগের আরেকটি কাজ করছি। শপিং কাম এন্টারটেইনমেন্ট কমপ্লেক্স। ওখানে শপিংমলের পাশাপাশি সিনেপ্লেক্স, ফুডকোর্ট এবং শুধু শিশুদের বিনোদনের জন্য দুটি ফ্লোর থাকবে। কমপ্লেক্সটির নির্মাণ-কাজ শেষ হলে চট্টগ্রামবাসীর জন্য দারুণ এক বিনোদনের জায়গা তৈরি হবে বলে মনে করছি। তাছাড়া বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির হয়ে বেশ কিছু রেসিডেনশিয়াল ও প্রাইভেট ভিলার স্থাপত্য-নকশার কাজ করছি।

ভবনের নকশা করার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলবায়ু কতটুকু প্রাধান্য পায়?
স্থপতি হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যগুলোকে রক্ষা করা এবং এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। পাহাড় এবং চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়গুলো, আমার ডিজাইনে আমি সবসময় রাখার চেষ্টা করি।

পরিকল্পিত চট্টগ্রাম নগরী গড়ে তুলতে কী করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
চট্টগ্রাম নগরী তো ইতোমধ্যে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। আমাদের যে মাস্টারপ্ল্যানগুলো ছিল সেগুলোর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শহরটা অপরিকল্পিতই রয়ে গেছে। তারপর যখন অনেক স্থপতি চট্টগ্রামে কাজ করা শুরু করলেন, ঠিক তখনই একটা সচেতনতার জায়গা তৈরি হলো। এখন চট্টগ্রামে প্রায় দেড়’শর মতো স্থপতি কাজ করছেন।
আমরা যখন সিডিএ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন স্থানে কথা বলি তখন পরিকল্পিত নগরী গড়ার ব্যাপারে ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করি। ইতোমধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ক্ষতিটুকু সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার জন্য যা যা করণীয়-আমরা সেই চেষ্টাই করছি।
আমাদের চট্টগ্রাম নগরীতে এখন যেটার বেশি অভাব সেটা হচ্ছে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট। অনেকগুলো নতুন রাস্তা করা দরকার। রিং রোড করা দরকার। অবশ্য এর মধ্যে অনেকগুলো সড়ক নির্মাণাধীন আছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, আউটার রিংরোডের নির্মাণ-কাজ চলছে। শহরের ভেতরে অনেকগুলো ইন্টারনার্ল রোডের নির্মাণ-কাজ চলছে। এগুলো হয়ে গেলে আশা করা যায় আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে কিছুটা ভালো অবস্থায় ফিরবে চট্টগ্রাম। টানেলের কাজ হচ্ছে এবং কর্ণফুলীর ওপারে যে দক্ষিণ চট্টগ্রাম-শহরের আরেকটা অংশ, সেই দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে কানেকটিভিটিতে টানেল একটা বিশাল ভূমিকা রাখবে।
দুটো বিশাল ইকোনমিক জোন হচ্ছে চট্টগ্রামের মীরসরাই এবং আনোয়ারায়। সেখানে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আমরা আশা করছি। আমাদের এখানে অবকাঠামোগত অনেক সমস্যা আছে। প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের যে পরিমাণ সড়ক দরকার তার অর্ধেকও নেই। এ ছাড়াও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট না থাকার ফলে কর্মদিবসে যানজটে অচল হয়ে যায় শহর। এই সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি। ধীরে ধীরে হয়তো-বা সমস্যাগুলোর উন্নতি হবে।
আশার কথা হচ্ছে, চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়নে আরেকটা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেয়া হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ২১ বছর মেয়াদী এই মাস্টারপ্ল্যানে অনেক কিছু একীভূত করা হয়েছে, যেটা যুগোপযোগী। একটি আধুনিক সচল শহর গড়তে যা যা উপাদান প্রয়োজন তার সবই আছে এই মাস্টারপ্ল্যানে। আমরা আশা করব এই মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়িত হবে এবং এর ফলে চট্টগ্রাম একটি বিশ্বমানের উন্নত শহরে রূপান্তরিত হবে। চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। সরকারি নথিতে বাণিজ্যিক রাজধানী। দেশের প্রধানতম বন্দরনগরী। এ-রকম একটা গুরুত্বপূর্ণ শহর এতদিন অবহেলিত ছিল-এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আশার কথা হচ্ছে, দেরিতে হলেও সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছে। আশা করি অচিরেই ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাবে।
আমরা এখন শহরমুখী জনস্রোত কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। এজন্য উপজেলা পর্যায়ে যদি কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিকল্পিত আবাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে শহরমুখী জনস্রোত কমবে। আর এজন্য মাস্টারপ্ল্যানে সুনির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনা আছে। এ নিয়ে সরকারের কর্মসূচিও আছে।

 

NO COMMENTS

Leave a Reply