Home ফিচার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত আধুনিক স্থাপনা

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত আধুনিক স্থাপনা

0 51

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

সোহরাব আলম

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত স্মৃতি সম্বলিত আধুনিক জাদুঘর ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক দেশের প্রধান এই প্রতিষ্ঠান রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রায় দুই বিঘা জায়গার ওপর নির্মিত। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর লড়াকু বাঙালির স্মৃতি, সত্তা ও আবেগ সংরক্ষণ করা হয়েছে এই জাদুঘরে। জাদুঘরটিতে রয়েছে প্রাচীন বাংলা থেকে বর্তমান বাংলাদেশের (১৯৭০ পর্যন্ত) পরম্পরার বিন্যাস। এটি নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর এক পরিকল্পিত স্থান। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী, মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহসহ বহুমুখী কার্যক্রমে সম্প্রসারিত এ জাদুঘর।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক প্রদর্শনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রয়েছে চারটি গ্যালারি। ভবনের চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় গ্যালারিগুলোতে স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্বমূলক প্রত্ননিদর্শন। রয়েছে আলো-আঁধারির খেলাও। ২০ টাকায় প্রবেশ টিকিট কেটে র‌্যাম্পে হেঁটে যেতে হয় চতুর্থ তলায়। জাদুঘরের চারটি গ্যালারির দুটি এই তলায়। প্রথম গ্যালারিতে ঢুকলেই দেখা যায়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান পর্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে সত্তরের সাধারণ নির্বাচন, দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি, এ জনপদের প্রতিনিধিত্বমূলক বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন।
প্রথম প্রদর্শনকক্ষটির নাম : আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম। ফসিল, প্রাচীন টেরাকোটা, মৃৎপাত্র, শিলাখন্ডসহ নানা প্রকার নিদর্শনের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ব্যক্তির আলোকচিত্র।
দ্বিতীয় প্রদর্শনকক্ষের নাম : আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগ। এই কক্ষ থেকেই দর্শক সরাসরি ঢুকে পড়বেন মহান মুক্তিযুদ্ধের পর্বে। স্বাধীনতার ঘোষণা, ৪ এপ্রিল কুষ্টিয়ার যুদ্ধ ও সারা দেশের গণহত্যার নিদর্শন রয়েছে এ গ্যালারিতে। আছে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র। আরও রয়েছে ১ জানুয়ারি ১৯৭১ সাল থেকে ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সংগ্রহ। শব্দ ও আলোর প্রক্ষেপণের বিশেষ প্রদর্শনীর এ গ্যালারি আমাদের অধিকার, আমাদের ত্যাগের। আলোকচিত্র, নিদর্শন আর স্থাপনাকর্মে ফুটে উঠেছে রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, প্রতিরোধযুদ্ধ ও মুজিবনগর সরকার গঠন।
এরপর সিঁড়ি বা লিফটে পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যাবে বাকি দুটি। গ্যালারি দুটির নাম ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ আর ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’।
‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’ গ্যালারিতে রয়েছে ১ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সব স্মৃতি। এরমধ্যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তুদের জীবনযাপন, তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও যুদ্ধের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকে সামনে আনা হয়েছে আলোকচিত্রের মধ্য দিয়ে। এ ছাড়া শরণার্থীদের ব্যাগ, কম্বল, যুদ্ধের সার্টিফিকেটসহ মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধ উপলক্ষে তৈরি বিভিন্ন পোস্টার, শহীদদের ব্যবহৃত সামগ্রী ও আন্তর্জাতিক সমর্থনকে তুলে ধরা হয়েছে।
‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’ গ্যালারিতে ‘বিলোনিয়া যুদ্ধের মডেল’ ব্যবহার করে দর্শকদের দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ের অভিজ্ঞতা স্বাদ। এখানে ঠাঁই পেয়েছে চিথলিয়া রেল স্টেশনে যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ। আছে ৭১-এর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন মেশিনগান, নারী নির্যাতনের বিভিন্ন চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত অ্যাশট্রে, কলম, চশমা; যুদ্ধে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নানা কার্যক্রম, দগ্ধ ঘরবাড়ির অংশসহ পাক হানাদারবাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ইতিহাস-সমৃদ্ধ চারটি গ্যালারি যেন জাতির গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার অন্যতম একটি মাধ্যম। একইসঙ্গে এ ইতিহাস সবসময় প্রেরণা সঞ্চার করে বিকশিত একটি সমাজ গঠনের।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম। তিনি কারিকা’কে বলেন, ‘আমার জীবনের এখন পর্যন্ত করা সবচেয়ে বড় কাজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, যা নিয়ে আমি গর্ব করি। আমার চিন্তা ছিল, এটি যেন সারা বিশ্বের মুক্তি-সংগ্রামীদের আবেগের জায়গাটা ধরতে পারে। বিশেষত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে সংগ্রাম, রাজনৈতিক নেতাদের কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক বাহিনীর ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষিত করায় ভূমিকা নেওয়া-সবগুলো বিষয়ই ধরার একটা প্রয়াস।’
স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম আরও বলেন, ‘ভাগ্যক্রমে আমরা খুব কম সময়ে; মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা পেয়েছি। কিন্তু এই ৯ মাসে অনেক জীবন গেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যে হারিয়েছে, তার দুঃখ আমরা মুছে পারব না। অনেক মানুষ আছে, যারা হয়তো সে অর্থে স্বীকৃত নন কিন্তু যুদ্ধে তার অনেক অবদান আছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসে যেন তারা অনুভব করে, এটা তার আবেগের জায়গা।’
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর রোববার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া সোম থেকে শনিবার প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। শীতকালে (অক্টোবর থেকে ফ্রেরুয়ারি) খোলা থাকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আর রমজান মাসে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত।

NO COMMENTS

Leave a Reply